পারস্য: যে সভ্যতা কখনো পরাজিত হয়নি



কয়েক হাজার বছর ধরে বিশ্বের প্রভাবশালী সাম্রাজ্যগুলো একই ভুল বারবার করে আসছিল।  পারস্য সভ্যতাকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারবে , এমন অলীক কল্পনায় তারা খোলা তরবারি নিয়ে ইরানি মালভূমির দিকে অগ্রসর হয়েছিল।

 আলেকজান্ডারের ম্যাসিডোনীয় বাহিনী, রোমান সৈন্যদল, আরব খিলাফতের সেনাবাহিনী, চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল—সবাই কোনো না কোনো সময়ে পারস্যকে পরাজিত করেছে। রাজধানী দখল হয়েছে, রাজবংশের পতন হয়েছে, শহর ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বিজয়ীরা শেষ পর্যন্ত পারস্যকে মুছে ফেলতে পারেনি। বরং বহু ক্ষেত্রেই ঘটেছে উল্টোটা—পারস্য তার বিজয়ীদেরই নিজের সংস্কৃতির অংশ বানিয়ে নিয়েছে।

এই ভূখণ্ডে কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। এলাম ছিল ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক প্রাচীন শক্তিশালী রাষ্ট্র, যার রাজধানী ছিল সুসা। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দেই এলামের সঙ্গে আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের লিখিত চুক্তির প্রমাণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রাচীন ইতিহাসেও ইরানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

পরবর্তীকালে উত্তর দিক থেকে ইন্দো-ইরানীয় জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। তাদের পরিচয়ের সঙ্গে ‘আর্য’ শব্দটি যুক্ত ছিল এবং তাদের মাতৃভূমির ধারণা থেকেই ধীরে ধীরে ‘ইরান’ নামের উৎপত্তি। তারা স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে মেডিস ও পারস্যসহ বিভিন্ন শক্তিশালী গোষ্ঠী গড়ে তোলে।

কিন্তু ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ছিল শুধু সেনাবাহিনী নয়—ছিল একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ধারণা। জরথুস্ত্রবাদ পৃথিবীকে সত্য ও মিথ্যা, আলো ও অন্ধকারের এক মহাজাগতিক সংগ্রাম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। আহুরা মাজদা ছিলেন সত্য ও আলোর প্রতীক; তার বিপরীতে ছিল অশুভের শক্তি। এই ধর্মীয় চিন্তায় পৃথিবীর একটি শুরু এবং একটি অনিবার্য শেষের ধারণাও ছিল—চূড়ান্ত বিচার, অশুভের পরাজয় এবং জগতের শুদ্ধিকরণ।

এই ধারণাগুলোর কিছু পরবর্তীকালে ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলামি চিন্তায়ও প্রতিফলিত হয়। বিশেষ করে পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে ইহুদিদের দীর্ঘ যোগাযোগের সময় এই প্রভাব আরও গভীর হয়েছিল বলে ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন।

এরপর আসে পারস্যের প্রথম মহান সাম্রাজ্য—আখেমেনীয় সাম্রাজ্য। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে সাইরাস দ্য গ্রেট পারস্য ও মেডীয়দের একত্রিত করে বিশাল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি শুধু ভূখণ্ড জয় করেননি; বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতিকে সাম্রাজ্যের ভেতরে জায়গা দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর উত্তরসূরি দারিয়ুস সাম্রাজ্যকে আরও বিস্তৃত করেন। প্রশাসনিক অঞ্চল, করব্যবস্থা, স্বর্ণমুদ্রা এবং দ্রুত যোগাযোগের জন্য সড়কব্যবস্থা গড়ে ওঠে। একসময় পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক মানুষ পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনে বাস করত।

গ্রিকদের সঙ্গে যুদ্ধ পারস্য সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি। থার্মোপিলির ‘৩০০ স্পার্টান’ আজ পশ্চিমা জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে কিংবদন্তি হয়ে আছে। কিন্তু গ্রিক-পারস্য যুদ্ধের সামগ্রিক ইতিহাস ছিল আরও জটিল। পারস্য শেষ পর্যন্ত গ্রিসকে সরাসরি দখল করতে না পারলেও গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলোর রাজনীতিতে অর্থ ও কূটনীতির মাধ্যমে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল।

আখেমেনীয় সাম্রাজ্যের পতন আসে ম্যাসিডোনিয়ার তরুণ রাজা আলেকজান্ডারের হাতে। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ সালের দিকে তিনি পারস্য সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেন এবং পার্সিপলিস ধ্বংস করেন। মনে হয়েছিল, পারস্যের হাজার বছরের সভ্যতার এখানেই শেষ।

কিন্তু এখানেই শুরু হয় ইরানের সবচেয়ে বিস্ময়কর ক্ষমতা—বিজয়ীকে আত্মসাৎ করার ক্ষমতা।

আলেকজান্ডার নিজেই পারস্যের পোশাক ও রাজদরবারের রীতি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর গ্রিক সেলিউসিড শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও কয়েক শতাব্দীর মধ্যে পার্থিয়ানরা গ্রিকদের সরিয়ে দিয়ে আবার ইরানি রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটায়। পার্থিয়ান অশ্বারোহী বাহিনী রোমান সাম্রাজ্যের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধেও সফলভাবে লড়াই করে।

২২৪ খ্রিস্টাব্দে সাসানিদদের উত্থানের মাধ্যমে পারস্য আবার শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। জরথুস্ত্রবাদ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে। প্রায় চার শতাব্দী ধরে সাসানিদ ইরান রোমান ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান পরাশক্তি হিসেবে টিকে থাকে।

