ইসরায়েলের প্রাচীন ইতিহাস


পারভেজ সেলিম

পারভেজ সেলিম ।।


প্রাচীন কালে ইসরায়েলিরা পরিচিত ছিল ‘হিব্রু জাতি’ হিসেবে। তাদের আদি পুরুষ আব্রাহাম বা ইব্রাহিম নবী ছিলেন মেসোপটেমিয়া মানে আজকের ইরাক অঞ্চলের মানুষ। ইহুদীরা প্রথম দিকে যাযাবরের মতো ঘুরেছে। ঘুরতে ঘুরতে আব্রাহাম একসময় কেনান (আজকের ইসরায়েল) অঞ্চলে এসে বসতি গড়ে তোলে।

সময়ের পরিক্রমায় ইহুদীরা মিশরে গিয়ে ফেরাউনের (রেমেসিস) দাস হতে বাধ্য হয়। পরে মুসা নবী ইহুদীদের উদ্ধার করে লোহিত সাগর পার করে নিয়ে আসে কেনান বা আজকের ইসরায়েল অঞ্চলে। 

উত্থান পর্ব : 

‘হিব্রু জাতি’র সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা শুরু করেন ডেভিড বা দাউদ নবী। সেটা ১০০০ খ্রি.পুর্বের ঘটনা। তিনি ছিলেন একজন সামান্য মেষপালক।হিব্রু বাইবেল অনুযায়ী এক যুদ্ধে গলিয়াদ নামের বিশাল এক যোদ্ধাকে পাথর ছুঁড়ে পরাজিত করেছিলেন মেষবালক ডেভিড। 

পরবর্তীতে ডেভিড ইসরাইলের সবচেয়ে বড় যোদ্ধা হয়ে ওঠেন।ইসরাইলকে এক বিশাল সাম্রাজে পরিনত করেন। ডেভিডের জনপ্রিয়তায় ঈর্শান্বিত হয়ে তাকে খুনের চেষ্টা করেন রাজা সাউল। 

সাউল বা তালুত ছিলেন ইসরাইলের প্রথম রাজা। ১০২৪ খ্রি.পূর্বাব্দে তিনি রাজা হয়েছিলেন। সাউলের উপর অভিমান করে শেষ পর্যন্ত ইসরাইল থেকে চলে যান ডেভিড।

স্থানীয় ফিলিস্তিনরা ছিলো পৌত্তলিক ধর্ম বিশ্বাসী। আর ইহুদীরা ছিল এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী। ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরায়েলের ছিল চির বৈরিতা ।

ডেডিভ না থাকায় ফিলিস্তিনিদের কাছে এবার পরাজিত হন সাউল। যুদ্ধে মারা যায় তার ছেলে। সন্তানের শোকে যুদ্ধের মাঠে আত্মহত্যা করেন সাউল ।

নির্বাসনে থাকা অবস্থায় ডেভিড এবার রাজা হন ইসরায়লের। এবার ডেভিড তার জনগনের জন্য নতুন শহর দখল করতে থাকেন। 

খুব সহজেই জেরুজালেম দখল করে নেয় ডেভিড ও তার বাহিনী। তারপর থেকেই ‘জেরুজালেম’ পবিত্র ভূমি হয়ে ওঠে ইহুদীদের কাছে। এটি পবিত্র ‘ডেভিডের শহর’ নামেও পরিচিত। 

দীর্ঘদিন শাসন করার পর ডিভিড বৃদ্ধ হলে ছেলে সুলোমন বা সুলায়মান নবীকে ইসরাইলের রাজা বানিয়ে নিজে ছুটি নেন। ৯৭০ খ্রি.পুর্বাব্দে মারা যান ডেভিড। 

এরপর ইসরাইলে শুরু হয় সুলেমানের যুগ। ইহুদীদের স্বর্নযুগ। জেরুজালেমে তিনি ‘প্রথম টেম্পল’ বা ‘টেম্পল অফ সলোমন’ নির্মাণ করেন। ইতিহাস বলে এটি জেরুজালেমের নির্মিত ‘প্রথম উপাসানালয়’। ইসলামে যা ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’ নামে পরিচিত।


আরো পড়ুন : বখতিয়ার খলজি: বাংলার প্রথম মুসলিম শাসক

ইসরায়েল রাষ্ট্রের যেভাবে জন্ম হল

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের ইতিহাস (পুরো পর্ব)


পতন পর্ব :

বিশাল এক সাম্রাজ্য রেখে ৯৩০ খ্রি.পুর্বে তিনি মারা যান সুলেমান। তার মৃত্যুর পর জেরুজালেম চলে যায় মিশরীয়দের দখলে। ইহুদীরা বিতাড়িত হতে থাকে জেরুজালেম থেকে। সুলেমানের মৃত্যু পর পতন শুরু হয় ইসরাইলের।

৫১৬  খ্রি. পূর্বে রাজা হেরড সেখানে ‘দ্বিতীয় টেম্পল’ তৈরি করেন । টেম্পলের চারিদিক দিয়ে প্রাচীর দিয়ে দেন । এই প্রাচীরই ইহুদীদের ‘কেবলা’ বা মুসলমানদের ‘বুরাক দেয়াল’ নামে পরিচিত। ৫৮৫ বছর এট টিকে ছিল । রোমানরা এটি ধ্বংস করে ৭০ সালে ।

আলেকজান্ডারও দখল করেছিল এই ভূখণ্ড। গাজায় আলেকজান্ডারের বাহিনীর সাথে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়েছিল। গাজায় অনেক মানুষ হত্যা করেছিল আলেকজান্ডার।

যীশু খ্রিষ্টের জন্মের সময় এই অঞ্চল দখলে ছিল রোমানদের। ৭০ খ্রি. রোমানরা এসে জেরুজালেম শহর ধ্বংস করে দেয়। ইসরাইল নামের আর কোন ভুখন্ড থাকে না।

বিতাড়ন পর্ব :

রোমনরা যখন ‘হেরোদ দ্যা গ্রেট’কে জুদাহ রাজ্যের রাজা বানান,  তখন ইহুদী অঞ্চল বেথেলহেমে জন্ম নেন খ্রিস্ট্র ধর্মের প্রধান পুরুষ যীশু খ্রিষ্ট বা ঈসা নবী। যীশুকে ক্রশ বিদ্ধ করার পিছনে ইহুদীর ষড়যন্ত্র ছিল বলে খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করে।  তাই ইহুদীদের সবসময় সন্দেহের চোখে দেখত খ্রিষ্টানরা ।

এরপর রোমানদের মধ্যে খ্রিষ্টধর্ম যত জনপ্রিয় হতে থাকে ততই ইহুদী বিদ্বেষ বাড়তে থাকে।

৬৪ সালে নিজেদের সুরক্ষার জন্য একটি আইন জারি করে ইহুদিরা। তাতে ৬ বছরের বেশি বয়সী সকল ইহুদীদের পড়াশুনা বাধ্যতামুলক করা হয়। এরপর থেকেই ইহুদীরা শিক্ষাকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহন করে । 

৬৬ সালে রোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে ইহুদীরা। এর চরম মুল্য দিতে হয় তাদের। ১০ লক্ষ ইহুদীকে হত্যা করা হয় এবং রোমনরা জেরুজালেম থেকে তাদের বিতাড়িত করতে থাকে।

এরপর ইহুদী ধর্মই নিষিদ্ধ করে সম্রাট হাদ্রিয়ান ১৩১ সালে। জেরুজালেমের নামই পাল্টিয়ে করা হয় ইলিয়া কাপাতোলিনা।আর ইহুদি প্রদেশের নাম পরিবর্তন করে রাখে ‘ফিলিস্তিন’ বা ‘প্যালেস্টাইন’।

সম্রাট কন্সট্যান্টিয়ান রাস্ট্র ধর্ম হিসেবে খ্রিষ্ট ধর্ম চালু করেন ৩১২ খ্রি. ।  এরপর ইহুদীদের সংকট আরো বেড়ে যায় । এরপর আরো তিনশ বছর ইহুদীরা জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত হয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারা বিশ্বে ।

মুসলমানেরা জেরুজালেম জয় করে দ্বিতীয় খলিফা উমরের সময় । ৬৩৭ সালে। খলিফা উমর নিজে গিয়েছিলেন জেরুজালেম শহরের চাবি গ্রহণ করতে ।

৬৯১ সালে আজকের সেই বিখ্যাত সোনালী গম্বুজ নির্মাণ করেন আব্দুল মালেক মারওয়ানী । আর মসুজিদুল আকসা নির্মান হয় ৭০৫ সালে ।

 ১০৯৯ সালে খ্রিস্টানদের দখলের আগে জেরুজালেম মুসলমানদের অধীনেই ছিল ।

৮৮ বছর পর ১১৮৭ সালে খ্রিস্টানদের কাছে থেকে আবারও জেরুজালেম জয় করেন সালাহুদ্দিন আইযুবি। 

অটোমান সম্রাট সুলতান সুলেমান ১৫৩৮ সালে জেরুজালেমকে ঘিরে বিখ্যাত দেয়াল তুলেন । যেটি এখন ওয়াল ও জেরুজালেম নামে পরিচিত। চারভাগে এখানে এখনও ইহুদী, খ্রিষ্টান , মৃসলমান ও আর্মেনিয়ানরা বাস করে ।

১৯১৭ সাল পর্যন্ত জেরুজালেম অটোমানদের দখলেই থাকে । প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরুস্ক হারা পর ব্রিটেন ও ফান্স নিয়ন্ত্রণ নেয় । ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল নিজেরাই স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষনা দেয় । ৭০ খ্রি. রোমানরা ইসরাইল রাস্ট্র ধ্বংস করেছিল । এর ১৮৭৮ বছর পর একটি নিজস্ব রাষ্ট্র পায়  ইহুদীরা। নাম হয় ‘ইসরায়েল’।


পারভেজ সেলিম

লেখক ও চলচ্চিত্রকর্মী



আরো পড়ুন :