৫ আগস্ট ২০২৪। সোমবার।
ঢাকা তখন আর স্বাভাবিক কোনো শহর নয়। কারফিউ আছে, কিন্তু রাস্তায় মানুষের ঢল। কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর সেদিন যেন পুরো রাজধানী একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—আর ঘরে ফিরে যাবে না।
শাহবাগ, ধানমন্ডি, উত্তরা, মিরপুর—চারদিক থেকে মানুষ এগিয়ে আসছে গণভবনের দিকে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, আর ক্ষমতার কেন্দ্র ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে জনতার কাছ থেকে।
কিন্তু রাজপথের এই দৃশ্যের আড়ালে, একই সময়ে, আরেকটি বাংলাদেশ তৈরি হচ্ছিল।
সেই গল্পের শুরু অবশ্য কয়েক ঘণ্টা আগেই।
৫ আগস্টের প্রথম প্রহর। রাত ১২টা ২০ মিনিট। অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবরের ফোন বেজে ওঠে। ওপাশে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। পরদিন সকালে দেখা করতে চান তিনি। কয়েক ঘণ্টা পর, সকাল ১০টার দিকে সেনাপ্রধানের বাসভবনে তাঁদের বৈঠক হয়। ফজলে এলাহী আকবরের বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেনাসদরে নিয়ে আসার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ইতিহাস তখনও জানে না সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের মানুষগুলো যেন বুঝতে শুরু করেছেন—পরিস্থিতি আর আগের জায়গায় নেই। ১
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে তখন আরেক ধরনের উৎকণ্ঠা। অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে আগের রাতেই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল—তাঁর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে। তাঁকে এবং বুয়েটের অধ্যাপক হাসিব চৌধুরীকে হত্যার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছিল। নিজের বাসায় না থেকে তিনি সহকর্মী অধ্যাপক মোস্তফা আল মামুনের বাসায় রাত কাটান। বাইরে তখন রাষ্ট্রীয় শক্তি ও জনতার সংঘাত চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে।২
সকাল গড়িয়ে দুপুর।
প্রায় দুপুর ১২টার দিকে আসিফ নজরুলের কাছে সেনাবাহিনীর ফোন আসে। তাঁকে সেনাসদরে যেতে বলা হয়। তিনি যাওয়ার আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সঙ্গে কথা বলেন। কিছুক্ষণ পর সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা গাড়ি নিয়ে তাঁকে নিতে আসেন।
ঢাকা তখন কার্যত জনসমুদ্র।
ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের কাছে গাড়ি আটকে যায়। সামনে আন্দোলনকারীরা। আসিফ নজরুল গাড়ি থেকে নামেন, নিজের পরিচয় দেন। মুহূর্তেই দৃশ্য পাল্টে যায়। মানুষ তাঁকে ঘিরে ধরে, উল্লাস করে। কেউ তাঁকে কাঁধে তুলে নেয়। কয়েক মিনিট আগেও যে মানুষটি সেনাসদরের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন, এখন তিনি আন্দোলনকারীদের বিজয়ের মিছিলের অংশ।
তারপর আবার গাড়ি।
ফাঁকা হয়ে যাওয়া রাজপথ পেরিয়ে, সেনাবাহিনীর ব্যারিকেড অতিক্রম করে তিনি পৌঁছান ঢাকা সেনানিবাসের সেনাসদরে।
সেখানে তখন অপেক্ষা করছিলেন রাজনৈতিক নেতারা। সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানও। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ইসলামী দল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিরা উপস্থিত। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই—শেখ হাসিনা সরকারের পর রাষ্ট্র চলবে কীভাবে?
সংসদ থাকবে, নাকি ভেঙে দিতে হবে—এই প্রশ্নেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে আলোচনা। আসিফ নজরুল এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতারা সংসদ ভেঙে দেওয়ার পক্ষে জোর দেন। বাইরে তখন আন্দোলনকারীদের স্রোত আরও ঘন হচ্ছে।
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে।
বেলা ৩টার কিছু আগে আসিফ নজরুল তাঁর ফেসবুকে একটি ছোট্ট বার্তা দেন—
“আপনারা শান্ত হন, আমাদের জন্য অনেক বড় একটা গুড নিউজ আসছে।”
তিনি তখনও জানেন না, কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় দৃশ্যগুলোর একটি ঘটতে যাচ্ছে।
বিকেল ৩টা ৯ মিনিট।
ঢাকার আকাশ থেকে একটি সামরিক পরিবহন বিমান উড্ডয়ন করে। সেটিতে শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা। দ্য ডেইলি স্টারের পরবর্তী অনুসন্ধানে জানা যায়, বিমানটি ঢাকা থেকে উড্ডয়নের সময় এর ট্রান্সপন্ডার বন্ধ ছিল এবং ফ্লাইটটি প্রশিক্ষণ ফ্লাইট হিসেবে দেখানো হয়েছিল। বিমানটি পরে ভারতের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। ৩
সেনাসদরের বৈঠক তখনও চলছে।
টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠে শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানের খবর। আসিফ নজরুল সেনাপ্রধানকে বিষয়টি জানান। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সেনাপ্রধান কিছুটা বিস্মিত হন এবং তখনই শেখ হাসিনার দেশত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। অন্যদিকে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান পরবর্তী সময়ে দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এ কথা তিনি আগে থেকে জানতেন না; আলোচনার সময়ই বিষয়টি জানতে পারেন।
রাষ্ট্রের ১৫ বছরের রাজনৈতিক অধ্যায়ের পর্দা তখন নামছে।
বিকেল ৪টার দিকে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। জানান, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন, দেশ ছেড়েছেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে।
কিন্তু একটি সরকার পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের কাজ থেমে থাকে না।
এখন প্রয়োজন ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ করা।
সেনাসদর থেকে তাই বঙ্গভবনের দিকে যাত্রা শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বসতে হবে। সংসদ ভাঙার পথ তৈরি করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ঢাকার রাস্তায় তখন অন্য দৃশ্য। কোথাও বিজয়োল্লাস, কোথাও ভাঙচুর, কোথাও মানুষের উচ্ছ্বাস, কোথাও আতঙ্ক। সেই জনসমুদ্রের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে বঙ্গভবনের দিকে এগোয় গাড়িবহর।
৫ আগস্টের সন্ধ্যা থেকে রাত। বঙ্গভবন।
রাষ্ট্রপতির সভাপতিত্বে শুরু হয় দীর্ঘ বৈঠক। প্রায় ৪০ জন রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় আসে খালেদা জিয়ার মুক্তি, সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন। জরুরি অবস্থা বা মার্শাল ল জারির প্রস্তাবও ওঠে, কিন্তু তা গ্রহণ করা হয়নি। রাষ্ট্রপতি “আয়নাঘর”-এর বন্দীদের বিষয়ে জানতে চাইলে সেনাপ্রধান তাঁদের মুক্তির ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। বিমানবাহিনী প্রধান দেশের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণের কথাও জানান।১,২,৩
রাত বাড়ে।
রাত ১১টার দিকে বঙ্গভবনের বৈঠক শেষ হয়। কিন্তু রাত শেষ হয়নি।
আসিফ নজরুলকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের বঙ্গভবনে নিয়ে আসার।
তিনি চলে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে।

৬ আগস্টের প্রথম প্রহর। রাত প্রায় ১টা। কার্জন হল।
ঢাকা তখনও ঘুমায়নি।
একটি ভবনের নিরিবিলি কক্ষে বসেছেন নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, সারজিস আলম, মাহফুজ আলম ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁদের সঙ্গে আসিফ নজরুল।
দেশের পরবর্তী সরকারপ্রধান কে হবেন—সেই প্রশ্নটি এবার সামনে।
কয়েকটি নাম নিয়ে আলোচনা হয়। আসিফ নজরুল প্রথমে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ও ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নাম প্রস্তাব করেন।
তারপর নাহিদ ইসলাম বলেন একটি নাম—ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
