১৮৮৮ সালের কোনো এক সকাল।
বাংলার এক অচেনা গ্রামের মাঠে হঠাৎ কয়েকজন অপরিচিত মানুষ এসে দাঁড়াল। হাতে অদ্ভুত সব যন্ত্র, কাগজ আর নকশা। গ্রামের মানুষ দূর থেকে তাকিয়ে আছে। তারা জানে না, এই লোকগুলো শুধু জমি মাপতে আসেনি—তারা আসলে তাদের গ্রামের চেহারা কাগজে বন্দি করতে এসেছে।
আজ যে জমি রহিমের ক্ষেত, করিমের পুকুর কিংবা হোসেনের বাড়ির ভিটা, কিছুদিন পর সেই জমি হয়ে যাবে একটি দাগ নম্বর। আর সেই দাগের পাশে লেখা হবে একজন মানুষের নাম। জন্ম নেবে এমন এক রেকর্ড, যার উত্তরাধিকার আমরা আজও বহন করছি—খতিয়ান।
কিন্তু কেন ব্রিটিশ সরকার বাংলার জমির হিসাব চাইলো? কীভাবে GPS, স্যাটেলাইট কিংবা কম্পিউটার ছাড়াই হাজার হাজার গ্রামের জমি মেপে ফেলল তারা? আর কীভাবে একজন সাধারণ কৃষকের দখল, দাবি ও পরিচয় ঢুকে গেল সেই সরকারি খাতায়?
এই গল্প সেই খতিয়ানের।
একটি কাগজের পেছনে লুকিয়ে থাকা ১৩৫ বছরের ইতিহাসের গল্প। গল্পটা শুরু হয়েছিল অবশ্য ১৮৮৮ সালেরও আগে।
তখন আজকের বাংলাদেশ নামে কোনো দেশ নেই। বাংলা ব্রিটিশ ভারতের অংশ। গ্রামের অর্থনীতি, মানুষের জীবন, জমিদারের ক্ষমতা—সবকিছুর কেন্দ্র ছিল জমি। কিন্তু জমি কার, কতটুকু, কোথায় তার সীমানা—এসবের নির্ভুল হিসাব ছিল না।
১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারদের সঙ্গে সরকারের রাজস্ব সম্পর্ক স্থায়ী করেছিল। কিন্তু জমিদার আর কৃষকের মাঝখানে তৈরি হয়েছিল নানা স্তরের স্বত্ব ও দখল। ফলে জমি নিয়ে বিরোধও বাড়তে থাকে।
ব্রিটিশ সরকার বুঝল, শুধু খাজনা নিলে হবে না। আগে জানতে হবে—জমি আসলে কোথায়, কতটুকু এবং কার দখলে। এর আগে বড় এলাকা ও গ্রামের সীমানা নিয়ে জরিপ হয়েছিল। কিন্তু তাতে একটি গ্রামের প্রতিটি খণ্ড জমির আলাদা হিসাব পাওয়া গেল না।
একটি গ্রামের সীমানা জানা আর গ্রামের প্রতিটি জমির পরিচয় জানা—এক জিনিস নয়।
১৮৭৫ সালের Bengal Survey Act এবং পরে ১৮৮৫ সালের Bengal Tenancy Act এই কাজকে নতুন ভিত্তি দিল। জমির সঙ্গে মানুষের অধিকারও রেকর্ডে রাখার প্রয়োজন তৈরি হলো।
তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শীর্ষে ছিলেন রানি ভিক্টোরিয়া। ভারতে তাঁর প্রতিনিধি ছিলেন ভাইসরয় লর্ড ডাফরিন। তাঁর সময়েই ১৮৮৮ সালে এই বড় জরিপের নতুন পর্ব শুরু হয়। তবে এটি কোনো একজন ভাইসরয়ের প্রকল্প ছিল না; পরবর্তী কয়েক দশকে অসংখ্য কর্মকর্তা ও মাঠকর্মীর শ্রমে কাজটি এগিয়ে যায়।
ব্রিটিশ শাসনের কিছু অবকাঠামোগত কাজ—রেলপথ, টেলিগ্রাফ, সড়ক, ডাকব্যবস্থা কিংবা জরিপ—আজও আমাদের জীবনে প্রভাব ফেলেছে। তবে এগুলো মূলত মানুষের কল্যাণের জন্য নিছক দান হিসেবে তৈরি হয়নি; প্রশাসন চালানো, রাজস্ব আদায়, দ্রুত যোগাযোগ এবং সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। জমির জরিপও সেই বৃহত্তর প্রশাসনিক ব্যবস্থারই অংশ।
তারপর এল ১৮৮৮ সাল।
কক্সবাজারের রামুতে শুরু হলো কিস্তোয়ার জরিপ ও খতিয়ান তৈরির কাজ। প্রাথমিক কাজ সফল হওয়ার পর চট্টগ্রামসহ অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ল পূর্ণাঙ্গ Cadastral Survey—CS জরিপ।
ভাবুন সেই সময়ের বাংলাকে।
পাকা রাস্তা নেই, গাড়ি নেই, GPS নেই, স্যাটেলাইট নেই। অথচ একটি গ্রামের প্রতিটি জমির সীমানা মাপতে হবে। প্রতিটি জমিকে দিতে হবে আলাদা পরিচয়।
সার্ভেয়াররা যন্ত্রপাতি নিয়ে মাঠে নামতেন। নির্দিষ্ট বিন্দু ধরে মাপজোক করে একটি কাঠামো তৈরি হতো। তারপর সেই কাঠামোর ভেতর একে একে মাপা হতো ছোট ছোট জমি।
একটি জমি।তার পাশের আরেকটি। তারপর আরেকটি।এভাবেই মাঠের অদৃশ্য সীমানা কাগজের ওপর দৃশ্যমান হয়ে উঠত। প্রতিটি জমি পেত একটি নম্বর।
জন্ম নিল দাগ।
কিন্তু দাগ নম্বর পেলেই তো হলো না। এবার জানতে হবে—এই জমি কার? সেখানেই প্রয়োজন হলো গ্রামের মানুষের। সার্ভেয়াররা স্থানীয় মানুষকে জিজ্ঞেস করতেন—কে এই জমি চাষ করে? কতদিন ধরে? কার কাছ থেকে পেয়েছে? খাজনা কাকে দেয়? সীমানা কোথায়? কোনো বিরোধ আছে কি?
একজন বৃদ্ধ কৃষক হয়তো দেখিয়ে দিলেন—“ওই আমগাছটা পর্যন্ত আমার জমি।” আরেকজন বললেন—“না, সীমানা আমগাছ নয়, ওই পুকুরের বাঁধ।”কেউ পুরোনো খাজনার কাগজ নিয়ে এলেন। কেউ জমিদারের কাচারির রেকর্ডের কথা বললেন। কেউ বললেন, “আমার বাবা এই জমি চাষ করতেন, তাঁর বাবাও করতেন।”এভাবেই সরকারি মাপজোকের সঙ্গে মিশে গেল গ্রামের মানুষের স্মৃতি, দখল ও পুরোনো কাগজপত্র।
মাঠের কথা এবার উঠল সরকারি খাতায়।
জমি মাপা হলো, নকশায় দাগ দেওয়া হলো, তারপর সেই দাগের সঙ্গে যুক্ত হলো মানুষের অধিকার ও জমির বিবরণ।কার নাম, বাবার নাম, জমির পরিমাণ, কী ধরনের অধিকার, কীভাবে ভোগ করছে, কত খাজনা—এসব তথ্য রেকর্ড হতে লাগল।
এই রেকর্ডই হলো Record of Rights, যার পরিচিত নাম খতিয়ান।
সহজ করে বললে, দাগ হলো মানচিত্রে জমির পরিচয়, আর খতিয়ান হলো সেই জমি ও তার অধিকার সম্পর্কে লিখিত পরিচয়।একটি মৌজার মানচিত্রে শত শত, কখনো হাজার হাজার দাগ। আর তার সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে খতিয়ানের পৃষ্ঠা। কাজটি ছিল এত বিশাল যে এক প্রজন্মে শেষ হয়নি।
১৮৮৮-৮৯ সালে শুরু হওয়া এই জরিপ এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রাম থেকে বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, যশোর, খুলনা, পাবনা, রংপুর—এভাবে বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল পেরিয়ে কাজ এগোয়। প্রথম বৃহৎ জেলা-ভিত্তিক জরিপের শেষ দিকের কাজ দিনাজপুরে গড়ায় ১৯৩০-এর দশকে এবং ১৯৪০ সালের দিকে সেই পর্ব শেষ হয়।
একটি খতিয়ানের পেছনে তখন কয়েক দশকের শ্রম। কিন্তু জমি তো স্থির নয়। মালিক মারা গেলেন। ছেলেরা জমি ভাগ করল। কেউ জমি বিক্রি করল। কোথাও নদী ভাঙল, কোথাও চর জাগল। কোথাও ধানের ক্ষেত হয়ে গেল বসতবাড়ি। পুরোনো খতিয়ানের সঙ্গে বাস্তব জমির দূরত্ব বাড়তে লাগল।
তারপর বদলে গেল রাষ্ট্রও।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলো। বাংলা ভাগ হলো। পূর্ব বাংলা হলো পাকিস্তানের অংশ। ১৯৫০ সালের East Bengal State Acquisition and Tenancy Act-এর মাধ্যমে জমিদারি ও মধ্যস্বত্ব বিলোপের নতুন ব্যবস্থা তৈরি হলো। জমির রেকর্ডও বদলাতে হলো।
এলো SA—State Acquisition Survey।
কিন্তু SA-এর কাজ সব জায়গায় CS-এর মতো পূর্ণাঙ্গ মাঠ জরিপের পুনরাবৃত্তি ছিল না। পুরোনো রেকর্ড ও জমিদারি কাগজপত্রের ওপরও অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করতে হয়েছিল। ফলে নতুন অসঙ্গতি তৈরি হলো।
তাই আবার প্রয়োজন হলো সংশোধনের।
এলো RS—Revisional Survey। ১৯৬৫–৬৬ সালের দিকে সংশোধনী জরিপ শুরু হয়। রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় এই কাজ শুরু হয় এবং পরে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
পুরোনো রেকর্ড যাচাই হলো, নতুন করে জমি মাপা হলো, ভুল সংশোধনের চেষ্টা হলো। অনেক জমির পুরোনো দাগ বদলে গেল নতুন দাগে। একই জমি, কিন্তু কাগজে নতুন পরিচয়।
এরপর এলো বাংলাদেশ।
স্বাধীনতার পরও জমির গল্প থামেনি। নতুন শহর তৈরি হলো, নদী তার গতিপথ বদলাল, চর জাগল, জমি হাতবদল হলো। বিভিন্ন এলাকায় নতুন জরিপ, সংশোধনী জরিপ ও বিশেষ জরিপ চলতে থাকল।
নদীভাঙন ও চর জাগার এলাকায় প্রয়োজন হলো দিয়ারা জরিপের। আর দ্রুত বদলে যাওয়া মহানগর এলাকায় প্রয়োজন হলো সিটি বা মহানগর জরিপের।
পরে বিভিন্ন অঞ্চলে BS, BRSসহ আরও নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। সরকারি নথিতে ১৯৮০-এর দশক থেকে BS-এর কার্যক্রম শুরুর কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু এর পাশাপাশি জমির আরেকটি ইতিহাস চলতে থাকে—দলিলের ইতিহাস।
রহিম তার জমি করিমের কাছে বিক্রি করল। সেই লেনদেনের দলিল রেজিস্ট্রি হলো সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে। কিন্তু কাগজে জমি কেনা আর সরকারি ভূমি রেকর্ডে নিজের নাম ওঠা এক বিষয় নয়।
তাই করিমকে যেতে হলো ভূমি অফিসে। আবেদন করতে হলো নামজারি বা Mutation-এর জন্য।অর্থাৎ দলিল বলছে—জমি হস্তান্তরের ঘটনা ঘটেছে। নামজারি সেই পরিবর্তনকে ভূমি রেকর্ডে প্রতিফলিত করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
একদিকে দলিলের ইতিহাস, অন্যদিকে খতিয়ানের ইতিহাস।
আজ আমরা যখন CS, SA, RS, BS, BRS, দিয়ারা, সিটি জরিপ—এসব নাম শুনে বিভ্রান্ত হই, তখন মনে রাখা দরকার, এগুলো মূলত একই জমির বিভিন্ন সময়ের রেকর্ড।
CS আমাদের নিয়ে যায় ব্রিটিশ বাংলার সেই সময়ে, যখন প্রথমবার প্রতিটি জমিকে দাগ ও রেকর্ডের মধ্যে আনার বড় উদ্যোগ শুরু হয়েছিল।SA এসেছে জমিদারি বিলোপের পর। RS এসেছে পুরোনো রেকর্ড সংশোধনের প্রয়োজন থেকে। আর পরবর্তী জরিপগুলো এসেছে সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া জমি ও মানুষের বাস্তবতাকে নতুন করে রেকর্ড করার প্রয়োজন থেকে।
তাই একটি জমির কাগজ খুললে আসলে শুধু একটি কাগজ খোলা হয় না। খুলে যায় সময়ের পর সময়।
একটি পুরোনো CS খতিয়ানে দেখা যায় শত বছরেরও বেশি আগের একটি গ্রামের ছবি। সেখানে থাকা একটি দাগ হয়তো আজ আর একই নম্বরে নেই। সেই জমির মালিকও বদলে গেছে বহুবার। কাগজ বদলেছে। মানুষ বদলেছে।দাগ বদলেছে। কিন্তু জমির ইতিহাস থেকে গেছে।
আজ প্রযুক্তির যুগ। স্যাটেলাইট আছে, GPS আছে, ডিজিটাল ম্যাপ আছে, অনলাইন নামজারি আছে। কাগজের খাতা ধীরে ধীরে জায়গা করে দিচ্ছে ডিজিটাল রেকর্ডকে।
তবু মূল গল্পটি বদলায়নি।
এক টুকরো জমিকে খুঁজে বের করতে হবে। তার সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। তাকে একটি পরিচয় দিতে হবে। আর সেই জমির সঙ্গে মানুষের অধিকারকে রেকর্ডে রাখতে হবে।
১৮৮৮ সালের সেই মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা আমিন হয়তো জানতেন না, তাঁর হাতে আঁকা একটি রেখা একশ বছরেরও বেশি সময় পরে কোনো মানুষ আদালতে, ভূমি অফিসে কিংবা নিজের ঘরে বসে খুলে দেখবে।
সে দেখবে একটি দাগ নম্বর। তার পাশে একটি নাম।তার নিচে শত বছরের জমির হিসাব।আর হয়তো তখন সে বুঝবে—জমির কাগজ আসলে শুধু কাগজ নয়। একটি দাগের পেছনে আছে একটি মানুষ। একটি খতিয়ানের পেছনে আছে একটি পরিবার।
আর একটি জমির পেছনে লুকিয়ে আছে বাংলার প্রায় দেড়শ বছরের বাংলার ইতিহাস।

