ঋতুপর্ণ ঘোষ: নি:সঙ্গতার নান্দনিক স্রষ্টা


সেলিম পারভেজ


একটি পুরনো বাড়ি।

একা একা থাকা এক মধ্যবয়সী নারী বনলতা। একটি সিনেমার দল তার বাড়িতে আসে শুটিং করতে। পরিচালকের প্রতি বনলতার মনে এক ধরনের অসম্ভব আকর্ষণ তৈরি হয়। সে জানে, এই মানুষটি তার হবে না। তবু হৃদয় তো যুক্তির কথা শোনে না।

শুটিং শেষ হলে দলটি চলে যায়। সিনেমায়  তার অভিনীত অংশটুকুও কেটে ফেলে দিতে হয় পরিচালকে। সবহারা মানুষটি আবারো নি;স্ব হয়ে একাকী বাড়িতে কেঁদে ওঠে । সাথে দুমড়ে মুচড়ে যায় আমারও মন ।

কিরণ খেরের অভিনয় আর ঋতুপর্ণের নির্মাণ মিলিয়ে ‘বাড়িওয়ালী’ । আমার মনে হলো বাংলা সিনেমার সবচেয়ে গভীর একাকিত্বের ছবিটি আমি দেখে ফেললাম । সন্ধান পেলাম নতুন এক সিনেমা জগতের। এরপর একে একে তার সব সিনেমা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে থাকলাম আর নতুন সিনেমার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।

সত্যজিতের পর আমার সবচেয়ে  প্রিয় পরিচালক হয়ে উঠলেন ঋতুপর্ন ঘোষ  ।

সিনেমা বানানোর পোকা যখন আমার মাথার ঢুকতে শুরু করে ঠিক তখনই ঋতুপর্ণ তার  অন্যন্য, অসাধারণ সিনেমাগুলো বানানো জারি রেখেছেন । ২১ বছরে মাত্র ১৯ সিনেমায় এসে তার সেই যাত্রা হঠাৎ থেমে যান ।

কিন্তু কিছু মানুষ হয়ত শুধু সিনেমা বানান। আর কিছু মানুষ একসময় নিজের জীবনটাকেই সিনেমা বানিয়ে ফেলেন। ঋতুপর্ণ ঘোষ দ্বিতীয় ধরনের মানুষ। তাঁকে শুধু পরিচালক বললে যেন তাঁকে ছোট করা হয়। তিনি ছিলেন গল্পকার, লেখক, সম্পাদক, বিজ্ঞাপনকর্মী, অভিনেতা, সঞ্চালক, রবীন্দ্রনাথের একনিষ্ঠ পাঠক—আর সবকিছুর ওপরে ছিলেন নিজের সময়ের এক অসাধারণ পর্যবেক্ষক। তাঁর সিনেমা দেখলে মনে হয়, ক্যামেরাটা তিনি মানুষের মুখের দিকে নয়, মানুষের ভেতরের দিকে তাক করতেন।

৩১ আগস্ট তাঁর জন্মদিন। 

কলকাতার এক মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে জন্ম তাঁর। বাবা সুনীল ঘোষ ছিলেন তথ্যচিত্র নির্মাতা ও চিত্রকর। অর্থনীতিতে পড়াশোনা করে ঋতুপর্ণ ঢুকে পড়লেন বিজ্ঞাপনের জগতে। Response India-তে কপিরাইটার হিসেবে প্রায় এক দশক কাজ করেছিলেন। সেখানে তিনি শুধু বিজ্ঞাপন লিখতেন না, শব্দকে কীভাবে মানুষের মনের দরজায় পৌঁছে দিতে হয়, তার পাঠও নিয়েছিলেন। ছোট্ট একটি বাক্যে কীভাবে একটি ব্র্যান্ডের চরিত্র তৈরি করা যায়—এই বিদ্যা পরবর্তী সময়ে তাঁর সিনেমাকেও প্রভাবিত করেছিল। বিজ্ঞাপনের জগতে তাঁর তৈরি বাংলা স্লোগানগুলো তখন আলাদা করে নজর কাড়ত।

তারপর এল সিনেমা।

১৯৯৪ সালের হীরের আংটি দিয়ে পরিচালক ঋতুপর্ণের যাত্রা শুরু। কিন্তু উনিশে এপ্রিল তাঁকে শুধু পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেনি, বাংলা সিনেমার দর্শককেও যেন নতুন করে আবিষ্কার করেছিল। মা-মেয়ের সম্পর্কের ভেতরের জমে থাকা অভিমান, ভালোবাসা, ভুল বোঝাবুঝি—এসবকে নিয়ে সিনেমা বানিয়ে তিনি দেখিয়ে দিলেন, বড় গল্পের জন্য সবসময় বড় ঘটনা লাগে না। একটি বাড়ি, দুজন মানুষ, কিছু পুরনো ক্ষত—এগুলো দিয়েও মহাকাব্য তৈরি হতে পারে। ছবিটি জাতীয় পুরস্কার জেতে এবং ঋতুপর্ণের সঙ্গে অপর্ণা সেনের এক দীর্ঘ সৃজনশীল সম্পর্কেরও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।

অপর্ণা সেনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটি আমার কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই তরুণ ঋতুপর্ণ তাঁর কাছে গিয়েছিলেন একটি চিত্রনাট্য নিয়ে। তখন তিনি বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার, আর পোশাক-পরিচ্ছদে, চেহারায়, জীবনযাপনে পরবর্তী সময়ের সেই ঋতুপর্ণকে পাওয়া যায় না। অপর্ণা সেন পরে স্মরণ করেছিলেন, সেই তরুণের মধ্যে তিনি তখনই বড় প্রতিভার সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন। সেই সম্পর্ক পরে বন্ধুত্বে, সৃজনশীল সহযাত্রায়, প্রায় পারিবারিক ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছায়। উনিশে এপ্রিল-এর ক্ষেত্রে অপর্ণা সেনের অভিনয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই তাঁর উৎসাহ, পরামর্শ ও সহযোগিতাও ছিল ঋতুপর্ণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

একসময় তিনি বিজ্ঞাপনের মানুষ। কপিরাইটার হিসেবে কাজ করেছেন। শব্দ নিয়ে কাজ করেছেন। তারপর সিনেমা বানাতে শুরু করলেন। আবার সম্পাদক হলেন। আনন্দলোক সম্পাদনা করলেন, পরে রোববার-এর মতো জনপ্রিয় সাহিত্য-সংস্কৃতির জায়গার সঙ্গে যুক্ত হলেন। টেলিভিশনে এলেন। অভিনয় করলেন। 

ঋতুপর্ণের সিনেমার সবচেয়ে বড় বিষয় সম্ভবত মানুষ। প্রেম নয়, বরং সম্পর্ক। প্রেমিক-প্রেমিকা, স্বামী-স্ত্রী, মা-মেয়ে, বাবা-মেয়ে, শিল্পী-শিল্পী, নারী-পুরুষ—মানুষের সম্পর্কের যে জায়গাগুলো আমরা সামাজিক ভদ্রতার কারণে ঢেকে রাখি, ঋতুপর্ণ সেখানেই ক্যামেরা নিয়ে ঢুকেছেন।

দহন আমাদের দেখিয়েছে যৌন সহিংসতার পর সমাজ কীভাবে ভুক্তভোগীকেই প্রশ্ন করে। বাড়িওয়ালি একাকিত্বের অন্য রূপ দেখিয়েছে। অসুখ পরিবার, অর্থ, অসুস্থতা ও মধ্যবিত্ত নৈতিকতার জট খুলেছে। উৎসব একটি পরিবারের মিলনকে ব্যবহার করেছে পরিবারের ভেতরের বিচ্ছেদ দেখানোর জন্য। চোখের বালি-তে রবীন্দ্রনাথের বিনোদিনী যেন তাঁর ক্যামেরায় নতুন শরীর পেয়েছে। দোসর-এ অবিশ্বস্ততার পরেও সম্পর্ক কীভাবে বেঁচে থাকে, সেই অস্বস্তিকর প্রশ্ন করেছেন। আবহমান-এ শিল্প, প্রেম, বয়স ও স্মৃতির সম্পর্ককে এমনভাবে দেখিয়েছেন যে শেষ পর্যন্ত বোঝা যায়—শিল্পীর জীবনেও ব্যক্তিগত সম্পর্ক কখনোই পুরোপুরি ব্যক্তিগত থাকে না।

আর দ্য লাস্ট লিয়ার-এ তিনি বাংলা ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে ইংরেজিতে সিনেমা বানালেন। তাঁর নিজের ভাষা বদলাল, কিন্তু মানুষকে দেখার চোখ বদলাল না।

ঋতুপর্ণের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর নিজের শরীর ও পরিচয়কে ঘিরে দীর্ঘ যাত্রা। তিনি এমন এক সময়ে নিজের যৌন পরিচয় ও লিঙ্গ-চেতনা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন, যখন ভারতীয় সমাজে বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি, কৌতুক, এমনকি নিষ্ঠুরতাও ছিল। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের শরীর ও পরিচয়কে লুকিয়ে রাখেননি। 

বরং ধীরে ধীরে তাঁর পোশাক, সাজ, শরীরী ভাষা এবং প্রকাশ্য উপস্থিতি হয়ে উঠেছিল তাঁর নিজের পরিচয়ের রাজনৈতিক ও নান্দনিক ঘোষণা। তবুও সমাজ তাঁকে এভাবে দেখতে অভ্যস্ত ছিল না। অনেকে হাসল। অনেকে বিদ্রূপ করল। অনেকে প্রশ্ন তুলল।

তিনি থামলেন না। এই জায়গায় এসে আমার মনে হয়, ঋতুপর্ণের নিজের জীবনটাই যেন তাঁর সবচেয়ে বড় সিনেমা।

এখানেই চিত্রাঙ্গদাকে আলাদা করে দেখতে হয়।

রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা ঋতুপর্ণের কাছে কেবল একটি সাহিত্যকর্ম ছিল না; নিজের জীবনকে বোঝারও একটি আয়না ছিল। রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা নিজের পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে—আমি আসলে কে? আমি কি অন্যের চোখে সুন্দর হয়ে উঠব, নাকি নিজের মতো থাকব? ঋতুপর্ণ সেই প্রশ্নটিকেই আধুনিক শরীর, প্রেম, যৌনতা ও পরিচয়ের সংকটের সঙ্গে মিলিয়ে চিত্রাঙ্গদা: দ্য ক্রাউনিং উইশ বানালেন। ছবিটি রবীন্দ্রনাথের চিত্রা-র ওপর loosely based হলেও আসলে এটি হয়ে উঠেছিল ঋতুপর্ণের নিজের আত্মপরিচয়ের এক গভীর শিল্পিত অনুসন্ধান।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে ছিলেন প্রায় একটি ব্যক্তিগত মহাবিশ্ব। চোখের বালি, নৌকাডুবি, চিত্রাঙ্গদা—এসবের বাইরে তাঁর কাজেও রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান, ভাবনা ফিরে ফিরে এসেছে। মৃত্যুর পর প্রচারিত জীবনস্মৃতিও ছিল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর গভীর ব্যক্তিগত অনুরাগের একটি প্রকাশ। গবেষণাতেও তাঁর এই দীর্ঘ রবীন্দ্র-সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের প্রতি ঋতুপর্ণের আকর্ষণের কারণ খুব গভীরে। রবীন্দ্রনাথ যেমন তাঁর সময়ের সমাজের ভেতরে থেকেও সময়কে অতিক্রম করেছিলেন, ঋতুপর্ণও তেমনই বাঙালি মধ্যবিত্তের ঘর থেকে গল্প নিয়ে সেই মধ্যবিত্তের অস্বস্তিগুলোকে তার মুখের সামনে ধরে দিয়েছিলেন। দুজনেরই বিষয় ছিল মানুষ—তার আকাঙ্ক্ষা, দ্বন্দ্ব, স্বাধীনতা, ভালোবাসা এবং নিজের মতো হয়ে ওঠার সংগ্রাম।

ঋতুপর্ণ অভিনেতাদেরও অন্যভাবে দেখতে শিখিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে একজন “actor’s director”। তাঁর হাতে অনেক অভিনেতা যেন নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, রাইমা সেন, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, জিশু সেনগুপ্ত, কিরণ খের, ঐশ্বরিয়া রাই, দীপ্তি নাভাল—অনেকের অভিনয়জীবনে ঋতুপর্ণের সিনেমা গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হয়ে এসেছে।

প্রসেনজিৎকে আমরা একসময় মূলত বাণিজ্যিক ছবির নায়ক হিসেবে চিনতাম। ঋতুপর্ণ তাঁকে অন্য আলোয় দেখলেন। চোখের বালি, দোসর, —এই ছবিগুলো শুধু প্রসেনজিৎকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেনি, দর্শকের চোখকেও বদলে দিয়েছিল। ঋতুপর্ণ বুঝেছিলেন, একজন অভিনেতার ভেতরে যে মানুষটি লুকিয়ে আছে, তাকে বের করে আনতে হলে তার আগের ইমেজটাকে কখনো কখনো ভেঙে ফেলতে হয়।

আর এখানেই তাঁর নিজের জীবন ও সিনেমা আবার এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়।

তিনি অন্যদের যেমন নতুন করে দেখেছিলেন, তেমনই নিজেকেও নতুন করে আবিষ্কার করেছিলেন। তরুণ কপিরাইটার থেকে পরিচালক। পরিচালক থেকে সম্পাদক। সম্পাদক থেকে টেলিভিশন সঞ্চালক। তারপর অভিনেতা। তারপর নিজের শরীর ও পরিচয়ের প্রকাশ্যে নতুন এক রূপান্তর। তাঁর এই পরিবর্তনকে কেউ দেখেছে সাহস হিসেবে, কেউ দেখেছে বিতর্ক হিসেবে, কেউ বিদ্রূপ করেছে। কিন্তু ঋতুপর্ণ শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনকে অন্যের অনুমোদনের ওপর ছেড়ে দেননি।

তাঁর পোশাক নিয়ে কথা হয়েছে। তাঁর শরীর নিয়ে কথা হয়েছে। তাঁর যৌনতা নিয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু তিনি সম্ভবত সবচেয়ে বড় উত্তরটি দিয়েছেন তাঁর সিনেমা দিয়ে।

তিনি যেন বলেছেন—আমাকে আমার শরীর দিয়ে বিচার কোরো না; আমার গল্পগুলো দিয়ে আমাকে পড়ো।

২০১৩ সালের ৩০ মে খবরটা এল। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে কলকাতার বাড়িতে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তিনি তখনও কাজ করছিলেন। সত্যান্বেষীর শুটিং শেষ করেছিলেন মৃত্যুর মাত্র দুদিন আগে। মানুষটি যেন জীবনভর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করেছেন, আর মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সময় তাঁকে কোনো প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দিল না।

খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর কলকাতার নন্দনে হাজার হাজার মানুষ তাঁকে শেষবার দেখতে গিয়েছিল। বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষ দাঁড়িয়েছিল। যে শহরের মধ্যবিত্ত ঘরে ঘরে তিনি এতদিন ঢুকেছিলেন সিনেমার পর্দা দিয়ে, সেই শহর এবার তাঁকে বিদায় জানাতে রাস্তায় নেমেছিল।

ঋতুপর্ণ চলে যাওয়ার পর তাঁর সিনেমাগুলো দেখলে এখন অন্যরকম লাগে। আগে উনিশে এপ্রিল ছিল মা-মেয়ের গল্প; এখন মনে হয়, এটি আসলে অসম্পূর্ণ কথোপকথনের গল্প। আগে উৎসব ছিল একটি পরিবারের গল্প; এখন মনে হয়, এটি বিচ্ছেদের গল্প। আগে আবহমান ছিল শিল্পীর গল্প; এখন মনে হয়, এটি সময়ের কাছে মানুষের পরাজয়ের গল্প। আর চিত্রাঙ্গদা দেখলে মনে হয়, একজন মানুষ তাঁর নিজের শরীরের ভেতর দাঁড়িয়ে নিজেকেই খুঁজছেন।

তাঁর মৃত্যুর পর সবচেয়ে বেশি যে কথাটি মনে হয়, তা হলো—ঋতুপর্ণ আসলে খুব কম বয়সেই চলে গেলেন। ৪৯ বছর কোনো শিল্পীর জন্য শেষ বয়স নয়। বরং তাঁর ক্ষেত্রে মনে হয়, তিনি তখনও তাঁর সবচেয়ে বড় কিছু কাজ করার পথে ছিলেন। কিন্তু শিল্পীর জীবন আর ক্যালেন্ডারের জীবন এক নয়। একজন শিল্পী কত বছর বেঁচে ছিলেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনি তাঁর সময়কে কতটা বদলে দিয়ে গেছেন।

ঋতুপর্ণ বাংলা সিনেমার দর্শককে বদলে দিয়েছিলেন।

তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন, একটি সিনেমার জন্য যুদ্ধ, বন্দুক, রক্ত, রাজনীতি সবসময় দরকার হয় না। একটি ডাইনিং টেবিলও যথেষ্ট। একটি শোবার ঘরও যথেষ্ট। একটি মায়ের মুখ, একটি মেয়ের চোখ, একটি অসমাপ্ত সম্পর্ক, একটি পুরনো চিঠি—এসব দিয়েও সিনেমা তৈরি করা যায়।

আর সবচেয়ে বড় কথা, তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন মানুষকে একটু কম বিচার করতে।

ঋতুপর্ণকে বোঝার চমৎকার কয়েকটি  চাবিকাঠি আছে। বিজ্ঞাপন তাঁকে শিখিয়েছিল সংক্ষিপ্ততার শক্তি, আর সাহিত্য তাঁকে শিখিয়েছিল নীরবতার শক্তি। ফলে তাঁর সিনেমায় সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংলাপের বাইরের বিরতিটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত। একজন মানুষ কী বলছে, তার চেয়ে অনেক সময় সে কী বলছে না—ঋতুপর্ণ যেন সেটাই শুনতে চাইতেন।

ঋতুপর্ণের সিনেমাগুলোর দিকে ফিরে তাকালে একটা জিনিস খুব স্পষ্ট হয়—তিনি আসলে মানুষের একাকিত্বের পরিচালক ছিলেন।

‘বাড়িওয়ালী’র বনলতা একা। ‘তিতলি’র ভালোবাসা একা। ‘দহন’-এর নারী সমাজের মধ্যে থেকেও একা। ‘উৎসব’-এর পরিবার একসঙ্গে থেকেও একা। ‘দোসর’-এর দাম্পত্য একসঙ্গে থেকেও একা। ‘আবহমান’-এর মানুষগুলো ভালোবাসার মধ্যে থেকেও একে অপরের কাছে পুরোপুরি পৌঁছাতে পারে না।সম্ভবত এ কারণেই তাঁর সিনেমাগুলো আমার এত ভালো লাগে। কারণ আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে একা।

পরিবার আছে, বন্ধু আছে, ভালোবাসা আছে, কাজ আছে—তবু মানুষের ভেতরে এমন একটা ঘর থাকে, যেখানে সে শেষ পর্যন্ত একাই থাকে। ঋতুপর্ণ সেই ঘরের দরজাটা খুলে একাকিত্বের বা নি;সঙ্গতার সৌন্দর্য  নান্দনিকভাবে দেখিয়েছেন।

তাঁকে শুধু “জাতীয় পুরস্কারজয়ী পরিচালক” বলে মনে করতে ইচ্ছে করে না। মনে করতে ইচ্ছে করে সেই তরুণ কপিরাইটারকে, যে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞাপনের লাইন লিখত; সেই তরুণকে, যে অপর্ণা সেনের বাড়িতে গিয়ে নিজের লেখা পড়ে শোনাত; সেই পরিচালককে, যে বাংলা মধ্যবিত্তকে আবার সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনল; সেই সম্পাদককে, যে সিনেমার বাইরেও লিখত; সেই মানুষটিকে, যে রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদার ভেতরে নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেল; এবং শেষ পর্যন্ত সেই মানুষটিকে, যে নিজের জীবনটাকেও অন্যের মতো করে বাঁচতে অস্বীকার করেছিল।

ঋতুপর্ণ ঘোষ তাই আমার কাছে কেবল একজন প্রিয় পরিচালক নন। তিনি একটি সময়ের নাম। একটি রুচির নাম। একটি সাহসের নাম। আর হয়তো সবচেয়ে বেশি—নিজেকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করার নামই হয়ত ঋতুপর্ণ ঘোষ ।


সেলিম পারভেজ

লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x