চিলড্রেন অফ হ্যাভেন : একটি বিশুদ্ধ সিনেমা

পারভেজ সেলিম ।।

পৃথিবীতে  খুব বেশি সিনেমা পাওয়া যাবে না যেখানে ভাই-বোনের সম্পর্কের গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের ব্যাপারটি সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে  ইরানের মাজিদ মাজিদি এক্ষেত্রে একেবারেই ব্যতিক্রম। তার এক সিনেমায় তিনি সেই কাজটি সম্পাদন করেছেন অসাধারণভাবে। সিনেমার নাম ‘চিলড্রেন অব হ্যাভেন’। ফার্সিতে যার নাম ‘আচেহ আসমান’।

আমার দেখা মাজিদ মাজিদির শ্রেষ্ট সিনেমা এই ‘চিলড্রেন অব হ্যাভেন’। শুধু ভাইবোনের সম্পর্ক নয় আরো অসংখ্য কারনে এটি বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আছে। আজ “ চিলড্রেন অব হ্যাভেন’ নামের অসামাণ্য এই সিনেমাটির দিকে নজর দিতে চাই।

গল্প :

সিনেমাটি শুরু হয় একটি পুরনো ছেঁড়া জুতা শেলাইয়ের মধ্যে দিয়ে। পরে আমরা দেখবো এই জুতাই সিনেমার গল্পের প্রধান চরিত্র ।

ইরানের একটি দরিদ্র পরিবারের গল্প এটি। পরিবারের বড় ছেলের নাম আলী। আলী তার  ছোট বোনের জুতা শেলাই করে বাড়ি ফেরার সময় ভুল করে হারিয়ে ফেলে। এই হারানো জুতা উদ্ধারের গোপন অভিযান এবং মহানুভবতার দারুণ এক গল্প নিয়েই তৈরি হয়েছে সিনেমাটি।

পোস্টার

শুধু একজোড়া জুতা নিয়ে যে এমন এক অসামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব,  তা বিশ্ব সিনেমায় এর আগে আর কেউ দেখেনি। তবে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর  ইরানের নতুন সিনেমার যে ধারা শুধু হয়েছিল তাতে এমন ছোট বিষয় এবং সম্পর্কের টানপোড়ন নিয়ে আসাধারণ সব সিনেমা নির্মাণ হতে থাকে । ‘চিলড়্রেন অব হ্যাভেন’ এই নতুন ধারাকে সুউচ্চ আসনে বসিয়ে দেয়। সারা বিশ্বে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ইরানী চলচ্চিত্র ।

হারানোর জুতা ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত  একজোড়া জুতা দিয়েই স্কুল যাতায়তের সিদ্ধান্ত নেয় দু ভাইবোন। তাই ভাই এর এতদিনের ময়লা জুতা পরিস্কার শুরু করতে বসে বোনও ।

এক গরীব পরিবারে জুতা হারানো গল্পের মধ্য দিয়ে ইরানী সমাজের মুল্যবোধের দারুণ এক চিত্র  তুলে ধরা হয়েছে এই সিনেমায়। বিশ্বাস,ভালবাসা, শ্রদ্ধার সাথে হাসি, কান্না, আনন্দ আর টানটান উত্তেজনার ভরপুর হয়ে আছে সিনেমাটি।

ইরানের এক দরিদ্র পরিবারের গল্প

এই সিনেমার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য্য হচ্ছে সহজ সাধারন গল্পকে অসাধারণ করে ফুটিয়ে তোলা।  সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল জুতা হারানো এবং জুতা উদ্ধারের গোপন সব অভিযানের গল্প  দুইভাইবোন আর দর্শক ছাড়া কেউই জানতে পারে না।

এই সিনেমায় অসংখ্য সুন্দর দৃশ্য আছে। যার মধ্যে  জুতা ভাগাভাগি করে দুই ভাইবোনের স্কুলে যাতায়তের দৃশ্যটি সিনেমাটিকে এক অন্যন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে ।

এর আগে জুতার হারানো খবরটি যেন বাবা মার কাছে প্রকাশ না করে সেজন্য ভাইবোনের গোপন কথোপোকথনের দৃশায়ন অসামাণ্যভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সিনেমাটিতে।

এছাড়া জারার স্কুলে গিয়ে  জুতা খোঁজার দৃশ্য, জুতার খোঁজ পাবার পর  উদ্ধার অভিযানে গিয়ে দুজনের ব্যর্থ হওয়া, ময়লা জুতা পরিস্কারের আনন্দসহ ,অনেক দৃশ্য আপনাকে এক বিরল সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা দেবে।

জারার চরিত্রে বাহারি সিদ্দিকী

তারপর আসে সেই বিখ্যাত দৌড়ের দৃশ্য। সিনেমার শেষ পনেরো মিনিট ধরে এক ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নেয় আলী। এর মুল কারন দৌড়ে যদি সে তৃতীয় হতে পারে তাহলে পুরস্কার পাবে এক জোড়া নতুন জুতা । যা সে তার ছোট বোনকে দিয়ে দিতে চায়।

কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয় আলী ,তৃতীয় নয় দৌড়ে হয়ে যায় প্রথম। হাতছাড়া হয়ে যায় নতুন জুতা জোড়া। জিতেও যেন হেরে যায় আলী। দৌড়ের এই বিশাল দৃশ্যটি সিনেমার এক অন্যন্য সুন্দর দৃশ্য ।

দৌড় শেষে  আলী অপরাধীর মতো এসে দাঁড়ায় বোন জারার সামনে। বোন বুজতে পারে নতুন জুতা আনতে পারেনি ভাই, কিছু না বলে সে চলে যায় ঘরে। এরপর আমরা দেখবো বাবার সাইকেলের পিছনে দুইজোড়া নুতন জুতা।

আর সিনেমার শেষে এসে এক অলৌকিক দৃশ্যের জন্ম দেয় পরিচালক।

আলীর সেই দৃশ্য

ক্ষত-বিক্ষত ছোট পা জোড়া পানিতে নামিয়ে দেয় আলী। সেখানকার রঙ্গিন মাছ গুলো এসে জড়ো হয় ছোট পা দুটির চারিদিকে। যেন কেউ না জানুক মাছগুলো জানে, কি অসীম সাহস, কি অসামান্য চেষ্ঠা আর কি মহান দায়িত্ব আছে এই ছোট্ট পা-দুটিতে। মনে হয় যেন লাল মাছ গুলো  শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে পা-দুটির কাছে এসে কুর্নিশ করছে । এর মধ্যে দিয়ে শেষ হয় অসাধারণ সিনেমাটি ।

তথ্য :

আলী চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছে আমির ফারুক হাসিমাইন। আর তার  বোন জারার চরিত্রে অভিনয় করেন বাহারি সিদ্দিকী। আলীর বাবার চরিত্রে ছিলেন মাজিদির সবচেয়ে প্রিয় অভিনেতা মোহাম্মদ আমির নাজি যাকে সবাই রেজা নাজি নামেই চেনে  ।

মাজেদির এই সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৯৮ সালে। অস্কার  মনোনয়ন পাওয়া প্রথম ইরানী সিনেমা এটি। আর কান ফেস্টিবলে শ্রেষ্ট সিনেমার মর্যাদা লাভ করা প্রথম ইরানী চলচ্চিত্র এটি ।

মাজেদি ও আমির ফারুক হাসিমাইন

মাজেদির বানানো এটি তৃতীয় সিনেমা। দেড় কোটি টাকা খরচে বানানো সিনেমাটি সারা বিশ্ব থেকে আয় করেছিল ১৪ কোটি টাকার বেশি । ২০১০ সালে ভারতে ‘বামবাম বোলে’ নামে এই সিনেমাটি রিমেক করা হয়

বিশুদ্ধ সিনেমা হিসেবে আরেক বিখ্যাত ‘বাইসাইকেল থিবসে’র সাথে তুলনা করা হয় ‘চিলড্রেন অব হ্যাভেন’কে। ইরানে শ্রেষ্ট তিনটি সিনেমার মধ্যে এটি অন্যতম। আধুনিক ইরানী সিনেমার  নতুন যে ধারায় আজ সারা বিশ্ব মুগ্ধ হয়ে আছে, তার সবচেয়ে সুন্দর নিদর্শণ হচ্ছে এই ‘চিলড্রেন অফ হ্যাভেন’।

উপসংহার :

মাজিদ মাজেদি ছোটদের নিয়ে সিনেমা বানান, তবে সিনেমা হয়ে ওঠে ছোট বড় সকলের।এত সহজ সাধারনভাবে এমন অসামান্য গল্প তুলে ধরার ক্ষমতা পৃথিবীতে খুব কম পরিচালকেরই আছে। মাজিদ মাজিদি যত দিন বেঁচে থাকবেন ততদিন আর কোন সিনেমা না বানালেও শুধু এই ‘চিলড়্রেন অফ হ্যাভেন’ দিয়েই বেঁচে থাকবেন পৃথিবীর মানুষের মনে ।

পারভেজ সেলিম

গনমাধ্যমকর্মী

ভিডিও সৌজন্য : Banglabox

Leave a Reply

Your email address will not be published.