একজন ডাক্তার।
মানুষকে বাঁচানোই তাঁর পেশা, তাঁর বিশ্বাস। কিন্তু একদিন তিনিই আবিষ্কার করলেন—যে জলকে মানুষ পবিত্র বলে বিশ্বাস করে, সেই জলেই লুকিয়ে আছে অসুখের বিষ।
সেখান থেকেই শুরু সত্যজিৎ রায়ের গণশত্রু (১৯৯০)।
কিন্তু এটি শুধু দূষিত জলের গল্প নয়। এটি একজন সৎ মানুষের গল্প। এমন একজন মানুষের, যিনি সত্য জেনে যাওয়ার পর আর চুপ করে থাকতে পারেন না। আর সেই সত্যই একসময় তাঁকে তাঁর নিজের শহরের মানুষের কাছে শত্রু করে তোলে।
ডা. অশোক গুপ্ত—চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ছোট শহর চাঁদনীপুরের চিকিৎসক। শহরে হঠাৎ জন্ডিস ও পানিবাহিত রোগ বাড়তে থাকে। অশোক সন্দেহ করেন, এর উৎস পানীয় জল। পরীক্ষা করান। ফলাফল আসে—শহরের বিখ্যাত মন্দিরের চরণামৃতের জল দূষিত। অর্থাৎ যে জলকে মানুষ আশীর্বাদ মনে করে পান করছে, তার মধ্যেই ছড়িয়ে আছে রোগের জীবাণু।
অশোক চান মন্দিরটি সাময়িকভাবে বন্ধ করা হোক। পানির ব্যবস্থা ঠিক করা হোক। মানুষকে সতর্ক করা হোক। কিন্তু এখানেই বিজ্ঞান গিয়ে ধাক্কা খায় বিশ্বাসের দেয়ালে।
মন্দিরটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহরের অর্থনীতি, ব্যবসা, মানুষের জীবিকা এবং ক্ষমতার হিসাব। মন্দিরে মানুষ না এলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শহরের আয় কমবে। ফলে অশোকের বৈজ্ঞানিক সত্য ধীরে ধীরে হয়ে উঠবে অনেকের কাছে একটি ‘সমস্যা’।
আর সেই সমস্যার সবচেয়ে কাছের মানুষটি তাঁর নিজের ভাই নিশীথ।
নিশীথ পৌরসভার চেয়ারম্যান। মন্দিরের সঙ্গে তাঁরও স্বার্থ জড়িয়ে আছে। তিনি ভাইকে বোঝাতে চান, বিষয়টি এতটা বড় করে দেখার প্রয়োজন নেই। কিন্তু অশোক জানেন—এখানে চুপ করে থাকা মানে মানুষের অসুস্থতা ও মৃত্যুর সামনে নিজের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া।
দুই ভাইয়ের এই দ্বন্দ্ব তাই কেবল পারিবারিক দ্বন্দ্ব নয়।এটি দুটি মানসিকতার সংঘর্ষ।একজনের কাছে মানুষের জীবন আগে। অন্যজনের কাছে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বড়। অশোক সত্য প্রকাশ করতে চান। সংবাদপত্রে লিখতে চান। কিন্তু সংবাদপত্রও শেষ পর্যন্ত চাপের কাছে নতি স্বীকার করে।
তখন তিনি ঠিক করেন—সংবাদপত্র নয়, সরাসরি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন। জনসভা ডাকা হয়।
অশোক সেখানে যুক্তি দিয়ে কথা বলতে চান। কিন্তু সভা শুরু হওয়ার আগেই তাঁর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়ে যায়। ধর্মীয় আবেগ সামনে আনা হয়। তাঁকে বোঝানো হয়, তিনি মন্দিরের পবিত্রতাকে অপমান করছেন। তাঁর বৈজ্ঞানিক বক্তব্যের চেয়ে মানুষের বিশ্বাস বড় হয়ে ওঠে।
এবং শেষ পর্যন্ত যে ডাক্তার মানুষকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন, তিনিই হয়ে যান—গণশত্রু। এই জায়গাটিই সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাটিকে অসাধারণ করে তোলে।
কারণ অশোকের বিরুদ্ধে যারা দাঁড়িয়েছে, তারা সবাই খারাপ মানুষ নয়। কেউ ব্যবসা হারানোর ভয় পায়। কেউ চাকরি হারানোর ভয় পায়। কেউ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার ভয় পায়। কেউ ক্ষমতাবানদের বিরোধিতা করতে চায় না। কেউ আবার শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে থাকতে চায়।
ফলে একজন মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায় পুরো সমাজ।
আর তখন সত্যজিৎ রায় একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করেন—সত্য কি সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে সত্য হয়ে ওঠে? গণশত্রুর উত্তর—না। সত্যের কোনো ভোট লাগে না।
সত্যজিৎ রায় এই গল্পটি নিয়েছিলেন হেনরিক ইবসেনের বিখ্যাত নাটক An Enemy of the People থেকে। কিন্তু ইবসেনের গল্পকে তিনি সরাসরি অনুবাদ করেননি। ঊনবিংশ শতকের ইউরোপীয় সমাজের একটি সমস্যাকে নিয়ে এসেছেন ভারতীয় বাস্তবতায়। দূষিত স্পা বা জলস্নানকেন্দ্রের বদলে এখানে এসেছে মন্দিরের চরণামৃত।
এই পরিবর্তনটিই ছবির রাজনৈতিক ও সামাজিক অর্থকে আরও গভীর করেছে।
কারণ এখানে দূষিত জল শুধু জল নয়। তার সঙ্গে মিশে গেছে ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং মানুষের ভয়। তবে গণশত্রুকে শুধু ধর্মের বিরুদ্ধে সিনেমা ভাবলে ভুল হবে।
সত্যজিৎ রায়ের লক্ষ্য ছিল অন্ধবিশ্বাসের চেয়েও বড় একটি বিষয়—প্রশ্নহীন আনুগত্য।
মানুষ যখন কোনো বিশ্বাসকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়, তখন সত্য তার কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। আর অস্বস্তিকর সত্যকে চেপে রাখার জন্য সমাজ খুব দ্রুত একজন অপরাধী খুঁজে নেয়। এখানে সেই অপরাধী অশোক গুপ্ত।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে সত্যজিৎ রায়ের শেষদিকের অনেক কাজেই নির্মাণের ধরন বদলে গিয়েছিল। গণশত্রুও মূলত স্টুডিওনির্ভর, সংলাপনির্ভর সিনেমা। পথের পাঁচালীর বিস্তৃত প্রকৃতি নেই। নেই অরণ্যের দিনরাত্রির বন। নেই অশনি সংকেত–এর মাঠ।
আছে ঘর।আছে মুখ।আছে তর্ক।আছে মানুষের চোখ। এবং এই সীমাবদ্ধতাকেই রায় তাঁর শক্তিতে পরিণত করেছেন।
ক্যামেরা বারবার মানুষের মুখে ফিরে আসে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অশোকের মুখে আমরা দেখি রাগ, হতাশা, অসহায়তা এবং এক ধরনের নৈতিক দৃঢ়তা। তিনি কোনো মহাপুরুষ নন। তিনিও ভেঙে পড়েন। তিনিও একা হয়ে যান। কিন্তু নিজের জানা সত্য থেকে সরে যান না। এই কারণেই চরিত্রটি এত মানবিক।
অশোকের চাকরি চলে যায়। তাঁর মেয়েকেও সামাজিক ও পেশাগত চাপের মুখে পড়তে হয়। পরিবারকে একঘরে করার চেষ্টা হয়। অর্থাৎ সত্য বলার শাস্তি শুধু অশোককে দেওয়া হয় না; তার ছায়া গিয়ে পড়ে তাঁর পরিবারের ওপরও।
তবু শেষ পর্যন্ত তিনি একেবারে একা থাকেন না।তরুণদের একটি অংশ তাঁর পাশে দাঁড়ায়।এখানেই ছবির শেষটুকু অন্ধকারের মধ্যেও আলো রেখে যায়।
সত্যজিৎ যেন বলতে চান—একজন মানুষকে চুপ করিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু প্রশ্নকে চিরদিন চুপ করিয়ে রাখা যায় না। একটি প্রজন্ম ভুলের পাশে দাঁড়াতে পারে, আবার পরের প্রজন্ম সেই ভুলকে প্রশ্নও করতে পারে।
এই আশাটুকুই গণশত্রুকে নিছক হতাশার সিনেমা হতে দেয় না।
ছবিটির নির্মাণ নিয়ে অবশ্য সমালোচনা ছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন, অতিরিক্ত নাট্যধর্মিতা এবং সংলাপনির্ভরতা রায়ের আগের সিনেমাগুলোর স্বাভাবিক চলচ্চিত্রভাষা থেকে আলাদা। সত্যিই গণশত্রু তাঁর সবচেয়ে দৃশ্যনির্ভর সিনেমা নয়। বরং এটি অনেকটা মঞ্চনাটকের মতো করে মানুষের মতাদর্শের সংঘর্ষকে সামনে আনে।
কিন্তু সেই সরলতার মধ্যেই রয়েছে ছবিটির শক্তি।এখানে রায় কোনো জটিল রহস্য তৈরি করেননি। দর্শক খুব তাড়াতাড়িই জেনে যায় সত্য কী।
আসল উত্তেজনা অন্য জায়গায়—মানুষ কি সত্য মেনে নেবে?অশোকের আবিষ্কার সত্য কি না, সেটি আসল প্রশ্ন নয়।প্রশ্ন হলো—সত্য জানার পরও মানুষ কি নিজের স্বার্থ, বিশ্বাস ও ভয়কে অতিক্রম করতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর আজও সহজ নয়।
আজও কখনো বিজ্ঞান মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়। কখনো তথ্য স্বার্থের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়। কখনো একজন মানুষ এমন কিছু সত্য বলে ফেলেন, যা শুনতে সমাজের ভালো লাগে না।
তখন সত্য বলার মানুষটিই হয়ে উঠতে পারেন অসুবিধাজনক।গণশত্রু তাই ১৯৯০ সালের একটি সিনেমা হয়েও আশ্চর্য রকম সমকালীন।ছবির শেষে অশোকের সামনে একটি নতুন পথ খুলে যায়। তাঁর পাশে দাঁড়ায় তরুণেরা। তাঁর কণ্ঠ আর একা থাকে না।
সেখানেই সত্যজিৎ রায় তাঁর সবচেয়ে সুন্দর আশাটুকু রেখে দেন।
সত্য হয়তো সঙ্গে সঙ্গে জয়ী হয় না।কখনো সত্য বলার মানুষকে অপমানিত হতে হয়। একঘরে হতে হয়। চাকরি হারাতে হয়। এমনকি নিজের পরিচিত মানুষের কাছেও শত্রু হয়ে যেতে হয়। তবু সত্যের পাশে দাঁড়ানোর একজন মানুষই কখনো কখনো অন্য একজনকে সাহসী করে তোলে। তারপর আরেকজনকে। তারপর একটি প্রজন্মকে।
এই কারণেই গণশত্রু আমার কাছে শুধু একজন ডাক্তারের গল্প নয়। এটি বিবেকের গল্প। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিড়ে নিজের বোধটুকু হারিয়ে না ফেলার গল্প। সত্যজিৎ রায় যেন খুব শান্তভাবে বলে যান—সবাই ভুল বলছে বলে সত্য ভুল হয়ে যায় না।
আর কখনো কখনো সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সবচেয়ে বড় মূল্য হলো—গণশত্রু হয়ে যাওয়া।তবু আশা বেঁচে থাকে। ধীরে হলেও সত্য মানুষকে প্রভাবিত করে, জয়ী করে।
সেলিম পারভেজ
লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী

