উড়িয়ে দেবার গদ্য !


১.

আমরা উড়িয়ে দিতে পছন্দ করি। উড়ানোই আমাদের স্বভাব। আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের অহংকার—ফুৎকারে সবাইকে উড়িয়ে দেওয়া।

ঘুড়ি কিংবা ফানুসের কথা বলছি না, বলছি মানুষ উড়িয়ে দেওয়ার কথা। আমরা মানুষকে, তার কর্মকে, তার সংগ্রামকে তুড়ি মেরে মুহূর্তেই উড়িয়ে দিতে চাই। এ যেন অসুখ বয়ে বেড়ানোর খেলা।

২.

হুমায়ূন আজাদ বলছেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ অপন্যাস লেখে’ বা ‘ইতর প্রাণী বেশি সন্তান প্রসব করে।’ আজাদ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন হুমায়ূন আহমেদকে।

এবার হুমায়ূন আহমেদও মজা করে একটা গল্প বানালেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প কপি করে চরিত্রের নাম পাল্টে নিয়ে গেলেন আজাদের কাছে। আজাদ ধরতে না পেরে বললেন, ‘লেখায় গভীরতা নাই।’

হুমায়ূন আহমেদ পরে মজা করে গল্পটা বলতেন, ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় যদি গভীরতা খুঁজে না পান, আমার লেখায় গভীরতা খোঁজার দরকার কী?’

আহমদ ছফাকে ‘বিকারগ্রস্ত তুচ্ছ একজন লেখক’, ‘অত্যন্ত গৌণ একজন লেখক’ বলে উড়িয়ে দিতে চান আজাদ। ছফার জবাব, ‘শুয়োরের বাচ্চার যখন নতুন দাঁত গজায়, বাপের পাছায় কামড় দিয়ে শক্তি পরীক্ষা করে।’

মানুষকে উড়িয়ে দেওয়ার কী অদ্ভুত গদ্য! একজন আরেকজনকে উড়িয়ে দিচ্ছে, আবার সেই উড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়েই তৈরি হচ্ছে সাহিত্যিক ইতিহাস।

আজাদ ছফাকে ছোট করতে চেয়েছিলেন, ছফাও আজাদকে ছোট করার চেষ্টা চালালেন। দুজনের কে কতটুকু উড়ে গেল কে জানে! তবে উড়িয়ে দেওয়ার গদ্য পড়ে রইল সাহিত্যের জমিনে।

৩.

শেখ হাসিনা যেমন ড. ইউনূসকে ‘সুদখোর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসের কী পরিহাস—শেখ হাসিনার পতনের পর সেই ‘সুদখোর’ ইউনূসই রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে এসে বসেন।

যাকে আপনি গতকাল উড়িয়ে দিয়েছেন, কাল হয়তো তার কাছেই আপনাকে যেতে হবে।

আমরা ভাবি, আজকের ক্ষমতাই চিরস্থায়ী। আজ যে মানুষটা নিচে, সে কোনোদিন ওপরে উঠবে না। আজ যাকে সবাই গালি দিচ্ছে, সে কোনোদিন সম্মানিত হবে না। এটাই বোধহয় মানুষের সবচেয়ে বড় অশিক্ষা।

ইতিহাস অবশ্য এসবের কোনো কথাই শোনে না। ইতিহাস নিজের মতো করে মানুষকে আবার জায়গা দেয়।

আজ আনিস আলমগীরের মতো কেউ রেস্টুরেন্টে কাবাব খেতে খেতে ইউনূসকে উড়িয়ে দিচ্ছেন। কাল অন্য কেউ আবার আনিস আলমগীরকেই উড়িয়ে নেপচুনে পাঠিয়ে দেবেন।

সালাহউদ্দিন আহমেদও ‘সংবিধান, সংবিধান’ করে বিরোধীদের তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ না কেউ এসে সেই সালাহউদ্দিনকেই হয়তো তুড়ি মেরে শিলং পাঠিয়ে দেবেন, কে জানে!

ক্ষমতার নিয়তিই বোধহয় এমন—আজ যে উড়ায়, কাল তাকেও কেউ না কেউ উড়িয়ে দেয়।

কেউ নাচায়, কেউ নাচে। কার ইশারায় মানুষগুলো উড়ে যায়? কে চালায় এই লাঠাই আর ঘুড়ি? সুতার টান কার হাতে? আজকে যে লাঠাই, কালকে সে ঘুড়ি।

৪.

একটা সময়ের নায়ক, আরেক সময়ে হয়ে যায় খলনায়ক। এক সময়ের খলনায়ক আবার অন্য সময়ে হয়ে যায় বীরবিক্রম। মানুষ বদলায়। ক্ষমতা বদলায়। কিন্তু আমাদের উড়িয়ে দেওয়ার স্বভাব বদলায় না।

প্রথম আলোকে পুড়িয়ে উড়িয়ে দিতে চায় কেউ কেউ। আবার অন্য কেউ প্রথম আলোকে সত্য আর সাহসের বাতিঘর মনে করে। একদল বলে—সব মিথ্যা। আরেকদল বলে—ওরাই সত্য। মাঝখানে পাঠকটা কোথায়?

সে কি নিজে পড়বে? নিজে বিচার করবে? নাকি আমরা তার পক্ষেও সিদ্ধান্ত নিয়ে দেব?

৫.

হাজার হাজার মাদ্রাসার পড়ুয়া শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে একসময় আমাদের খুব মাথাব্যথা ছিল। তাদের কী হবে? কী কাজ করবে? দেশের অর্থনীতিতে তারা কীভাবে যুক্ত হবে? মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অবহেলা করছে রাষ্ট্র।

৫ আগস্টের আগে এই প্রশ্নগুলো খুব মানবিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শুধু মাদ্রাসার ছাত্র নয়, সাধারণ শিক্ষিত ছাত্ররাও কি বঞ্চিত হচ্ছিল না?

এই যে এত বড় একটা আন্দোলন হলো, এই দুই বছরে এই বঞ্চনা আর অবহেলা মোচনের কোনো রাস্তার সন্ধান কি আমরা করতে পেরেছি? পারিনি।

এই প্রশ্নগুলো কঠিন। তাই আমরা প্রশ্নগুলোকে উড়িয়ে দিই, দূরে থাকি। ভয় পাই। হতাশ হই। পিঠ ঠেকে গেলে আন্দোলন করি। স্বপ্ন দেখি। আবার পুরোনো বলয়ে ফিরে যাই।

শুধু এই একটি সমস্যা নয়, এরকম আরো হাজারটা সমস্যা আমাদের আষ্ঠেপিষ্ঠে বেধে ধরেছিল। মুক্তি চেয়েছিল বেশিরভাগ মানুষ, জুলাই আন্দোলনে। সমস্যার সমাধানগুলো আমরা করতে পারিনি। তবে আন্দোলনের ক্রেডিট নিয়ে কিংবা আন্দোলন পরবর্তী ব্যর্থতা নিয়ে একজন আরেকজনকে উড়িয়ে দিচ্ছে ।

কথায় কথায় মানুষকে উড়িয়ে দেওয়া সহজ, সমস্যার সমাধান করা কঠিন। তাই সহজ কাজটাই করি। মানুষ উড়াই।

৬.

চাকরিতে মেধার কথা এখনও বলি। কিন্তু এখনও চাকরির আশায় ক্ষমতাবানদের সাথে সেলফি তুলি, প্রকাশ করি। রাজনৈতিক দলের সভায় গিয়ে হাজিরা দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ।

স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে ফেসবুকে লিখি। নিজের লোক হলে বলি—আরে, ছেলেটা তো যোগ্যই। অন্যর হলেই বলি বাপের জোরে এতকিছু!

আমরা অন্যের দুর্নীতিকে উড়িয়ে দিই। নিজের দুর্নীতিকে ব্যাখ্যা করি।

অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলি। নিজের বিশ্বাসকে বলি সংস্কৃতি। অন্যের সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতাকে বলতে চাই ’ফ্যাসিবাদ’ আর নিজের সিদ্ধান্তহীনতাকে ’গণতন্ত্রে’র নামে চালাতে চাই।

অন্যরা ক্ষমতায় থাকলে বলি, এখনই দাও, সমস্যার সমাধান দ্রুত করো। নিজে ক্ষমতায় গেলে সংকটের নানা গল্পকে সামনে আনতে থাকি ।

অন্যের ভুলকে ‘চরিত্র’ বলি। নিজের ভুলকে ’পরিস্থিতি’ বলি। এই হলো আমাদের উড়িয়ে দেওয়ার কাব্য।

আমরা মানুষকে দেখি না। দেখি কোন দলে, কোন পক্ষে, কোন মতের। তারপর সিদ্ধান্ত নিই—এই মানুষটা ভালো, ওই মানুষটা খারাপ। মানুষটা কী করেছে, সেটা পরে। আগে পরিচয়।

মানুষকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমাদের খুব বেশি কিছু লাগে না। একটা শব্দই যথেষ্ট।

দালাল। ভণ্ড। বাটপার। সুদখোর। অপন্যাসিক। দেশদ্রোহী। ব্যর্থ। চরিত্র খারাপ।

ব্যস। মানুষটা উড়ে গেল।

৭.

চল্লিশ বছরের কাজ, তার সংগ্রাম, তার ভালো কাজ, তার ভুল—সব একসঙ্গে বাতাসে মিশিয়ে দিই। একটুকরো খারাপের গন্ধ পেলে বাকিসব সুন্দরকে ভাগাড়ে ফেলে দেই। অথচ সমালোচনা আর উড়িয়ে দেওয়া এক জিনিস নয়।

সমালোচনা করতে হলে জানতে হয়। পড়তে হয়। ভাবতে হয়। তারপর বলতে হয়—এখানে ভুল, এখানে দুর্বলতা, এখানে অসাধারণ। উড়িয়ে দিতে এসবের কিছুই লাগে না। তুড়ি মারলেই হয়।

কোন একজনকে উড়িয়ে দিতে পারাকেই এদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় বিনোদন মনে করে। একজনকেও পাওয়া যাবেনা যার সফলতার আড়ালে কেউ একজন গোপনতম অপরাধ অন্যায় খুঁজে বের করবে না। সে সত্য হোক কিংবা মিথ্যা।

অভিযোগ আনলেই বিশ্বাস করতে শুরু করে, প্রমাণের অপেক্ষা কেউ করেনা। এখানে অভিযোগ  মানেই প্রমানিত। অথচ অভিযোগ আনা এদেশে যত সহজ, প্রমাণ করানো তত কঠিন।

যার অভিযোগ তোলার মেশিন যত বেশি, তার প্রভাব সমাজে তত বেশি।

৮.

তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, আমরা যাকে আজ উড়িয়ে দিই, কাল তার কাছ থেকেই কিছু গ্রহণ করি। যাকে আজ বলি ‘ও কিছুই না’, কাল তার কথাই উদ্ধৃত করি।

যাকে আজ বলি ‘ব্যর্থ’, কাল তার সাফল্যের গল্প শুনিয়ে সন্তানকে অনুপ্রাণিত করি। যাকে আজ বলি ‘খারাপ মানুষ’, কাল ক্ষমতায় এলে তার সঙ্গে ছবি তুলি।

আমাদের স্মৃতি ছোট। আমাদের বিবেকও সুবিধামতো কাজ করে।

তাই মানুষকে পুরোটা দেখার ধৈর্য আমাদের নেই। আমরা একটা ছবি দেখি। একটা বক্তব্য শুনি। একটা ভুল দেখি। তারপর পুরো মানুষটাকে উড়িয়ে দিই।

৯.

অথচ মানুষ কোনো একরঙা চরিত্র নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে ভালোও হতে পারেন, আবার খারাপও। অসাধারণ কিছু করতে পারেন, আবার ভয়ংকর ভুলও করতে পারেন। একজন লেখক দুর্বল বই লিখতে পারেন, আবার অসাধারণ বইও লিখতে পারেন।

একজন রাজনীতিবিদ অন্যায় করতে পারেন, আবার কোনো ভালো কাজও করতে পারেন। একজন সাংবাদিক ভুল করতে পারেন, আবার সত্যও বলতে পারেন।

একজন শিল্পীকে ভালোবাসতে তার সব কাজ ভালোবাসতে হয় না। একজন মানুষকে অপছন্দ করলেও তার ভালো কাজ অস্বীকার করতে হয় না। এই সামান্য সত্যটা আমরা ভুলে যাই।

১০.

আমাদের ভালো লাগে চরমপন্থা। ব্যর্থ অথবা সফল। সবচেয়ে বড় অথবা সবচেয়ে ছোট। নায়ক অথবা খলনায়ক। আমাদের মাঝখানে কোনো স্বাভাবিক মানুষ নেই। কোনো ধূসর রং নেই। শুধু সাদা আর কালো।

কালোকে উড়িয়ে দেয় সাদা, আর সাদাকে কলঙ্কিত করে কালো। মাঝখানে ধূসর মানুষ হাঁসফাঁস করে—অথবা কোনো এক দলে ভিড়ে গিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার খেলাতেই স্বস্তি খোঁজে।

এখন আমাদের উড়িয়ে দেওয়ার মহামারি চলছে।

সেলিম পারভেজ

লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x