একজন তরুণী। নাম দয়াময়ী।
বয়স খুব বেশি নয়। স্বামী উমাপ্রসাদ কলকাতায় পড়াশোনা করেন। দয়াময়ী থাকেন শ্বশুরবাড়িতে। শ্বশুর কালিকিঙ্কর রায়—জমিদার পরিবারের কর্তা, গভীর কালীভক্ত। দয়াময়ী তাঁর কাছে শুধু পুত্রবধূ নন, স্নেহের মানুষও।
সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। তারপর এক রাতে কালিকিঙ্কর একটি স্বপ্ন দেখলেন। সেই স্বপ্নই বদলে দিল একটি তরুণীর জীবন।
তিনি বিশ্বাস করলেন—দয়াময়ী আর সাধারণ মানুষ নন। তিনি স্বয়ং দেবী কালীর অবতার। একজন মানুষকে দেবী বানিয়ে দেওয়া হলো।
তারপর শুরু হলো পূজা।
এভাবে শুরু হয় সত্যজিৎ রায়ের চতুর্থ সিনেমা দেবী (১৯৬০)।
তখনও পরিচালকের বয়স চল্লিশও পেরোয়নি। এর আগে পথের পাঁচালী (১৯৫৫), অপরাজিত (১৯৫৬) ও পরশ পাথর (১৯৫৮) দিয়ে বাংলা সিনেমার ভাষাই যেন বদলে দিতে শুরু করেছেন তিনি। কিন্তু দেবীতে এসে রায় গল্প বলার চেয়েও গভীরে ঢুকে পড়লেন—মানুষের বিশ্বাসের অন্ধকারে।
আগের তিনটি সিনেমায় সত্যজিৎ সহজ সরলভাবে শুধু গল্প বলেছেন। এবারেই প্রথম সত্যজিতের চরিত্রদের দ্বান্দিক অবস্থান দেখতে পাই। চারটি মুল চরিত্র যার যার অবস্থান হতে সঠিক কিন্তু ঘটনা যখন ঘটতে থাকে তখন চরিত্রদের দ্বন্দ তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গল্প যত এগোয়, দয়াময়ী ততই নিজের চারপাশের পৃথিবী থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন।
দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতে শুরু করে। কারও অসুখ। কারও দুঃখ। কারও সন্তান নেই। কারও শেষ আশাটুকুও নেই। সবাই এসে বসে দয়াময়ীর সামনে। কেউ তাঁর পায়ে ফুল দেয়। কেউ মাথা ঠেকায়। কেউ কেউ অসুস্থ শিশুকে তাঁর পায়ের কাছে রেখে যায়।
গরীর অসহায় মানুষের এই অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে যখন পিতাপুত্রের তর্ক তুঙ্গে ঠিক তখনই এক প্রায় মৃত সন্তান অলৌকিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠে। পিতার বিশ্বাসের কাছে হেরে যায় পুত্রের যুক্তি।
এরপর হাজারে হাজারে মানুষ বিশাল প্রান্তর, নদী পেরিয়ে আসতে শুরু করে। দৃশটির চিত্রায়ন অসামান্য। ঘরের ভিতরের সিনেমাটি হঠাৎ বিশাল ক্যানভাসে রুপ নয়। পরবর্তীতে এমন দৃশ্য আমরা অনেক ক্লাসিক সিনেমায় দেখতে পাবো।
দয়াময়ী নির্বাক বসে থাকেন। চোখের সামনে মানুষের বিশ্বাস জমতে থাকে। তাঁর নিজের ভেতরে তখন কী চলছে? তিনি নিজেই হয়ত জানেন না—তিনি কে। তিনি কি দেবী?নাকি সেই আগের দয়াময়ী?
এই প্রশ্নটিই দেবী-র সবচেয়ে বড় ভয়।
কারণ অন্ধবিশ্বাস শুধু বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয় না। কখনো কখনো চারপাশের মানুষের অটল বিশ্বাস ধীরে ধীরে একজন মানুষের নিজের মনেও ঢুকে পড়ে। দয়াময়ীর মধ্যেও সেই সংশয় জন্ম নেয়—তবে কি সত্যিই সে দেবী?
