জেরুজালেম কার ?


পারভেজ সেলিম
পারভেজ সেলিম ।।

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন শহরগুলোর একটি হচ্ছে জেরুজালেম।পাঁচ হাজার বছর আগে গড়ে ওঠে ছোট এই শহরটির।আয়তন মাত্র ৬৫২ বর্গকিলোমিটার। আমাদের ঢাকা শহরের চেয়ে সাড়ে তিনগুন ছোট শহর জেরুজালেম।  

জেরুজালেমের গুরুত্ব অন্য যেকোন শহরের তুলনায় অনেক বেশি। কয়েক হাজার বছর ধরে ধর্মীয় সম্প্রাদায়ের কাছে এটি পবিত্র শহর হিসেবে পরিচিত। ইহুদী, খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের কাছে এটি পবিত্রতম শহর ।

কারা এখানকার প্রাচীনকালে বাসিন্দা ?  ফিলিস্তিনি এবং ইসরাইলিরা কেউই এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা নয়।তারা  অন্য অঞ্চল থেকে এখানে এসেছে। স্থানীয়রা মুলত কেনানদেশীয় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির মানুষ ছিল ।তাদের সাথেই মিলেমিশে এক হয়েছে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিরা । 

প্রথমে ফিলিস্তিনিরা এসেছে। তাদের হটিয়ে দিয়ে এসেছে ইহুদীরা। বানিয়েছে ইসরাইল রাষ্ট্র। এরপর ইহুদীদের বিতাড়িত করে দিয়ে জেরুজালেম দখল করেছে মিশরীয়, ব্যবিলনিয়, পারসিক, গ্রিক, রোমানরা  ও মুসলমান এ ব্রিটিশরা ।

( জেরুজালেম by James Tissot, ca. 1890)

জেরুজালেম দখল:

ইতিহাস ঘেটে দেখা যায় এই শহরটি ধ্বংস হয়েছে দুইবার। দখল হয়েছে ২৩ বার আর আক্রমন হয়েছে ৫২ বার।

কেনান দেশীরা ২৪০০ খ্রী.পুর্বাব্দে এই শহরের নাম দিয়েছিল ‘উরুসালিম’। মানে সালিমের শহর । সালিম ছিলেন তাদের দেবতা । হিব্রুতে যার অর্থ ছিল শান্তির শহর। ধর্মের প্রভাব নিয়ে এই শহর গড়ে উঠেছে সেই সাড়ে চার হাজার বছর আগ থেকেই। 

খ্রি.পূর্ব ৯৫৭ সালে ডেভিড বা দাউদ নবী এসে জেরুজালেম দখল করে নেয় জেবুসাইটদের কাছ থেকে । তারপর এখানে তিনি শহর গড়ে তোলেন। তখন আরবীতে এই শহরের নাম ছিল ‘কুদস’ । 

ডেভিডের ছেলে সলোমন বা সোলাইমান নবী এই শহরে ‘টেম্পল মাউন্ড’ বা ঈশ্বরে ঘরের পাহাড় নামে একটি স্থাপনা নির্মাণ করেন। ইহুদির কাছে এটি ‘টেম্পল অফ সুলেমান’ বা ‘ফাস্ট টেম্পল’ আর মুসলমানদের কাছে এর নাম ‘বাইতুল মুকাদ্দাস’ । পরে রাজা হেরড দ্বিতীয় টেম্পল নির্মান করেছিলেন এখানে।

al aska mosque

তবে মুসলমানদের কাছে ‘বায়তুল মোকাদ্দাসে’র ইতিহাস আরো পুরোনো । 

কাবা ঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর ইব্রাহিম নবী প্রথম এখানে ইবাদতের ঘর নির্মাণ করেছিলেন বলে মুসলমানরা বিশ্বাস করে। যার নাম ‘মসজিদুল আকসা’। পরে অনেক নবী হাত ধরে এসে পৌঁছায় সোলায়মান নবীর কাছে । তিনি এটার সবচেয়ে বড় সংস্কারটি করেন । জ্বিনের সহায়তা নিয়ে তিনি বিশাল বিশাল পাথর নিয়ে এটি নির্মাণ করেছেন বলে কুরাআনে উল্লেখ আছে ।

খ্রি.পু অষ্টম শতকে ইসরায়েল ও জুদাহ দুটি অঞ্চলে ভাগ হয়ে যায় । জুদাহ রাজ্যের রাজধানী হয় জেরুজালেম।

দ্বিতীয় শতকে এসে রোমানরা এই শহরের নামই বদলিয়ে দেয় ইলিয়া কাপিতোলিনা’। সেই থেকে আরবীতে এর নাম হয় ‘ইলিয়া’।


আরো পড়ুন : ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের ইতিহাস (পুরো পর্ব)

বখতিয়ার খলজি: বাংলার প্রথম মুসলিম শাসক


মুসলমানদের দখলে :

এরপর ৬৩৭ খ্রি. জেরুজালেম আসে মুসলমানদের অধিকারে। মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে শহরের নিয়ন্ত্রণ কয়েক দফা পরিবর্তণ হলেও সবশেষ ৭০০ বছর ধরে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল জেরুজালেম। 

১৫৩৮ সালে অটোম্যান সম্রাট সুলতান সুলেমান এই শহরে বিশাল প্রাচীর দিয়ে চারটি অংশে ভাগ করেন। ইহুদী, খ্রিস্টান, মুসলমান আর আর্মেনিয়রা বাস করতে থাকে আলাদা আলাদা অংশে। এটাকে বলা হয় ‘ওল্ড সিটি’। এরপর জেরুজালেমের নতুন শহর আরো বিস্তৃত হয়েছে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর  ১৯১৭ সালে শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় বৃটিশরা। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ও ইসরায়ের নামে দুটি নুতন রাষ্ট্রের ঘোষণা দেয় জাতিসংঘে। ‘জেরুজালেম’ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণে থাকার সিদ্ধান্ত হয় । ১৯৬৭ সালে অবৈধভাবে জেরুজালেম দখল করে নেয় ইসরায়েল। 

এখন লাখ টাকার প্রশ্ন এই জেরুজালেম কার ? এর কোন সহজ উত্তর দেয়া সত্যিই কঠিন। জটিল এই প্রশ্নের কোন সমাধান হচ্ছে না বলেই ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের ৭৩ বছরে যুদ্ধ এখনও চলমান। যেদিন এর সমাধান পাওয়া যাবে সেদিন যুদ্ধও বন্ধ হয়ে যাবে বলেই ধরে নেয়া যায় ।


পারভজে সেলিম

লেখক ও চলচ্চিত্রকর্মী


আরো পড়ুন :