মানুষের প্রথম গানটি কবে তৈরি হয়েছিল, আমরা জানি না। প্রথম মানুষটি কখন আকাশের দিকে তাকিয়ে কোনো অচেনা সুর তুলেছিল, তারও কোনো ইতিহাস নেই। কিন্তু একটা বিষয় প্রায় নিশ্চিত—মানুষ কথা শেখার আগেই হয়তো সুর চিনেছিল।
মায়ের কণ্ঠে শিশুর ঘুমিয়ে পড়া, বৃষ্টির শব্দে মন ভালো হয়ে যাওয়া, দূরের আজানের ধ্বনি, নদীর ঢেউ, পাখির ডাক—প্রকৃতি যেন চারদিকে সুর ছড়িয়ে রেখেছিল। মানুষ শুধু সেই সুরকে নিজের মতো করে তুলে নিয়েছে।
তাই আমার কাছে সঙ্গীত স্রষ্টার প্রতিরূপ।
মানুষের তৈরি, অথচ মানুষের চেয়েও বড় কোনো অনুভূতির কাছে পৌঁছে দেয় যে জিনিস—তার নাম সঙ্গীত।
ইরানের নোহা—শোকও যখন সুর হয়ে যায়
ইরানের শিয়া সংস্কৃতিতে নোহা ও মারসিয়া শুধু গান নয়; এগুলো স্মরণ, শোক ও বিশ্বাসের সংগীত। কারবালার বেদনা, ইমাম হোসাইনের শাহাদাত—এসবের স্মরণে যখন কণ্ঠ উঠতে থাকে, তখন কান শুধু সুর শোনে না, মানুষের দীর্ঘ ইতিহাসের কান্নাও শুনতে পায়।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, পৃথিবীর প্রায় সব সভ্যতাই কোনো না কোনোভাবে মৃত্যুর জন্য গান তৈরি করেছে।
মানুষের চোখের জলকে সুরে পরিণত করার ক্ষমতা অন্য কোনো প্রাণীর নেই।
আজারবাইজানের মুগাম—সুরের ভেতর এক অদৃশ্য যাত্রা
আজারবাইজানের মুগাম শুনলে মনে হয়, গান আসলে কোথাও যাওয়ার নাম। এর সুর সরল পথে হাঁটে না; ধীরে ধীরে ঘুরে, থামে, আবার উঠে যায়। যেন মানুষের মনের ভেতরের কোনো অদৃশ্য দরজা খুলছে।
মুগাম মূলত উচ্চমাত্রার improvisation বা তাৎক্ষণিক সৃজনশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক ঐতিহ্যবাহী সংগীতধারা। UNESCO-ও একে আজারবাইজানের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আর এই সঙ্গীতের সঙ্গে শুশা শহরের সম্পর্ক গভীর। শুশাকে আজারবাইজানে দীর্ঘদিন ধরে সংগীতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়; UNESCO-র একটি নথিতেও শহরটিকে ‘temple of Azerbaijani music’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুশার নাম শুনলে ইতিহাসও মনে পড়ে। আলেকজান্ডারের সময়ের সুসার সঙ্গে অবশ্য শুশাকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। ৩২৪ খ্রিস্টপূর্বে প্রাচীন পারস্যের Susa নগরে আলেকজান্ডার যে বিখ্যাত গণবিবাহের আয়োজন করেছিলেন, সেটি আজকের Azerbaijan-এর Shusha নয়।
ইতিহাসকে ভুল করে রোমান্টিক করার চেয়ে সত্য ইতিহাসের মধ্যেই সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া ভালো।
তুরস্ক—সুফির ঘূর্ণি আর কানুনের সুর
তুরস্কের সংগীতে ঢুকলে আরেক পৃথিবী। সুফি সংগীত সেখানে শুধু শ্রবণের বিষয় নয়, আত্মার যাত্রার অংশ। মেভলভি দরবেশদের ঘূর্ণন যেমন শরীরকে এক ধরনের ধ্যানের মধ্যে নিয়ে যায়, তেমনি তাদের সংগীত মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে বাধ্য করে।
আর তুর্কি কানুন—তার তারের টান যেন আঙুলের স্পর্শে আলো হয়ে বেরিয়ে আসে।
একটি ভালো কানুনের সুর শুনলে বোঝা যায়—সঙ্গীতের কোনো ভাষা নেই। সেখানে তুর্কি জানা লাগে না, ইসলাম জানা লাগে না, ইতিহাস জানা লাগে না। শুধু মানুষ হওয়াই যথেষ্ট।
স্পেনের ফ্লামেঙ্কো অন্যরকম।
এখানে গান, গিটার, হাততালি, পায়ের শব্দ—সব মিলিয়ে একটা মানুষের জীবন যেন মঞ্চে উঠে আসে।আনন্দ আছে, প্রেম আছে, আবার আছে দুঃখ, বঞ্চনা, একাকিত্ব।
ফ্লামেঙ্কো শুনলে মনে হয়—মানুষ কখনো কখনো নিজের কষ্টকেও সৌন্দর্যে পরিণত করতে পারে।আর পৃথিবীর আরেক প্রান্তে সালসা—কিউবার মাটি থেকে উঠে আসা এক ছন্দ, যার শিকড়ে আফ্রিকান ও ইউরোপীয় সংগীত-ঐতিহ্যের মিশ্রণ। নাচতে নাচতে মানুষ যেন বলে—জীবন যত কঠিনই হোক, শরীরের ভেতর এখনো ছন্দ বেঁচে আছে।
আফ্রিকার ঢোল—যেখানে ইতিহাস লেখা হয় শব্দে
আফ্রিকার বহু সমাজে ঢোল শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়। এটি ছিল যোগাযোগের মাধ্যম, উৎসবের সঙ্গী, ধর্মীয় আচার এবং সামাজিক জীবনের অংশ।
একটি ঢোলের শব্দ কখনো মানুষকে ডাকত, কখনো সতর্ক করত, কখনো আনন্দের খবর দিত। অর্থাৎ সঙ্গীতের জন্ম শুধু বিনোদনের জন্য হয়নি। সঙ্গীত মানুষকে একত্র করার জন্যও জন্মেছিল।
ভারতের রাগ—সময়ের সঙ্গে কথা বলা
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের রাগ শুনলে বোঝা যায়, একটি সুর কত দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের সঙ্গে থাকতে পারে।
ভোরের রাগ, সন্ধ্যার রাগ, বর্ষার রাগ—সময়, ঋতু, প্রকৃতি আর মানুষের মনকে একই সুতোয় বেঁধে দেয় ভারতীয় সংগীত।এখানে গান শুধু গান নয়; সময়কে শোনা।
আর বাংলায়—বাউল
বাংলার বাউল আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মানবিক সংগীতগুলোর একটি।
বাউল বলে—মানুষকে খুঁজো মানুষের ভেতর।
দেহের ভেতরেই যে অদৃশ্য মানুষ, তাকে খুঁজতে খুঁজতে বাউল গান গায়।
UNESCO বাউল গানকে বাংলাদেশের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাউল সংগীতের মধ্যে হিন্দু ভক্তি, বৌদ্ধ, বৈষ্ণব এবং সুফি প্রভাব মিলেমিশে একটি স্বতন্ত্র মানবতাবাদী ধারার জন্ম দিয়েছে।
এই কারণেই বাউল শুধু বাংলার গান নয়। এটি মানুষের গান।
রবীন্দ্রনাথ—বাংলার সংগীতকে বিশ্বমানবের কাছে নিয়ে যাওয়া
তারপর রবীন্দ্রনাথ।রবীন্দ্রসংগীতকে শুধু বাংলা গান বললে কম বলা হয়। সেখানে প্রকৃতি আছে, প্রেম আছে, মৃত্যু আছে, ঈশ্বর আছেন, মানুষের একাকিত্ব আছে, আবার মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও আছে।
বাউলদের জীবন ও সংগীত রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল—UNESCO-র বর্ণনাতেও এই প্রভাবের কথা উল্লেখ আছে।
রবীন্দ্রনাথ তাই বাংলার মাটির গানকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেলেন, যেখানে একজন জাপানি, একজন ইরানি, একজন আফ্রিকান কিংবা একজন স্প্যানিশ মানুষও নিজের অনুভূতির সঙ্গে তার সুর মিলিয়ে নিতে পারে।
তাহলে সঙ্গীত মানুষকে কী দেয়?
একজন মানুষ যখন গান শোনে, তার ভেতরে কী ঘটে?
সে কিছুক্ষণের জন্য নিজের জাত ভুলে যায়। ধর্ম ভুলে যায়। ভাষা ভুলে যায়। দেশের সীমান্ত ভুলে যায়।একজন ইরানি যখন নোহা গায়, একজন আজারবাইজানি যখন মুগাম গায়, একজন তুর্কি যখন সুফি সুরে ডুবে যায়, একজন স্প্যানিশ যখন ফ্লামেঙ্কোর তালে পা ফেলে, একজন আফ্রিকান যখন ঢোল বাজায়, একজন বাঙালি যখন বাউল গান গায়—তারা সবাই আসলে একই কাজ করে।
তারা নিজের ভেতরের মানুষটাকে বাইরে নিয়ে আসে।এই জায়গাতেই মানুষ অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা।পাখি গান গায়। কোকিল গান গায়। পাখির ডাকেও সুর আছে।
কিন্তু মানুষ সুরকে স্মৃতি বানিয়েছে, ইতিহাস বানিয়েছে, ধর্ম বানিয়েছে, প্রেম বানিয়েছে, প্রতিবাদ বানিয়েছে, শোক বানিয়েছে।মানুষ মারা গেলে তার কণ্ঠ থেমে যায়। কিন্তু তার গান থেকে যায়।
লালনের গান থেকে যায়। রবীন্দ্রনাথের গান থেকে যায়। মোজার্টের সিম্ফনি থেকে যায়। বিথোভেনের সুর থেকে যায়। আফ্রিকার ঢোল থেকে যায়। মুগামের দীর্ঘ আলাপ থেকে যায়।
ফ্লামেঙ্কোর পায়ের শব্দ থেকে যায়।
মানুষ চলে যায়। সুর থেকে যায়।হয়তো এ কারণেই সঙ্গীতকে এতটা ভালোবাসে মানুষ।কারণ আমরা সবাই জানি—আমাদের জীবন ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু একটি সুন্দর সুরের মধ্যে আমরা অমর হয়ে থাকার এক অদ্ভুত সম্ভাবনা খুঁজে পাই।
সঙ্গীত তাই শুধু কান দিয়ে শোনার বিষয় নয়। সঙ্গীত মানুষের আত্মার সবচেয়ে পুরোনো ভাষা।আর সেই ভাষার কোনো দেশ নেই।কোনো সীমান্ত নেই। কোনো ধর্ম নেই।
সুর উঠলে—মানুষ শুধু মানুষ হয়ে যায়।