সত্যজিৎ রায় কালিকিঙ্করকে কোনো সরল ধর্মান্ধ খলনায়ক হিসেবে আঁকেননি। এটাই চরিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি। কালিকিঙ্কর দয়াময়ীকে ভালোবাসেন। তাঁর বিশ্বাসে কোনো অভিনয় নেই। তিনি সত্যিই মনে করেন, ঈশ্বর তাঁকে স্বপ্নের মাধ্যমে একটি সত্য জানিয়েছেন।
এখানেই ভুল বিশ্বাস আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
কারণ মানুষ যখন নিজের ভুলকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, তখন তাকে আর সহজে বোঝানো যায় না। কালিকিঙ্করের কাছে দয়াময়ী সত্যিই দেবী। তাই তাঁর করা কাজ তাঁর নিজের চোখে অন্যায় নয়। তিনি বরং মনে করেন, তিনি ঈশ্বরের ইচ্ছাই পালন করছেন।
অন্যদিকে উমাপ্রসাদ। কলকাতায় পড়াশোনা করা তরুণ। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। যুক্তিবাদী। তাঁর কাছে দয়াময়ী দেবী নন—তাঁর স্ত্রী। একজন মানুষ।
দুই প্রজন্মের দুই পৃথিবী যেন মুখোমুখি দাঁড়ায়।
একদিকে বিশ্বাস। অন্যদিকে যুক্তি। একদিকে ঈশ্বরের প্রতি আত্মসমর্পণ। অন্যদিকে মানুষের নিজের বিচারবুদ্ধির ওপর আস্থা।
উমাপ্রসাদ স্ত্রীকে এই বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করতে চান। কিন্তু ততক্ষণে দয়াময়ীর ভেতরেও বিশ্বাসের বীজ গজিয়ে উঠেছে। যে মানুষটি তাঁকে দেবী বানিয়েছে, সে তাঁর শ্বশুর। যে মানুষটি তাঁকে মানুষ হিসেবে ফিরিয়ে আনতে চায়, সে তাঁর স্বামী। আর দয়াময়ী দাঁড়িয়ে আছেন দুজনের মাঝখানে—নিজের পরিচয়টুকু আঁকড়ে ধরে থাকার শেষ চেষ্টায়।
এখানেই দেবী শুধু ধর্মের গল্প থাকে না। হয়ে ওঠে নারীর গল্প।
একজন নারীকে দেবীর আসনে বসানো হয়েছে। তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেই সম্মানের মধ্যেই তাঁর স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি স্বামীর কাছে যেতে পারেন না। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। নিজের শরীরের ওপরও তাঁর আর নিজের অধিকার নেই।সবকিছু অন্যেরা ঠিক করে দেয়। তাঁকে পূজা করা হয়, কিন্তু তাঁর কথা শোনা হয় না। আর এই জায়গায় সত্যজিৎ রায়ের প্রশ্নটি খুব নির্মম—নারীকে পূজা করা আর নারীকে স্বাধীনতা দেওয়া—দুটো কি একই কথা?
দয়াময়ীর জীবন তার উত্তর হয়ে ওঠে। না।
একজন নারীকে দেবীর আসনে বসিয়েও তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যায়। তাকে সম্মান দেওয়া হয়, পূজা করা হয়, কিন্তু মানুষ হিসেবে তার নিজের ইচ্ছা, সিদ্ধান্ত ও জীবনের অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়া হয়।
কখনো কখনো ‘দেবী’ হয়ে ওঠাই তার মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দেবী দেখতে দেখতে এই জায়গাটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে।
সত্যজিৎ রায় কোনো বক্তৃতা দেননি, কোনো সরাসরি উপদেশও দেননি। তিনি শুধু দয়াময়ীর জীবনটা আমাদের চোখের সামনে মেলে ধরেছেন। আর সেই জীবন দেখতে দেখতে আমরাই বুঝতে বাধ্য হই—কাউকে দেবী বানানো মানেই সবসময় তাকে সম্মান করা নয়; কখনো কখনো সেটিই হতে পারে তাকে বন্দি করার সবচেয়ে নির্মম উপায়।
ছবির সাদা-কালো ফ্রেম যেন সেই অস্বস্তিকে আরও ঘন করে। পুরোনো জমিদারবাড়ি। দীর্ঘ করিডর। অন্ধকার ঘর। দরজার ফাঁক দিয়ে আসা আলো। ধূপের ধোঁয়া। মন্দিরের ঘণ্টা। আর দয়াময়ীর স্থির মুখ।
চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্রের আলো-ছায়ায় দয়াময়ী কখনো দেবীমূর্তি হয়ে ওঠেন, আবার পরক্ষণেই মনে হয়—এই তো একটি অল্পবয়সী মেয়ে, যে ভয় পেয়ে গেছে।
এই দ্বৈততাই ছবিটির নান্দনিক সৌন্দর্য।
একটি দৃশ্যে তাঁর পায়ের যে অর্থ, অন্য দৃশ্যে সেই পায়ের অর্থ বদলে যায়। যে পা কিছুক্ষণ আগেও ছিল একজন তরুণীর, সেটিই মানুষের বিশ্বাসে হয়ে ওঠে দেবীর পা। মানুষ তার সামনে মাথা ঠেকায়।
একটি শরীরের পরিচয় কীভাবে বদলে যায়—রায় যেন সেটিই দেখান।
ছবির সংগীতেও রয়েছে একই দ্বন্দ্ব। ওস্তাদ আলী আকবর খানের সংগীতের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের নিজস্ব রামপ্রসাদী ঢঙের গান মিশে তৈরি করে এক অদ্ভুত আবহ। সত্যজিতের নিজের লেখা গানে ভক্তির সুর বাজে, কিন্তু সেই সুরের নিচে কোথাও যেন শোনা যায় একটা ভয় একটা চাপা দ্বন্দ।
এছাড়া কালিকিঙ্করের খড়মের আওয়াজ আবহসঙ্গীতে অন্যমাত্রা যুক্ত করে সিনেমাটিতে।
সিনেমাটি কোনো ধর্মকে মুছে দিতে চায় না। ধর্মীয় বিশ্বাসকে সরাসরি অস্বীকারও করে না। বরং প্রশ্ন তোলে বিশ্বাসের সীমা কোথায়? কোন মুহূর্তে বিশ্বাস অন্ধবিশ্বাস হয়ে ওঠে? কখন মানুষের আস্থা তার নিজের বিচারবুদ্ধিকে গ্রাস করে?
এখানে রায়ের অবস্থানটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলাম বিশ্বাসী মানুষের কাছে স্রস্টার অবতারের ধারনাটি গ্রহণযোগ্য নয়। তাই দেবী-র মূল বিশ্বাসটি হিন্দুদের কাছে যতটা ধর্মীয় আবেগের, মুসলমানদের কাছে হয়ত ততটা নয়ত।
কিন্তু ছবিটির প্রশ্নটি শুধু অবতার নিয়ে নয়। প্রশ্নটি মানুষের অন্ধবিশ্বাস নিয়ে।
কোনো অলৌকিক দাবি যাচাই না করে মেনে নেওয়া। কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা ঘটনার সঙ্গে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা জুড়ে দেওয়া। ভয়, অসহায়তা কিংবা আশার মুহূর্তে যুক্তিকে সরিয়ে রেখে বিশ্বাসের কাছে আত্মসমর্পণ করা—এসব প্রবণতা কোনো একটি ধর্মের একার নয়। সকল ধর্মের বিশ্বাসগুলোর দিকে তাকালেই এসব পাওয়া যায়।
সত্যজিৎ রায় হিন্দু সমাজের একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গল্প বলেছেন। কিন্তু তাঁর প্রশ্নটি তার চেয়েও বড়।বিশ্বাস যখন যুক্তিকে অন্ধ করে দেয়, তখন সবচেয়ে বড় বিপদ হয় মানুষের।
১৯৬০ সালে মুক্তির পর দেবী স্বাভাবিকভাবেই বিতর্ক তৈরি করেছিল। কেউ কেউ ছবিটিকে হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে দেখেছিলেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগও উঠেছিল। ছবিটি বিদেশে পাঠানো নিয়েও সরকারি পর্যায়ে আপত্তি ও দ্বিধার কথা পরবর্তী নানা লেখায় এসেছে।
কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের অবস্থান ছিল পরিষ্কার। তিনি ধর্মকে আক্রমণ করতে চাননি। তাঁর আঘাত ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে। এই পার্থক্যটি না বুঝলে দেবী-কে বোঝা কঠিন।
কারণ রায় বিশ্বাসের বিপরীতে অবিশ্বাস দাঁড় করাননি। তিনি দাঁড় করিয়েছেন প্রশ্ন করার অধিকারকে। আর দয়াময়ীর ট্র্যাজেডি তৈরি হয় ঠিক তখনই, যখন সেই প্রশ্ন করার অধিকার তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়।
শেষদিকে সেই বিশ্বাসের ভয়াবহ পরীক্ষা আসে তার ভ্রাতসপুত্রের অসুস্থতাকে ঘিরে।
ডাক্তারকে ফিরিয়ে দিয়ে অসুস্থ শিশুটিকে নিয়ে আসা হয় দয়াময়ীর কাছে। পরিবারের কর্তারা বিশ্বাস করেন—দেবীর আশীর্বাদে সে বেঁচে যাবে। দয়াময়ীর চোখেও তখন ভয়। তিনি নিজেই যেন নিজের অলৌকিক ক্ষমতাকে যাচাই করতে চায়। তাই এক রাত শিশুটি নিজের কাছে রাখতে চান।
কিন্তু শিশুটি মারা যায়।
এই শিশুর মৃত্যু যেন একসঙ্গে অনেক কিছুর মৃত্যু ঘটায়। কালিকিঙ্করের বিশ্বাসে ফাটল ধরে। দয়াময়ীর নিজের ওপরের বিশ্বাস ভেঙে পড়ে।
সন্তানের মৃত্যুতে আর্তনাদ করে ওঠে মা হরাসুন্দরী “রাক্ষুসী! আমার ছেলেটাকে খেলি!”
সবার কাছে যিনি দেবী, সন্তানের মৃত্যুর পর একজন মায়ের চোখে তিনিই হয়ে ওঠেন রাক্ষুসী।
আর দর্শকের সামনে খুলে যায় সেই নির্মম সত্য—যাকে এতদিন দেবী বলে পূজা করা হচ্ছিল, সে আসলে একজন অসহায় মানুষ।
উমাপ্রসাদ আবার তাঁকে নিয়ে চলে যেতে চান। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। দয়াময়ীর ভেতরে বিশ্বাস এত গভীরে ঢুকে গেছে যে মুক্তির দরজাও তাঁর কাছে অচেনা লাগে।
শেষ দৃশ্যটি তাই পুরো সিনেমার সবচেয়ে বেদনাময় অংশ। দয়াময়ী অন্ধকারের মধ্যে ছুটে যান। কোথায়? তার কোনো উত্তর নেই।
তিনি কি স্বামীর কাছে ফিরতে চান? নাকি সেই পুরোনো দয়াময়ীকে খুঁজছেন? নাকি পালাতে চাইছেন সেই দেবীত্ব থেকে, যে দেবীত্ব তাঁকে ধীরে ধীরে নিজের কাছ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে? তিনি ছুটতে থাকেন। কিন্তু এই দৌড় আসলে কোনো জায়গায় পৌঁছানোর দৌড় নয়।
এটি একজন মানুষের নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তার দিকে ফিরে যাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা। শেষ পর্যন্ত তিনি ভেঙে পড়েন। পর্দায় তখন কোনো দেবী নেই। আছে শুধু একজন তরুণী। একজন স্ত্রী। একজন মানুষ। যাকে অন্যেরা দেবী বানিয়েছিল। আর সেই দেবীত্বের ভারেই তার মানুষ হয়ে থাকার শেষ পথটুকুও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
শর্মিলা ঠাকুরের অভিনয় এই জায়গায় এসে অসাধারণ হয়ে ওঠে। তাঁর চোখের পরিবর্তন দিয়েই যেন ছবির পুরো গল্প বলা হয়। শুরুতে সেখানে লাজুকতা। তারপর বিস্ময়। তারপর বিশ্বাসের ছায়া। শেষে ভয়, বিভ্রান্তি এবং মানসিক ভাঙনের অন্ধকার।
দেবী শেষ করার পর আমার মনে হয়েছে, সত্যজিৎ রায় আসলে ধর্মের গল্পের মধ্য দিয়ে মানুষের পক্ষেই একটি সিনেমা বানিয়েছেন। সিনেমাটি মানুষের নিজের পরিচয়ের পক্ষে। নিজের বিবেকের পক্ষে। প্রশ্ন করার অধিকারের পক্ষে। আর নারীর নিজের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকারের পক্ষে।
ছবিটি দেখার পর সবচেয়ে বেশি যে কথাটি মনে থাকে, তা কোনো সংলাপ নয়। একটি দৃশ্য। একজন অল্পবয়সী নারী অন্ধকারের মধ্যে ছুটে যাচ্ছে। যে নারীকে সবাই দেবী বলেছিল। কিন্তু সে নিজে শুধু মানুষ হয়ে বাঁচতে চেয়েছিল।
এছাড়া সত্যজিত স্পষ্ট করেন, বিশ্বাস কিংবা যুক্তি কোনটিই আসলে স্বয়ংসম্পু্র্ন নয়। এই সমাজে হয়ত দুটিরই প্রয়োজন আছে। সিনেমায় তাই আমরা দেখি কোন না কোন কারণে চরিত্রগুলোর বিশ্বাস কিংবা যুক্তি একসময় ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু ততক্ষনে যা ক্ষতি হবার তা হয়ে গেছে।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে। সমাজ, বিশ্বাসের ভাষা, মানুষের জীবন। কিন্তু ভয়, অসহায়তা আর অলৌকিক আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা এখনো মানুষের ভেতরে আছে।
তাই ছয় দশক পরেও দেবী পুরোনো মনে হয় না। বরং আজও মনে হয়, দয়াময়ী কোথাও আমাদের খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন। হয়তো শুধু দেবীর পোশাকটি বদলে গেছে। আর সত্যজিৎ রায়ের দেবী আমাদের খুব নীরবে মনে করিয়ে দেয়—
কাউকে সম্মান করার নামে তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যায়। কাউকে দেবী বানিয়েও তাকে মানুষ থাকা থেকে বঞ্চিত করা যায়। হয়তো এটাই এই অসাধারণ সিনেমার সবচেয়ে বেদনাময় সত্য—মানুষকে দেবতা বা দেবী বানানো যত সহজ, তাকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে দেওয়া তত কঠিন।
দেবীর দ্বন্দ তাই চিরকালীন এবং চলমান।
সেলিম পারভেজ
লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী

