খলিফা হত্যাকাণ্ড: ইসলামের রক্তাক্ত ইতিহাস


পারভেজ সেলিম

পারভেজ সেলিম


হয়রত আবু বকর,‌ হয়রত উমর, হয়রত উসমান ও হয়রত আলী। এই চারজনকে বলা হয় খুলাফায়ে রাশেদিন। তারাই হচ্ছেন খলিফাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। হয়রত  মুহাম্মাদের (সা.) মৃত্যুর পর ২৯ বছর ইসলামি রাষ্ট্রের ক্ষমতায় ছিলেন এই খলিফারা। শেষ নবী যেহেতু কাউকে মনোনিত করে যাননি এবং কিভাবে খলিফা নির্ধারিত হবেন তারও কোন সমাধান দিয়ে যাননি তাই বারবার ইসলামের উত্তরসুরি নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সেই জটিলতার সমাধান হয়েছে রক্তাত্ব অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে। চার খলিফার মধ্যে তিন জনকেই হত্যা করা হয়েছে। তৃতীয় খলিফা উসমানের হত্যাকান্ড এতটাই নৃশংস ছিল যে তার মৃত্যুর পর মুসলমানরা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। শুরু হয় নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ। যাতে নিহত হয় ৯০ হাজার মুসলমান। চতুর্থ খলিফাকে হয়রত আলীকেও হত্যা করে খাওয়ারিজ গোত্রের মুসলমানেরা। 

কিন্তু কেন, কারা, কিভাবে হত্যা করলো খলিফাদের? আর ইসলামের শুরুতেই কেন এমন নৃশংস আর রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো?


আবু বকর : (৬৩২-৬৩৪ খ্রি.)


চারজন খলিফার  মধ্যে সবচেয়ে প্রবীন ছিলেন হজরত আবু বকর সিদ্দিক। সম্পর্কে মহানবীর শ্বশুর ছিলেন তিনি। তার  মেয়ে হয়রত আয়শা ছিলেন শেষ নবীর প্রিয় স্ত্রী। মহানবীর মৃত্যু পর মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়েছিল কে হবেন প্রথম খলিফা। অনেক তর্ক বির্তক শেষে ৮ জুন, ৬৩২ খ্রি. মদিনার বনু সায়েদা গোত্রের চত্বরে প্রথম খলিফা নির্ধারিত হন হয়রত আবু বকর সিদ্দিক

তিনি মাত্র দুই বছর তিন মাস ক্ষমতায় ছিলেন। মহানবীর মৃত্যুর পর ইসলাম ত্যাগের যে হিড়িক পড়েছিল তা নিয়ন্ত্রণ করতেই পুরো সময়টাই পার করেছেন খলিফা আবু বকর। ইতিহাসে যা ‘রিদ্দার যুদ্ধ’ নামে পরিচতি।

৬৩৪ খ্রি. ২৩ শে আগস্ট অসুস্থ হয়ে মারা যান খুলাফায়ে রাশেদিনের প্রথম খলিফা হয়রত আবু বকর। তখন তার বয়স ৬০ বছর। চার খলিফার মধ্যে তিনি একমাত্র খলিফা যার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছিল। মারা যাবার আগে উমর ইবনে খাত্তাব কে তিনি খলিফা মনোনিত করে যান।


উমর : (৬৩৪-৬৪৪ খ্রি.)


উমর ইবনে খাত্তাব হলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং একমাত্র খলিফা যার ক্ষমতা গ্রহণ পূর্ব নির্ধারিত ছিল। ফলে এই ক্ষমতা হস্তান্তরে বিরোধিতাও কম হয়েছে। 

খলিফা উমরের আমলেই ইসলামী রাস্ট্র সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করেছে। আরবের সকল গোত্রকে নিয়ন্ত্রণের পর পারস্য এবং বাজেন্টাইন সম্রাজ্যও দখলে চলে এসেছিল ইসলামের। খলিফা উমর ১০ বছর ৬ মাস ৮ দিন ক্ষমতায় থাকার পর এক ক্রীতদাসের ছুরির আঘাতে নিহত  হন।

কুফা প্রদেশের শাসনকর্তা মুগীরার ভৃত্য বা দাস ছিল আবু লুলু ফিরোজ। হরমুজান ও জাফিনাহ নামের মদিনার দুজন যুদ্ধ বন্দির সহায়তায় তিনি উমর হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন । মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ার সময় উমরকে খুন করেন আবুলুলু ফিরোজ ।