নামটি উচ্চারিত হওয়ার পর ঘরে যেন নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। আসিফ নজরুলের সংশয় ছিল—ইউনূস কি রাজি হবেন? আসিফ মাহমুদ জানান, তাঁদের সঙ্গে ইতিমধ্যে যোগাযোগ হয়েছে। তিনি রাজি।
সেই গভীর রাতে, কার্জন হলের একটি কক্ষে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সরকারের প্রধানের নাম প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল।মুহাম্মদ ইউনূস।
কিন্তু তখনও তাঁকে ঢাকায় আনা হয়নি। রাষ্ট্রপতির সম্মতি হয়নি। সেনাবাহিনীর সম্মতি পুরোপুরি চূড়ান্ত নয়। সরকার গঠনের সাংবিধানিক পথও নির্ধারিত হয়নি।
অর্থাৎ নামটি ঠিক হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রটি এখনও অপেক্ষায়।
৬ আগস্ট সকাল।
সেনাসদরে আবার বৈঠক। সেনাপ্রধান আসিফ নজরুলের কাছে জানতে চান—প্রধান উপদেষ্টা কে?উত্তর আসে—ড. ইউনূস।
আপত্তিও আসে। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা, তাঁর অতীত নিয়ে প্রশ্ন। আসিফ নজরুল যুক্তি দেন, ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বাংলাদেশের জন্য তাঁর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে। আলোচনা দীর্ঘ হয়। শেষ পর্যন্ত নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদেরও আলোচনায় যুক্ত করা হয়। ইউনূসের নাম নিয়ে সামরিক নেতৃত্বের সম্মতি তৈরি হয়।
কিন্তু সবচেয়ে কঠিন লড়াইটি তখনও বাকি।
৬ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টা। বঙ্গভবন।
নাহিদ ইসলামসহ ছাত্রনেতারা বঙ্গভবনে পৌঁছান। তাঁদের সঙ্গে আসিফ নজরুল ও অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান।
রাষ্ট্রপতি এলেন। তিন বাহিনীর প্রধান এলেন।
তারপর ছাত্রদের সঙ্গে আলাদা বৈঠকে বসলেন সেনাপ্রধান।
এক ঘণ্টা।দুই ঘণ্টা। তিন ঘণ্টা। চার ঘণ্টা।
প্রশ্ন ছিল—ড. ইউনূস ছাড়া অন্য কাউকে কি সরকারপ্রধান করা যায়? এমনকি ছাত্রদের নিজেদের কাউকে দায়িত্ব নেওয়ার কথাও আলোচনায় আসে।
কিন্তু ছাত্ররা নড়েনি। তাদের অবস্থান একটাই—ইউনূস ছাড়া নয়।
প্রায় পাঁচ ঘণ্টার এই টানাপোড়েনের পর শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ও সামরিক নেতৃত্ব ড. ইউনূসের নাম মেনে নেয়। একটি সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদটির জন্য তখন আর কোনো বড় বাধা রইল না।
এবার শুরু হলো দ্বিতীয় লড়াই।কারা থাকবেন সেই সরকারে?

৭ আগস্ট।
সারাদিন ধরে চলল নামের তালিকা। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হলো। ছাত্রদের পক্ষ থেকেও নাম এলো। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মতামত নেওয়া হলো। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলের সরাসরি অংশগ্রহণের বদলে অরাজনৈতিক ও পেশাজীবী ব্যক্তিদের নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের দিকে আলোচনা এগোয়।
রাতে ফুলার রোডের বাসায় বসেন আসিফ নজরুল ও ছাত্রনেতারা। নাহিদ, আসিফ, মাহফুজ, নাসীর ও সারজিস—তাঁদের সামনে সম্ভাব্য উপদেষ্টাদের তালিকা।
কেউ অর্থনীতিবিদ। কেউ আইনজীবী। কেউ কূটনীতিক। কেউ মানবাধিকারকর্মী। কেউ শিক্ষাবিদ।কেউ প্রশাসক।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেনের নাম প্রস্তাব করা হয়। নারী প্রতিনিধি, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও আলোচনা হয়।
ড. ইউনূসও একটি তালিকা পাঠান। সেখান থেকে বাছাই হয়। শেষ পর্যন্ত তালিকাটি তাঁর সম্মতিতেই চূড়ান্ত হয়।
বাংলাদেশ তখন আর শুধু একজন নতুন সরকারপ্রধানের অপেক্ষায় নেই।একটি নতুন সরকারের পূর্ণ কাঠামো তৈরি হয়ে গেছে। শুধু মানুষটি ঢাকায় পৌঁছানোর অপেক্ষা।

৮ আগস্ট।
চার দিন আগে যে বাংলাদেশ রাস্তায় দাঁড়িয়ে সরকারের পতন ঘটিয়েছিল, সেই বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধান এবার দেশের মাটিতে ফিরছেন।
ফ্রান্স থেকে ঢাকার উদ্দেশে উড়াল দিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
দুপুর ২টা ১০ মিনিটের দিকে তাঁর বিমান অবতরণ করে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে অপেক্ষা করছিলেন তিন বাহিনীর প্রধান, অধ্যাপক আসিফ নজরুল ও ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
বিমানবন্দরে নেমে তিনি ছাত্রনেতাদের সঙ্গে দেখা করেন। যাদের আন্দোলন তাঁকে এই রাষ্ট্রের নতুন দায়িত্বের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
কিন্তু স্বাগত জানানোর সময় নেই।
আবার বৈঠক।
এবার প্রশ্ন—এই সরকার গঠনের সাংবিধানিক পথ কী?
আসিফ নজরুল সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নেওয়ার প্রস্তাব দেন। নতুন সরকারকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড় করানোর জন্য সেটিই হয়ে ওঠে পথ।
বিমানবন্দর থেকে ড. ইউনূস যান গুলশানের বাসায়। সেখানে আসিফ নজরুলের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। মন্ত্রণালয় বণ্টন নিয়েও আলোচনা হয়।
তারপর সন্ধ্যা নামে ঢাকায়।
চার দিন ধরে যে শহর কখনো ঘুমায়নি, সেই শহরের আরেকটি ঐতিহাসিক রাত শুরু হয়।
৮ আগস্ট রাত। বঙ্গভবন। দরবার হল।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সামনে। এক পাশে সামরিক নেতৃত্ব। অন্য পাশে নতুন সরকারের সম্ভাব্য সদস্যরা। ক্যামেরা প্রস্তুত। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা প্রস্তুত। তারপর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সামনে এগিয়ে গেলেন।
শপথের শব্দ উচ্চারিত হলো।
৫ আগস্ট বিকেল ৩টা ৯ মিনিটে যে বিমানটি ঢাকা ছেড়ে গিয়েছিল, তার ঠিক বাহাত্তর ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর ৮ আগস্ট রাতে একই রাষ্ট্রের নতুন সরকারের প্রধান শপথ নিলেন।
মাঝখানে ছিল একটি দেশ।
ছিল রাজপথ। ছিল রক্ত। ছিল মানুষের উল্লাস। ছিল আতঙ্ক। ছিল সেনাসদরের বৈঠক। ছিল বঙ্গভবনের দীর্ঘ রাত। ছিল কার্জন হলের গোপন বৈঠক। ছিল ছাত্রদের অনড় অবস্থান।
ছিল ক্ষমতার শূন্যতা পূরণের জন্য একের পর এক দর-কষাকষি।
আর ছিল একটি নাম—মুহাম্মদ ইউনূস—যে নামটি ৬ আগস্টের আগেই কার্জন হলের একটি ঘরে উচ্চারিত হয়েছিল, কিন্তু ৮ আগস্ট রাতে ৯.৩০ মিনিটে এসে রাষ্ট্রীয় শপথের মধ্য দিয়ে বাস্তবতা হয়ে উঠল।
চার দিন আগে বাংলাদেশে ছিল হাসিনার সরকার।
চার দিন পর বাংলাদেশে ড. ইউনুসের নতুন সরকার।
ইতিহাসে কখনো কখনো কয়েক বছর লাগে একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলাতে। বাংলাদেশের ৫ থেকে ৮ আগস্টের সেই চার দিন ছিল তার ব্যতিক্রম।
সেই চার দিনে শুধু একজন কতৃত্ববাদি সরকার প্রধান দেশ ছাড়েননি।
একটি ক্ষমতার যুগ শেষ হয়েছিল—আর একটি অনিশ্চিত, অজানা নতুন অধ্যায়ের দরজা খুলে গিয়েছিল।
সেলিম পারভেজ
লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী
সূত্র
- The Daily Star, Star Explains;
- প্রথম আলো — অধ্যাপক আসিফ নজরুলের বিশেষ সাক্ষাৎকার
- The Daily Star
- প্রথম আলো — ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ ও আসিফ নজরুলের সাক্ষাৎকার
- প্রথম আলো — অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া
- প্রথম আলো — ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের ঢাকায় ফেরা
- The Daily Star — How Hasina’s flight was kept off radar
- The Daily Star — ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ

