স্বাধীন বাংলাদেশের একমাত্র দুর্ভিক্ষ ( শেষ পর্ব)

পারভেজ সেলিম ।।

পৃথিবীতে একসাথে অসংখ্য মানুষ মারা যাবার সবচেয়ে বড় তিনটি কারণ হলো মহামারি, যুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষ। বারবার পৃথিবীতে এই দুর্ভিক্ষ এসে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে লক্ষ কোটি মানুষের। কখনো এই দুর্ভিক্ষ এসেছে যুদ্ধের পর আবার কখনো এসেছে  মহামারির পর ।

আমাদের এই বাংলা অঞ্ঝলেও বিভিন্ন সময়ে দেখা দিয়েছে ভয়ংকর কিছু দুর্ভিক্ষ। বাংলার সবচেয়ে প্রাচীণ দুর্ভিক্ষের খবর পাওয়া যায় খ্রিষ্ট্রপূর্ব ৩ শতকের দিকে । মহাস্থানগড়ের শিলালিপিতে এর প্রমাণ পাওয়া যায় ।

এরপরের দেড় হাজার বছরে এই অঞ্চলে বড় কোন দুর্ভিক্ষের খবর পাওয়া যায় না ।

দুই শতাব্দি আগে ইংরেজদের হাতে ক্ষমতা যাবার পর আবার দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ । ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ। শুধু খেতে না পেরে পথে ঘাটে পড়ে মারা যেতে থাকে অসহায় মানু্ষ।এর আগে এমন ভয়াবহ মানবিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়নি এই অঞ্চলের মানুষেরা। ছিয়াত্বরের মন্বান্তর, তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ ও ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ ছিল বাংলার সবচেয়ে বড় তিন দুর্ভিক্ষ । স্বাধীন বাংলাদেশের একমাত্র দুর্ভিক্ষ ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ ।

সেইসব ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের তিন পর্বের ধারাবাহিকের আজ শেষ পর্ব ।

৩. ৭৪ এর দূর্ভিক্ষ :

প্রথমে ইংরেজ ও পরে পাকিস্তান হানাদার থেকে দেশ মুক্ত হয় ১৯৭১ সালে । স্বাধীন হবার ২ বছর তিন মাসের মাথায়  দেশে দেখা দেয় ভয়াবহ খাদ্য সংকট। সরকারি হিসেবে খাবারের অভাবে মারা যায় ২৭ হাজার  মানুষ । বেসরকারি হিসেব বলছে এই সংখ্যা  ৩-৪.৫ লাখ । শুধু  খাবার অভাবে মারা যায় এতগুলো প্রাণ ।  এ সংখ্যা নিয়েও দ্বিমত আছে গবেষকদের । তার বলছেন  ৭৪ সালের দূর্ভিক্ষের ফলে মারা গেছে মোট ১৫ লাখের মতো মানুষ। কিন্তু কেন এই দুর্ভিক্ষ ?

যুদ্ধ বিধস্ত একটি দেশ। কোন কিছুই ঠিক নেই। যুদ্ধের আগের বছর ঘুর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ফসলের। এরপর যুদ্ধের সময় পুরো দেশ ধ্বংস করে দিয়ে যায় পাক আর্মিরা । পরের বছর ১৯৭৩ সালের অতি খরা আর ১৯৭৪ সালে অতিবৃষ্টিতে আবারো ব্যাপক ক্ষতি হয় ফসলের। উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক কমে যায় । ফলে নতুন জন্ম নেয়া দেশটিতে আশংকা দেখা দেয় খাদ্য সংকটের। সেই সংকট পরে রুপ দুর্ভিক্ষে। যুদ্ধ নয় এবার বাংলাদেশের মানুষ মরতে থাকে শুধু খাবারের অভাবে ।

 তবে গবেষকেরা বলছে, এই দুর্ভিক্ষ হবার প্রধান কারন শুধু খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি নয় । এর পিছনে আরো বড় কয়েকটি কারন রয়েছে । তাদের মতে এই দুভিক্ষের প্রধানতম কারন ছিল  সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি আর মজুদদার ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফা লাভের মনোভাব ।

ফড়িয়াদের মজুদের কারনে সেইসময় বাজার সবার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে গিয়েছিল। এমনিতেই খাদ্য উৎপাদন  ছিল কম, ফলে গ্রামের মানুষের ছিল খাদ্য সংকট । এর মাঝে মুনাফালোভিদের খাদ্য মজুদের ফলে বাজারে মুল্য বৃদ্ধি পেতে থাকে হুহু করে । গরীবদের নুন্যতম খাদ্য কেনার সামর্থও থাকেনা। সামাণ্য নুনের দাম এত বেড়ে গিয়েছিল যে প্রথমে মানুষ লবন ছাড়া রান্না করা খাবার খেত। পরে লবন ছাড়া খাবারও জোটা বন্ধ হয়েছে যায় অসহায় দরিদ্র মানুষ গুলোর । বিভিন্ন লঙ্গর খানা তাদের খাবার পাবার একমাত্র জায়গা ।

 চাকরি কিংবা কাজ সবকিছু ছিল নিম্নমুখি। একদিকে শ্রমের মুল্য কম অন্যদিকে খাদ্যদ্রবের দামে আগুন । সাধারন গরীর মানুষ দিশেহারা হয়ে যায়।

আর এসময় সরকারি কর্মকর্তারা অসৎ উপায়ে  সাহায্য করতে থাকে অসাধু ব্যবসায়ীদের।  তারা বেইনী হলেও মজুদদারদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের শাস্তিমুলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেননা। আর শাস্তি না হওয়ায় মুজদদারের দ্বিগুন উৎসাহে  খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয় ।

এসময় সরকার তাদের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে ত্রান বিতরন করে । কিন্তু সেখানেও বাধ সাধে দলীয় নেতা কর্মীরা। সরকারের ত্রাণ হতে থাকে লুটতারাজ। সরকারি সাহায্য গবীরদের হাতে  পৌছানোর আগেই সব খেয়ে ফেলে দলীয় লোকজন। দেশে আবার পড়ে এক ভয়াবহ সংকটে ।

 আর এর সাথে যুক্ত হয় আমেরিকার অমানবিক আচরণ।পাট রপ্তানীর জন্য  কিউবার সাথে একটি বানিজ্য চুক্তির করেছিল সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ। এই চুক্তি করার অপরাধে দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্য সহায়তার জন্য পাঠানো জাহাজ ফেরত নিয়ে যায় আমেরিকা। বিশাল এই ত্রাণের জাহাজ আমেরিকা ফিরিয়ে না নিলে হয়ত কিছু মানুষের প্রাণ বেঁচে যেত সেইসময়।

যুদ্ধ বিধস্ত দেশ, বন্যা আর খরায় উৎপাদন ব্যহত, মুনাফা লোভী মজুদারদের কারসাজি, সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারিদের  দুর্নীতি, দলীয় লোকদেরও লুটতরাজ এবং আমেরিকার অমানবিক আচরন ৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রধান কারন হিসেবে ধরা হয় ।

মুক্তিযুদ্ধের মতোই এই দুর্ভিক্ষ চলে ৯ মাস। ১৯৭৪ সালের মার্চ শুরু হওয়া দুর্ভিক্ষ শেষ হয় ডিসেম্বরে। উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামে মারা যায় সবচেয়ে বেশি মানুষ। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র দুর্ভিক্ষের ঘটনা।

(সমাপ্ত )

পারভেজ সেলিম

লেখক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published.