পলাশী থেকে দেশভাগ


সেলিম পারভেজ



( প্রথম পর্ব )

১৭৫৭ সালে পলাশীতে হেরে গেলেন শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা।। ভারত ধীরে ধীরে ইংরেজদের কবজায় চলে গেল। পলাশীতে হারলেও ভারতের মানুষ হার মেনে নেয়নি। এর সাত বছরের মাথায়, ১৭৬৪ সালে, বক্সারের যুদ্ধ হয়। বাংলার নবাব মীর কাসিম, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সম্মিলিত বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ হয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। এই যুদ্ধেও পরাজিত হয় ভারতীয় শক্তি।

এরপর ১৭৬৯-১৭৭০ সালে বাংলায় নেমে আসে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। ইতিহাসে যা পরিচিত ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে। অনাবৃষ্টি, ফসলহানি, খাদ্যশস্যের মজুতদারি এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কঠোর রাজস্বনীতি এই দুর্ভিক্ষকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। বহুল উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, প্রায় এক কোটি মানুষ মারা যায় এই দুর্ভিক্ষে। অর্থাৎ তৎকালীন বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ক্ষুধায় মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ে। বাংলার ইতিহাসে এটি ছিল এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

এই সময়েই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রিটিশবিরোধী ফকির-সন্ন্যাসী প্রতিরোধ আরও জোরালো হয়ে ওঠে। ১৭৭১ সালের কাছাকাছি সময়ে ১৫০ জন ফকিরকে হত্যার অভিযোগের উল্লেখ পাওয়া যায় ফকির নেতা মজনু শাহের একটি চিঠিতে। রংপুর, নাটোর, রাজশাহীসহ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এই প্রতিরোধ।

টিপু সুলতান তো একাই ব্রিটিশদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। ১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তনমের যুদ্ধে নিহত হন তিনি।

বাঁশের কেল্লা গড়ে তিতুমীর ১৮৩১ সালে আরেক বিপ্লব করে বসেছিলেন। ১৯ নভেম্বর ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন তিনি। হাজী শরীয়তউল্লাহ যে ধর্মীয় ফরায়েজি আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তা মূলত ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে পরিণত হয়।

১৮৪০ সালে মারা যান তিনি। এরপর ছেলে দুদু মিয়া কয়েক দশক ধরে জীবিত রাখেন এই আন্দোলন।

১৮৫৭ সালে সিপাহিরা সশস্ত্র বিদ্রোহ করল। মুসলমান-হিন্দু একসঙ্গে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠল। ভয়ে আত্মা শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড় ইংরেজদের।

এই বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা বুঝতে পারল, ভারতীয়দের মধ্যে ঐক্য তৈরি হলে তাদের শাসন টিকিয়ে রাখা কঠিন। ভারতীয়দের মধ্যে বিভেদ তৈরির নীতি আরও গুরুত্ব পেতে শুরু করল। হিন্দু-মুসলমানের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকল। ডিভাইড অ্যান্ড রুল বা বিভাজন করে শাসন।

ব্রিটিশ কোম্পানির শাসন চলল প্রায় ১০০ বছর।

সিপাহি বিদ্রোহের পর এক বিশাল পরিবর্তন ঘটল ভারতে। ১৮৫৮ সালে ক্ষমতা কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে গেল। ভারত শাসন করত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, এখন শাসন করবে ব্রিটিশ সরকার। ব্রিটেনের রানী হবেন ভারতবর্ষের সম্রাজ্ঞী। রানী ভিক্টোরিয়া। যিনি কোনো দিন ভারতে আসেননি। ভারত হয়ে উঠল ব্রিটিশ-ভারত।

এরপর ব্রিটিশদের বিরোধী যে আন্দোলন শুরু হয়, তাতে যুক্ত হন সাধারণ মানুষেরাও। ভারতে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটতে শুরু করে।

আমরা ভারতীয়, আমাদের শাসন আমরা নিজেরাই করব। কোনো বিদেশি আমাদের শাসন করবে না। আমরা বিদেশিদের ভারত থেকে হটাব। এমন স্বপ্নের বীজ বুনতে শুরু করে ভারতের মানুষ।

যদিও প্রথম দিকে স্বায়ত্তশাসনের দিকেই তাদের নজর ছিল। আস্তে আস্তে তা পূর্ণ স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নিতে থাকে। জনপ্রিয় থেকে জনপ্রিয় হতে থাকে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব।

১৮৮৫ সালে গঠিত হয় কংগ্রেস। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষিত শ্রেণির অংশগ্রহণ ছিল বেশি। কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি হন কলকাতার মানুষ উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা হাইকোর্টের সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যারিস্টার ছিলেন তিনি।

কংগ্রেসের সঙ্গে মুসলমানদের একটি বড় অংশ এ সময় যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকল। তবে সবাই যে দূরে ছিলেন, তা নয়। ১৮৮৭ সালে বদরুদ্দিন তায়েবজি কংগ্রেসের তৃতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। অন্যদিকে আমীর আলী মুসলমানদের জন্য আলাদা সংগঠন গড়ার চেষ্টা করলেন। সৈয়দ আহমদ খান প্রকাশ্যেই বলতে থাকলেন, মুসলমানদের কংগ্রেসে যুক্ত হওয়া ঠিক হবে না।

১৮৭৭ সালে আমীর আলীর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’। মুসলমানদের শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে কাজ করত এই সংগঠন। এর কয়েক বছর পরে, ১৮৮৮ সালে, সৈয়দ আহমদ খান গড়ে তোলেন আরেক সংগঠন ‘ইউনাইটেড ইন্ডিয়ান প্যাট্রিয়টিক অ্যাসোসিয়েশন’।

পরের দশ-পনেরো বছরে ব্রিটিশদের বিভাজনমূলক নীতি, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের অবস্থান এবং হিন্দু-মুসলমানদের স্বার্থের সংঘাতের কারণে একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস বাড়তে শুরু করল। যা গত কয়েক দশক ধরে ব্রিটিশদের শাসননীতির মধ্যেও জায়গা করে নিয়েছিল। ডিভাইড অ্যান্ড রুল। এর ফলাফল দেখা দিল নতুন শতাব্দীর শুরুতে।

১৯০৫ সালে বাংলা ভেঙে দুই ভাগ হয়ে গেল। পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ তৈরি হলো, যার রাজধানী হলো ঢাকা। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বিহার ও উড়িষ্যার প্রশাসনিক ব্যবস্থা যুক্ত হলো।

বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠল। বাংলার হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণির একটি বড় অংশ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করতে থাকল। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের অনেক মুসলমান নতুন প্রদেশকে নিজেদের শিক্ষা, চাকরি ও রাজনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখতে শুরু করলেন।

বঙ্গভঙ্গ রদ করার আন্দোলন করতে লাগলেন বিরোধীরা। এই আন্দোলনে হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রভাব ছিল বেশি। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের একটি বড় অংশ এই আন্দোলন থেকে দূরে থাকলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হলেন। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর রাখিবন্ধন কর্মসূচির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের আহ্বান জানালেন। তাঁর লেখা ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটিও এ সময়ের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

১৯০৬ সালে ঢাকায় নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগ ও নেতৃত্বে গঠিত হয় মুসলিম লীগ। মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য গড়ে ওঠে এই সংগঠন। ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগে সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের অধিবেশন শেষে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। হিন্দু-মুসলমানেরা আবার একই প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে ফিরে এলেও মনের ফাটল তখনো স্পষ্ট।

এরপর পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯০৬ সালে কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন। তখনও গান্ধী ভারতে ফেরেননি।

জওহরলাল নেহেরু ইংল্যান্ড থেকে ভারতে ফেরেন ১৯১২ সালে। দিল্লি হয় ব্রিটিশ ভারতের নতুন রাজধানী। ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর বোমা হামলা হয়।

এ কে ফজলুল হক বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক হন ১৯১৩ সালে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পান।

এ কে ফজলুল হক কংগ্রেসে যুক্ত হন ১৯১৪ সালে। শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। কমাগাতামারু ঘটনা ভারতীয়দের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়।

১৯১৫ সালে মারা যান ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৪৩ বছর।

একই বছরের ৯ জানুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে ফেরেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। নতুন যুগের সূচনা হয় ভারতে।

পরববর্তী ত্রিশ বছরের  আন্দোলন সংগ্রাম আর রক্তাত্ব ত্যাগের বিনিময়ে  ঘটবে  অবিষ্মরণীয় ঘটনা। প্রায় দুইশ বছর পর হারানো স্বাধীনতা ফিরে পাবে ভারতবর্ষ ।

(চলবে..)

সেলিম পারভেজ

লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x