আরেকটি মতে আবুলুলুকে প্রতিদিন দুই দিরহাম করে মুক্তিপণ দিতে হত তার মুনিবকে । এই মুক্তিপণ কমানোর জন্য তিনি উমরের কাছে গিয়েছিলেন কিন্তু উমর রাজি হননি। বলেছিলেন মুক্তিপণের পরিমান ঠিক আছে। এতে লুলু ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং তাকে হত্যা করার হুমকি দেন।

পরেরদিন সকালে লুলু ফজরের নামাজ শুরু করেন খলিফার সাথেই। নামাজের একামতের পর যখন তাকবির দেন তখন কাতার ভেঙ্গে লুলু সামনে এগিয়ে আসে। হাতে তার দু ধারী খঞ্জর। এসেই দ্রুত একে এক ছয়টি কোপ দেয় উমরের শরীরে।একটি কোপ দেয় নাভীর নিজে। এই আঘাতেই উমর মারা যান। উমরকে বাঁচাতে এসেছিলেন কাবিল বিন উবাই নামের একজন মুসল্লি । তিনিও ছুরির আঘাতে নিহত হন। পরের দিন বাড়িতে মারা যান ইসলামের সবচেয়ে প্রভাবশালী খলিফা হয়রত উমর।

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হত্যাকান্ড রাজনৈতিক নাকি ব্যক্তিগত আক্রোশ তা নিয়ে দ্বিমত রয়েছে।উমরের মুত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। 


আরো পড়ুন : বখতিয়ার খলজি: বাংলার প্রথম মুসলিম শাসক


উসমান (৬৪৪-৬৫৬ খ্রি.)


বিশেষ এক নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামের তৃতীয় খলিফা নির্ধারিত হন উসমান ইবনে আফফান। হয়রত উসমান ছিল শান্ত শিষ্ট নরম প্রকৃতির মানুষ। তিনি খলিফাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। তার ১২ বছরের শাসনামলের শেষ দিকে বিদ্রোহ দানা বাধতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত এই বিদ্রোহ ভয়াবহ মর্মান্তিক ঘটনা মধ্যে দিয়ে শেষ হয়।৮০ বছর বয়সি  উসমানকে হত্যা করা হয় নির্মমভাবে।

হত্যার পর বিদ্রোহীরা তার লাশের সাথে যে নির্মম ব্যবহার করে তা ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরোচিত ঘটনা বলে মনে করা হয়। কারো কারো মতে কারবালার চাইতেও বেশি নিমর্মতা দেখানো হয়েছিল তৃতীয় খলিফার হত্যাকান্ডে।

উসমান হত্যাকান্ড :

৪০ দিন অবোরোধ রাখার পর খলিফার বাড়ির দরজায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল বিদ্রোহীরা ।  বাড়ির তিনজন নিরাপত্তা রক্ষি নিহত হয়েছিল বিদ্রোহীদের পাথরের আঘাতে।বিদ্রোহীরা শেষ দিকে খলিফার পানি সরবরাহ পর্যন্ত দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।

খলিফা আবু বকরের ছেলে মুহাম্মাদ তিনজন বিদ্রোহীকে নিয়ে  খলিফা উসমানের বাড়িতে প্রথম প্রবেশ করেন । তখন কোরআন পড়ছিলেন বৃদ্ধ খলিফা। ঘরে ঢুকেই মুহাম্মাদ উসমানের দাঁড়ি ধরে টান দেন এবং গালিগালাজ করতে থাকেন।খলিফা মুহাম্মাদকে স্মরণ করিয়ে দেন যে তার বাবা ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর এই কাজ দেখলে কতটা মর্মাহত হতেন। এতে মুহাম্মদ নিজের ভুল বুঝতে পেরে পিছু হটে যান। 

তখন অন্য বিদ্রোহীরা খলিফার মাথায় তিনটা আঘাত করেন এবং সাথে সাথেই  রক্ত গলগল করে বেয়ে পড়তে থাকে সামনে রাখা কোরআনের পাতায়। এরপর তলোয়ার দিয়ে খলিফাকে কোপ দেয় বিদ্রোহীরা, খলিফা হাত দিয়ে ঠেকাতে গেলে তার হাত কেটে যায়। এসময় উসমান বিদ্রোহীদের বলে ‘এইমাত্র তুমি যে হাতটিকে কেটে ফেললে সেই হাত দিয়েই প্রথম কুরআন লিখা হয়েছিল’ ।

স্ত্রী নাইলা খলিফাকে বাঁচতে এলে তলোয়ারের আঘাতে তার হাতের আঙ্গুলও কেটে যায়। খলিফা তরবারির আঘাতে মাঠিতে যখন লুটিয়ে পড়েন তখন এক বিদ্রোহী তার বুকের উপর দাঁড়িয়ে নয় বার বর্শা ঢুকিয়ে খলিফা উসমানের মৃত্যু নিশ্চিত করে।

যাবার সময় তার বাড়ি লুট করা হয়। এমনকি তার শরীরের কাপড় পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায় বিদ্রোহীরা। তবু  বিদ্রোহীদের ক্ষোভ মিটেনি। উসমানকে তিন দিন দাফন না করে আবর্জনার ভাগাড়ে ফেলে রাখা হয়।

অবশেষে মহানবী পত্নী উম্মে হাবিবা মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে ঘোষনা দেন ‘ যদি উসমানকে সমাহিত করতে না দেওয়া হয় তাহলে তিনি মাথার চুল উন্মুক্ত করে মদিনার রাস্তায় নেমে পড়বেন’। তার এই ঘোষণায় খুব দ্রুত কাজ হয়। বিদ্রোহীরা কিছুটা নমনীয় হন।

আনসারেরা কেউ জানায়া পড়াতে রাজি হননি প্রথমে। পরে উমাইয়া বিন আবি জাবি তার জানায়া পড়ান। তাকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। কারো মতে হয়রত আলীর  পরামর্শে গোপনে তাকে দাফন করা হয়।

হযরত উসমান হত্যাকান্ডের সময়  হযরত আলী মদিনাতেই ছিলেন না। নিরপেক্ষতার কথা বলে বাকি সাহাবীরাও ঘরের দরজা বন্ধ করে ছিলেন। অনেকে মনে করেন প্রভাবশালী সাহাবীরা নিরপেক্ষ থাকার কথা বলে দুরে থাকায় বিদ্রোহীরা খলিফাকে হত্যা করার সাহস পেয়েছিল।

কেন এত ক্ষোভ ছিল বিদ্রোহীদের ?

প্রশাসনিক দূর্বলতা ছিল উসমানের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা। এছাড়া বিভিন্ন প্রদেশে নিজের পরিরারে সদস্যদের বড় বড় পদে বসিয়েছিলেন তিনি। স্বজনপ্রীতির অভিযোগে প্রধানত তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধতে শুরু করে ।

এই হত্যাকান্ডের পিছনে আরেকটি ঘটনা নিয়ামক হিসেবে কাজ করে । মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরকে মিশরের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করে পাঠান খলফা উসমান । কিন্তু পথে তারা জানতে পারেন মিশরে পৌঁছামাত্রই মুহাম্মদকে হত্যার আদেশ দিয়ে মিসরের বর্তমান গর্ভনরের কাছে গোপনে চিঠি পাঠিয়েছ খলিফা উসমান ।

এই গোপন চিঠি মুহাম্মাদের হাতে পড়ার পর তারা ক্রোধে উন্মাতাল হয়ে উসমানের কাছে মদিনায় ফিরে আসেন। খলিফা উসমান অস্বীকার করেন এই চিঠির কথা। পরে জানা যায়  উসমানের চাচাতো ভাই গোপনে এই চিঠি লিখে উসমানের সীল লাগিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

মুহাম্মদ ও তার বিদ্রোহী গ্রুপ মারওয়ানকে তাদের হাতে তুলে দিতে বলেন। উসমান রাজি না হওয়ায় তারা উসমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে। পরে এই বিদ্রোহীরাই হত্যা করে ইসলামের তৃতীয় খলিফাকে।

মুয়াবিয়া সেসময় দামেস্কের শক্তিশালী প্রশাসক ছিলেন। চাইলে তিনি খলিফাকে রক্ষা করতে পারতেন। তিনিও স্বপ্ন দেখছিলেন উসমানের মৃত্যুর পর ইসলামের খলিফা হবেন। তাই ৪০ দিন অবরোধ থাকার পরও কোন প্রদেশ থেকে তাকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেনি কোন গর্ভনর ।

হয়রত উসমানকে নৃসংসভাবে খুন করার পর মুসলমানদের মধ্যে যে গৃহযুদ্ধ বাধে তাতে ৯০ হাজার মুসলমান মারা যান। এটাই ছিল মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে সবচেয়ে বড় নৃশংসতার ঘটনা। ইসলামের যা ‘প্রথম ফিতনা’ নামে পরিচিত ।


আরো পড়ুন : দেশভাগ : বাঙ্গালীর এক নীল বেদনার অধ্যায় !!