কিন্তু দীর্ঘ যুদ্ধ সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দেয়। সপ্তম শতাব্দীতে আরব উপদ্বীপ থেকে ইসলামের পতাকাতলে নতুন শক্তির উত্থান ঘটে। ৬৫১ সালে সাসানিদ সাম্রাজ্যের পতন হয় এবং পুরো ইরান আরব শাসনের অধীনে চলে যায়।

এবার মনে হতে পারে, পারস্যের স্বাতন্ত্র্য চিরতরে শেষ হয়ে গেল। নতুন ধর্ম এসেছে, নতুন শাসক এসেছে, নতুন ভাষা এসেছে। কিন্তু আবারও ইতিহাস অন্য গল্প বলল।

ইরানিরা ইসলাম গ্রহণ করলেও নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় হারায়নি। বরং আব্বাসীয় যুগে পারস্যের আমলা, পণ্ডিত ও সাহিত্যিকরা মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রশাসন ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেন। পারস্যের প্রশাসনিক ঐতিহ্য আরবি সাম্রাজ্যের কাঠামোর অংশ হয়ে যায়। ফারসি ভাষাও টিকে থাকে এবং পরবর্তীকালে সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান ভাষায় পরিণত হয়।

তারপর আসে আরও ভয়াবহ আঘাত—চেঙ্গিস খানের মোঙ্গল আক্রমণ। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মোঙ্গলরা ইরানের অসংখ্য শহর ধ্বংস করে এবং সেচব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি করে। কিন্তু কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই আবার সেই পুরোনো গল্প। মোঙ্গল শাসকরাই ইসলাম গ্রহণ করল, ফারসি ভাষা গ্রহণ করল এবং পারস্য শিল্প-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠল।

তৈমুরও ছিলেন ভয়ংকর বিজেতা। অথচ তাঁর উত্তরসূরি তৈমুরিরা পারস্য শিল্প, স্থাপত্য, কবিতা ও ক্ষুদ্রচিত্রকলার এক অসাধারণ নবজাগরণ ঘটায়। অর্থাৎ ইরানকে যারা জয় করেছিল, সময়ের সঙ্গে তারাই ইরানি সংস্কৃতির ধারক হয়ে উঠেছিল।

১৫০১ সালে শাহ ইসমাইল সাফাভিদ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ইরানকে আবার একত্রিত করেন। সাফাভিদরা শিয়া ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে ইরান সুন্নি-প্রধান মুসলিম বিশ্বের বৃহৎ অংশ এবং বিশেষ করে উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয় লাভ করে। আধুনিক ইরানের পরিচয় নির্মাণে এই সময়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে রুশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান তার বিশাল ভূখণ্ডের একটি অংশ হারায়। পরে ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্যের ‘গ্রেট গেম’-এর মধ্যে ইরান পরিণত হয় প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তির প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র। ব্রিটিশরা তেল সম্পদের দিকে নজর দেয়, রুশরা উত্তরে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে। ইরান ক্রমেই বিদেশি শক্তির চাপের মধ্যে পড়ে।

১৯২৫ সালে রেজা শাহ পাহলভী ক্ষমতায় এসে আধুনিকীকরণ ও শিল্পায়নের উদ্যোগ নেন। ১৯৩৫ সালে তিনি বিশ্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির জন্য ‘ইরান’ নাম ব্যবহারের আহ্বান জানান। ‘পারস্য’ নামটি বহির্বিশ্বে পরিচিত হলেও ‘ইরান’ ছিল দেশটির নিজস্ব ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত নাম। এই পরিবর্তন ছিল কেবল নাম পরিবর্তন নয়; এর মধ্যে ছিল একটি রাজনৈতিক বার্তা—ইরান কোনো অতীতের ধ্বংসাবশেষ নয়, বরং প্রাচীন শিকড়ের ওপর দাঁড়ানো একটি আধুনিক জাতি।

এরপর আসে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব। রাজতন্ত্রের পতন ঘটে, প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী প্রজাতন্ত্র এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।

আজ ‘ইরান’ শব্দটি শুনলে আমাদের মনে আসে ভূ-রাজনীতি, নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক কর্মসূচি, সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা। অথচ ‘পারস্য’ শব্দটি এখনও এক ভিন্ন জগতের দরজা খুলে দেয়—কবিতা, কার্পেট, স্থাপত্য, শিল্প, সুফিবাদ ও এক হারানো মহিমার স্মৃতি।

দুটি নাম, অথচ দেশ একটাই।

‘পারস্য’ তার অতীতের স্মৃতি; ‘ইরান’ তার বর্তমান পরিচয়। আর এই দুইয়ের মাঝখানেই লুকিয়ে আছে পাঁচ হাজার বছরের এক অসাধারণ ইতিহাস।

ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই—একটি সাম্রাজ্যকে পরাজিত করা যায়, একটি রাজধানী দখল করা যায়, একটি রাজবংশকে ধ্বংস করা যায়; কিন্তু একটি গভীর সংস্কৃতিকে পরাজিত করা এত সহজ নয়।

আলেকজান্ডার পারস্য জয় করেছিলেন। আরবরা পারস্য জয় করেছিল। মোঙ্গলরা পারস্য জয় করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে পারস্যের সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।

তাই ইরানের ইতিহাস শুধু যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যের ইতিহাস নয়। এটি টিকে থাকার ইতিহাস। পরিচয় রক্ষার ইতিহাস। আর এমন এক সভ্যতার ইতিহাস, যে বারবার পরাজিত হয়েছে—কিন্তু কখনো পুরোপুরি হারেনি।

সম্ভবত ইরানের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ আজও চলছে—অতীতে আমরা যা ছিলাম, বর্তমানে আমরা যা, আর পৃথিবী আমাদের যেভাবে দেখতে চায়—এই তিনের মধ্যে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x