মির্জা গালিব ও একটি কবিতা


মোহনা জান্নাত


মির্জা গালিব ছিলেন উর্দূ ভাষার সবচেয়ে প্রভাবশালী একজন কবি। তার জন্ম হয়েছিল ১৭৯৭ সালে মুঘল সম্রাজ্যের আগ্রায় । তিনি ছিলেন মুঘল রাজ দরবারের কবি। মাত্র ২৩৪ টি গীতিকবিতা লিখেছিলেন তিনি। আর তাতেই গালিব হয়ে ওঠেন উর্দূ কবিতার অধীশ্বর।  

শুধু উপমহাদেশে নয় সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে তার প্রতিভা। অনেকে বলে থাকেন কাব্য যদি ‘ধর্ম’ হয় তাহলে গালিবকে না বোঝা মানে ‘কাফের’ হওয়া।

মোঘলদের ক্ষমতা শেষের সময়টুকু ছিল উর্দূ কাব্যে শ্রেষ্ঠ যুগ। কারন এই সময় গালিব লিখছিলেন তার প্রিয় পঙতিগুলো । ৭২ বছর বয়সে অনেক আর্থিক কষ্টের মধ্যে দিয়েই মারা যান এই কবি। মৃত্যুর পর তার জনপ্রিয়তা আরো ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিশ্বময়।

গালিবের একটি শের ও পরবর্তী কবিদের উত্তর :

গালিবের মদ পান করা নিয়ে নানান কথা প্রচলিত আছে। একদিন তিনি মসজিদে বসে মদ্যপান করছিলেন। মুসুল্লিরা তাতে বাধা দিয়ে বললেন এটা আল্লার জায়গা। এখানে মদ খাওয়া বারণ। অন্যখানে গিয়ে পান করুন। তখন গালিব মুসল্লিদের দিকে তাকিয়ে আরেক চুমুক দিয়ে বলেছিলেন.. 

‘শরাব পিনে দে মসজিদ ম্যা ব্যায়ঠ কার, ইয়া ও জাগা বাতা যাঁহা খুদা নেহি’

(মসজিদে বসে মদ পান করতে দাও, অথবা বলো এমন একটা জায়গা যেটা আল্লাহর নয় )

উপস্থিত মুসল্লিরা তার কথায় নিরুত্তর হয়ে গেলেন । ভাবলেন সত্যিই তো এমন কোন জায়গা পাওয়া কি সম্ভব যেটা আল্লাহর নয়।


আরো পড়ুন : বখতিয়ার খলজি: বাংলার প্রথম মুসলিম শাসক


গালিবের মৃত্যুর ৮ বছর পর ১৮৭৭ সালে পাঞ্জাবে শিয়ালকোটে জন্ম নেয় আল্লামা ইকবাল। ধীরে ধীরে তিনি উর্দূ ভাষার আরেক বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক হয়ে ওঠেন। গালিব পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার অনেক বছর পর তার সেই বিখ্যাত শেরের উত্তর দেন আল্লামা ইকবাল। 

‘ ইয়া গালিব, মসজিদ খুদা কা ঘর হ্যায়  পিনে কি জাগা নেহি , কাফির কে দিলমে যা ওঁয়াহা খুদা নেহি’

(হে গালিব, মসজিদ আল্লার ঘর, মদ খাবার জায়গা নয় , কাফিরের মনে যাও ওখানে আল্লাহ  নাই’)

ইকবালের মৃত্যুর  ছয় বছর আগে ১৯৩১ সালে জন্ম নেয় আরেক উর্দূ ভাষার কবি সৈয়দ আহমেদ শাহ। সবাই তাকে চেনে আহমদ ফারাজ নামে। এবার ফারাজ ইকবালের শের এর উত্তর দিলেন এই্ভাবে

‘কাফির কে দিল সে আয়া হু দেখ কার, খুদা মুওজুদ হ্যা ওঁয়াহা উসসে পাতা নেহি’

(কাফেরের মন থেকে ঘুরে এসেছি, দেখেছি ওখানেও আল্লাহ আছেন, কিন্তু তা সে জানেই না)

অনেক বছর পর আরেক উর্দূ কবি ওয়াসি এবারে ফারাজের শের এর উত্তর দিলেন..

‘খুদা তো মুওজুদ দুনিয়া মে হার জাগা, তু জান্নাত মে যা ওঁয়াহা পিনে সে মানা নেহি‘

(আল্লাহ তো দুনিয়ার সব জায়গায় আছে, তুমি বেহেস্তে যাও ওখানে পান করা মানা নাই)

 


আরো পড়ুন : দেশভাগ : বাঙ্গালীর এক নীল বেদনার অধ্যায় !!


এর অনেক কয়েক বছর পর ওয়াসির কবিতার উত্তর দেন সাকি ফারুকী। বেহেস্তে গিয়ে সুরা পান করার ইচ্ছে তার নাই। সাকি মারা যান ২০১৮ সালে। তিনি উত্তর দেন.

‘পীতা হু সাকি গাম-এ-দুনিয়া ভুলানে কে লিয়ে, জান্নাত মে কৌন সা গাম হ্যায়, ইস লিয়ে ওঁয়াহা মাজা  নেহি’

(পানতো করি দুনিয়ার দু;খ কষ্ট ভুলে থাকার জন্য, বেহেস্তে কোন দু;খ নাই, এজন্য ওখানে পান করে কোন মজা নাই’)

কবিতার একটি লাইন কয়েকশ বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রকাশিত হয়ে চলছে। এটা শিল্পের অন্যন্য সুন্দর এক দৃষ্টান্ত। সামনে হয়ত নতুন কোন কবি পরের উত্তরটি নিয়ে হাজির হবেন। সেই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা।


মোহনা জান্নাত

প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ


আরো পড়ুন : যদ্যপি আমার গুরু: গুরু-শিষ্যে এক অসাধারণ বয়ান

ভালো সিনেমা মন্দ সিনেমা !

Leave a Reply

Your email address will not be published.