আলী ( ৬৫৬-৬৬১ খ্রি.)


ইসলামের তৃতীয় খলিফা হয়রত উসমানের মৃত্যু পর আবারো এক ভয়াবহ সংকটে পড়ে ইসলাম। দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে মুসলমানেরা। নিজেদের মধ্য যুদ্ধে নিহত হন ৯০ হাজার মুসলমান। ইসলামের এমন এক ভয়াবহ সংকটকালে তৃতীয় খলীফার মৃত্যু পাঁচদিন পর মুসলিম উম্মাহর প্রধান হন আলী ইবনে আবু তালিব।

কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হয়না চতুর্থ খলিফার মেয়াদকাল।মাত্র ৪ বছর ৯ মাস ক্ষমতায় থাকার পর ইরাকের কুফায় ‘ইবনে মুলজাম’ নামে এক খাওয়ারিজের হাতে খুন হন খুলাফায়ে রাশেদীনের শেষ খলিফা হয়রত আলী। তখন তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর।

আলী খলিফা হবার পর : 

খলিফা হবার পর হয়রত আলীর উপর সবচেয়ে বেশি চাপ আসতে থাকে দ্রুত উসমান হত্যার বিচার করার জন্য। কিন্তু সেই সময়ের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এই বিচার করাটা বড় জটিল ও অসম্ভব হয়ে পড়ে। 

এর প্রেক্ষিতেই বিরোধীরা এবার ‌উসমান হত্যার সাথে খলিফা আলীর জড়িত থাকার অভিযোগ  আনতে থাকেন। হয়রত আলী এমন গুরুতর অভিযোগকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। 

কিন্তু পরিস্থিতি ধীরে ধীরে এত খারাপ হয় যে শেষ নবীর স্ত্রী হয়রত আয়শা (রা.) তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। নিজেই উটে পিঠে চড়ে যুদ্ধের ময়দানে আসেন এবং যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। এই যুদ্ধ ‘বসরার যুদ্ধ’ বা ‘জংগে জামাল’ বা ‘উটের যুদ্ধ’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। হয়রত আলী এই যুদ্ধে জয় লাভ করলে বিবি আয়শাকে তিনি স্বসম্মানে মক্কায় পাঠিয়ে দেন।

বিবি আয়শার মতো উসমান হত্যার বিচারের সবচেয়ে বড় দাবিদার ছিলেন মুয়াবিয়া ও আমর ইবনে আস। বসরার  যুদ্ধে হয়রত আলী জয়ের পর, সিরিয়ার গর্ভনর মুয়াবিয়া, আলীর খেলাফতকেই অস্বীকার করে বসেন। শুরু হয় আলী- মুয়ারিয়ার নতুন যুদ্ধ ।‘সিফফিনের যুদ্ধ’। 

মুয়াবিয়ার শঠতার কারণে বাধ্য হয়ে হযরত আলী এই যুদ্ধে বিরতি দেন এবং আলোচনায় বসেন মুয়াবিয়ার সাথে। আলোচনায় বসায় এবার নতুন জটিলতা তৈরি হয় মুসলমানদের মধ্যে। খাওয়ারিজ মুসলামানেরা বিদ্রোহ করে বসেন। তারা মনে করেন  মুয়াবিয়ার সাথে যুদ্ধ বন্ধ করে খলিফা আলি কাফের হয়ে গেছেন। তাকে আগে তওবা করতে হবে তারপর অন্যকিছু। হয়রত আলী তাদের বোঝাতে ব্যর্থ হন যে, তিনি ভুল করেননি তিনি বাধ্য হয়েছিলেন এই আলোচনায় বসতে।

খাওয়ারিজদের বিদ্রোহ :

পরিস্থিতি এত খারাপ হয় যে মুয়াবিয়ার সাথে আবারো যুদ্ধ শুরুর আগে খাওয়ারিজদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ শুরু করেন খলিফা আলী। ইতিহাসে সেই যুদ্ধ  ‘নাহরাওয়ানের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত । অংশ নেয়া নয় হাজার খাওয়ারিজের প্রায় সকলেই নিহত হয়েছিলেন এই যুদ্ধে। বেঁচে থাকেন মাত্র নয়জন খাওয়ারিজ। তারাই পরে কাবা ঘরে এসে এক চরম আত্নঘাতি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।যা ইসলামের গতিপথকে আবারো বদলিয়ে দিয়েছিল।

খাওয়ারিজরা মনে করেন মুসলমানদের মধ্যে এই গৃহযুদ্ধের জন্য তিনজন ব্যক্তি দায়ী। আর তারা হলেন হয়রত আলী, মুয়াবিয়া আর আমর ইবনে আস। তারা নিজেদের বিবাদই  মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধিয়ে রেখেছে। তাদেরকে একসঙ্গে হত্যা করতে পারলে ইসলামে শান্তি ফিরে আসবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।  

আর তাই নিজেদের জীবনের বিনিময়ে হলেও এই তিনজনকেই একসাথে হত্যার শপথ নেন যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া খাওয়ারিজরা। তিনজন খাওয়ারিজ প্রস্তুত হন আত্নহুতি দিতে। এরা হলেন বারেক ইবনে আব্দুলাহ, আমর ইবনে বকর ও আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম। হত্যার সময় নির্ধারণ করেন ১৬ রমজান শুক্রবার। 

পরিকল্পনা অনুযায়ি দামেস্কের মসজিদে মুয়াবিয়াকে হত্যা করতে বের হন বারক ইবনে আব্দুল্লাহ। আঘাত করেন কিন্তু মুয়াবিয়া প্রাণে বেঁচে যান। অন্যদিকে আমর ইবনে আস নামাজ পড়তে না আসায় তাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হন। আমর ভেবে অন্য এক মুসল্লিকে খুন করেন খাওয়ারিজ আত্নঘাতি আমর ইবনে বকর। দুই হত্যার প্রচেষ্টা সফল না হলেও সফল হয় হয়রত আলির হত্যার চেষ্টা ।

আলী হত্যাকান্ড :

শুক্রবার কুফার মসজিদে ফজরের নামাজ আদায়ে আসেন খলিফা হয়রত আলী। খলিফা ঠিক যে সময়  সিজদা দিচ্ছিলেন ঠিক তখন বিষ মাখা ছুরি দিয়ে মাথায় আঘাত করে আবদুর রহমান ইবনে মুলজাম। তারপর দ্রুত পালিয়ে যান সেখান থেকে।

ছুরির আঘাতেই রক্তাত্ব ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে খলিফার শরীর। মসজিদ থেকে তাকে বাসায় নেয়া হয়। হামলার দুই দিন পর ২৯ জানুয়ারি, ৬৬১ সালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন খুলাফায়ে রাশেদীনের শেষ খলিফা হয়রত আলী ইবনে আবু তালিব।  

তবে কারো কারো মতে মুয়াবিয়াই এই হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাকারী। তার নির্দেশেই হযরত আলীকে হত্যা করা হয়েছিল। যদিও তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। খলিফার নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তীতে ইবনে মুলজামকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল। 

মৃত্যুর আগে হয়রত আলী তার বড় ছেলে ইমাম হাসানকে পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত করে যান। কিন্তু ছয় মাসের মাথায় আবারো মুয়াবিয়ার সাথে চুক্তি করে খেলাফত হস্তান্তরে বাধ্য হন ইমাম হাসান।ইসলামের নুতন নেতা হন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান। ইসলাম এক গভীর সংকটের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

আর এভাবেই শেষ হয়ে যায় ইসলামের স্বর্নযুগ নামে খ্যাত ২৯ বছরের ‘খুলাফায়ে রাশিদুনের যুগ’ ! 


পারভেজ সেলিম
লেখক ও চলচ্চিত্রকার

আরো পড়ুন : কারবালা : বেদনার এক ইতিহাস (পুরো পর্ব)


ভিডিও সৌজন্য : Banglabox

৩ thoughts on “খলিফা হত্যাকাণ্ড: ইসলামের রক্তাক্ত ইতিহাস

Leave a Reply

Your email address will not be published.