পারভেজ সেলিম
একদিন ধরা দিল ‘সহজ’ আমার প্রাণে। খুব প্রয়োজনে খুঁজতে গিয়ে… কানে বেজে উঠল সুমন্ত্র সেনগুপ্তের কন্ঠে জীবনানন্দের ‘সহজ’। আহা।
গভীর রাতে এক রং, সকালে ঘুম ভেঙ্গে অন্য আরেক রুপ রস গন্ধে ভরে গেল প্রাণ। বোধের পথ প্রশস্থ হলো জীবননান্দে। ‘সহজ’ হয়ে গেল সুন্দর।
কবিতাটা পড়েছি আগে। কিন্তু কি এক বিষ্ময়ে আজ চৌচির করা আলতো রং এ ধরা পড়লো মনে আর মগজে।
শেষের লাইন ‘এক রাত্রি দিতে পারে যত’।
পুরো গল্প যেন শেষের লাইনে শুরু। এক রাতের গল্প। শুরুতেই
‘আমার এ গান
কোনোদিন শুনিবে না তুমি এসে–
আজ রাত্রে আমার আহ্বান
ভেসে যাবে পথের বাতাসে–’
কোন এক রাতে কবির মনে গান এল। সেই গান যাকে লক্ষ্য করে, সে শুনতে পাবেনা। তবু আসছে সেই গান।
তবুও হৃদয়ে গান আসে!
ডাকিবার ভাষা
তবুও ভুলি না আমি–
তবু ভালোবাসা
জেগে থাকে প্রাণে!
পৃথিবীর কানে
নক্ষত্রের কানে
তবু গাই গান!
কি অবলিলায় বলে গেল সেই আকুতি আশ্বাস,ভালোবাসা, প্রেম, জীবন, সৌন্দর্য্য আর দীর্ঘশ্বাসের চিত্র। প্রেমের কি সহজ বোঝাপড়া আর প্রকাশ।
‘আমার এ গান কোনদিন শুনিবে না তুমি এসে’। কি নিশ্চিত। কি অনর্থক গান। তবু এই গান সৃষ্টি হচ্ছে কবির মনে।
‘আজ রাত্রে আমার আহ্বান ভেসে যাবে পথের বাতাসে।’
তবু হৃদয়ে গান আসে
ডাকিবার ভাষা তবুও ভুলিনা আমি’
তবু ভালোবাসা জেগে থাকে প্রাণে।
যারা প্রেমে থাকে তার বুঝতে পারে, কতটা গভীর হলে প্রেম একপাক্ষিক হয়ে ওঠে। মৌলিক প্রেম মাত্রই একপাক্ষিক, বাকিটা ব্যবসা।
যে গান গাইছে, তা কোথায় গাইছে কবি? উত্তরে জানা যায় পৃথিবীর কানে, নক্ষত্রের কানে। বোধের কাছে স্পষ্ট কবি, সে শুনবে না সেই গান, পথের বাতাসে ভেসে যাবে সেই গান। তবু গান আসে প্রাণে।
প্রথমেই উপসংহার টেনেছেন যার প্রতি এই রাত্রির আহ্বান তা পথের বাতাসে ভেসে যাবে, শুনবে না। তবু গাইছে গান। তবু জাগছে প্রেম। এটাই শিল্পের বা প্রেমের উৎস হবার নিরর্থক সার্থকতা।
সমুদ্রের ঢেউর মতো। কত দুর হতে এসে এসে আছড়ে পড়ে নি:শ্বেষ হয়ে যায়। তবু ঢেউ উঠে আবার আবার সামনে এগিযে যায়। ধ্বংস হয়, বিলিন হয়। আবার উঠে ঢেউ।
কবি বলছেন, তুমি জল, তুমি ঢেউ,সমুদ্রের ঢেউের মতো তোমার হৃদয়ের বেগ।
তোমার সহজ মন ভেসে যায় জলের আবেগে।
এখানে,ধাধা লাগিয়ে দেন কবি।
এখানে কাকে বলছেন তুমি। নিজেকে নাকি তার প্রেমকে? আমার বুঝে আসে নিজেকে।
পরের লাইনে তিনি বলছেন, কোন ঢেউ তার বুকে গিয়ে লেগেছিল কোন অন্ধকারে
রাত্রির সিন্ধুর জল, ঢেউ আর তুমি সব এক।
তুমি শুধু এক দিন — এক রজনীর!–
’তুমি’ মানে যদি প্রেম/প্রেমিক/ প্রকৃতি/ স্রষ্টা ধরি তাহলে ভিন্ন ভিন্ন রুপে ধরা দেবে কবিতাটি। এখানেই শক্তি কবিতাটির। এক রাত্রির গল্পে কবি তার প্রেম আর পাবার গল্প শোনাচ্ছেন আমাদের।
রবীন্দ্রনাথ ’নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গে’ এমন মুহুর্ত প্রকাশ করেছেন,
কী জানি কী হল আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ –
দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।
নজরুলের ’বিদ্রোহী’ লিখা হয় একরাতে। একরাতের প্রেম সেই রাতের মতো করে নজরুল কি নিজেকে আর কখনো খুঁজে পেয়েছিল ? পায়নি হয়ত।
জীবনানন্দ এক রাত্রির গল্প শোনাচ্ছেন আমাদের।
এরপর কবি জানতে চান কিংবা জানা হয়ে গেছে তার।
তোমারে কে ভালোবসে? তোমারে কি কেউ বুকে করে রাখে?
উত্তর দেন নিজেই, জলের আবেগে তুমি চলে যাও
‘তুমি শুধু একদিন এক রাত্রির
মানুষ মানুষীর ভিড় ডাকিয়া লয় দুরে
নিঃসঙ্গ বাতাসের মতো দিয়েছিলে
একদিন এক রাত্রি দিতে পারে যত।’
মানুষ যা পায় , এক রাত্রে পায়, এক মুহুর্তে পায়। এর বেশি কিছু পায়না মানুষ।
বাকি সব কিছুই পাবার পুনরাবৃত্তি ও অপেক্ষা।
পারভেজ সেলিম
লেখক,সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী

