বিবর্তনবাদ: শিকারি থেকে কৃষক তারপর সভ্যতা !


পারভেজ সেলিম


১২ হাজার বছর পূর্বে মানুষ তার জীবন চক্রে এক বিশাল পরিবর্তণ ঘটায়। কয়েক লক্ষ বছরের শিকারী জীবন ছেড়ে খাদ্য উৎপাদনে মনোনিবেশ করে তারা। কৃষি বিপ্লবের সূচনা হয় মানুষের হাতে। শিকারী থেকে মানুষ হয়ে ওঠে কৃষক।

পৃথিবীর সকল প্রাণী থেকে এবার পুরোপুরি আলাদা হয়ে ওঠে যায় তারা। কোটি  কোটি বছরের খাদ্যে পরনির্ভরশীলতার শিকল ভেঙ্গে ফেলে তারা। নিজের খাদ্য শিকার না করে উৎপাদন করা একমাত্র ব্যতিক্রমি ও অদ্ভুত প্রাণীটি হলো আজকের মানুষ।

আজ থেকে ১২ হাজার বছর আগে কৃষিকাজ শুরু করে মানুষেরা । ফলে তখন বেদুইণের মতো ঘোরাঘুরি বন্ধ হয়ে গেলো। এক জায়গায় বসতি স্থাপন শুরু করলো। গুহা ছেড়ে মানুষ গিয়ে উঠল নিজেদের বানানো কুটিরে।

প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বের কোনো এক মিশরীয় সমাধির মধ্যে পাওয়া একটি দেয়ালচিত্র, যেখানে দৈনন্দিন কৃষিকাজের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, Source: Sapiens A Brief History of Humankind Book

আধুনিক মানুষেরা মাটি খুঁড়ে যে ইতিহাস বের করেছে, তাতে দেখা যায়, নীল নদের আশেপাশে মানুষ তার প্রথম আবাস্থল বানিয়েছিল। 

খ্রি.পূর্ব ১৭০০০ বছর আগে মানুষ তার প্রথম স্থায়ী আবাসস্থল বানায়। ৯ হাজার খ্রি.পূর্বে তারা বসতি গাড়ে, ইউফ্রিস আর তাইগ্রিস নদীর তীরে। 

এরপর শুরু হয় সুমেরিয়দের শহর-রাষ্ট্রের ধারণা। উরুক ছিল তাদের শ্রেষ্ঠ শহর। বর্তমানের ইরাক শহরের কাছে ২০ হাজার মানুষ বসবাস করতো সেই শহরে।

প্রথম সভ্যতার পুস্তকি নাম ‘মেসোপটেমিয়া সভ্যতা’। আজ মাত্র থেকে ৭ হাজার বছর আগের ঘটণা। তবে কিছুদিন আগে ‘মেহেরগড়’ নামের যে সভ্যতার সন্ধান পেয়েছে মানুষ তার বয়স দেখা যাচ্ছে ৯ হাজার বছর।

মানুষের অনন্ত যাত্রার ইতিহাস

মানুষের তিন বিপ্লব: বুদ্ধি, কৃষি  ও বিজ্ঞান

যেদিন মানুষ আফ্রিকা ছেড়ে বের হলো তাদেরকেই যদি আমরা আমাদের প্রথম পুর্বপুরুষ ধরি তাহলে তাদের বয়স ৭০ হাজার বছর। মানুষের বেরিয়ে পড়ার এই সিদ্ধান্তকে বলা যায় মানুষের যুগান্তকারি প্রথম সিদ্ধান্ত। প্রথম বিপ্লব। বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব। মানব ইতিহাসে প্রথম বাঁক।

এরপর দ্বিতীয় যে বিপ্লবী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে মানুষ তার নাম দিতে পারি কৃষি বিপ্লব। লক্ষ বছরের শিকারি প্রাণীটি হয়ে ওঠে কৃষক। মানুষের দ্বিতীয় বিপ্লব কৃষিবিপ্লব। যার শুরু ১২ হাজার বছর আগে। 

মানুষের তৃতীয় বিপ্লবটি হলো বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। যার শুরু মাত্র ৫০০ বছর আগে। বিজ্ঞানের সাহায্যে মানুষ শুধু তার অতীত ইতিহাস খুজে বের করার সামর্থ্য অর্জন করে নাই, একসময়ের এক আকাশের নিচে, একি জঙ্গলে বসবাসকারি সকল প্রাণীর প্রভু  আর নিয়ন্ত্রণকর্তা হয়ে ওঠেছে। মানুষের চেয়ে শক্তিশালি প্রাণী এখন শুধু মানুষ।

মানুষ যদি সেদিন বেরিয়ে না পড়তো, মানুষ যদি শিকারী জীবন ছেড়ে কৃষিকাজ শুরু না করতো, যদি বিজ্ঞানকে আঁকড়ে না ধরতো, কেমন হতো এই পৃথিবী? এই সকল সিদ্ধান্ত কি মানুষে নিজেই নিয়েছে নাকি কোন এক অমোঘ প্রাকৃতিক নিয়তের ইশারায় নড়ছে আর অনন্তের পথে যাত্রা করছে ? এর উত্তর মানুষের হয়ত কখনো জানা হবে না। তবু মানুষ সামনে এগুতে থাকবে !!

 হাজার বছর আগে ফ্রান্সের দক্ষিণে শভে পুঁদ্যার্ক (Chauvet-Point-d’Arc) গুহার দেওয়ালে আঁকা মানুষের হাতের ছাপ, Source: Sapiens A Brief History of Humankind (Book)

শেষের আগের কিস্তি: 

ধর্মীয় বিশ্বাসী মানুষদের কাছে বিজ্ঞানের এই বিবর্তনীয় মতবাদকে খুবই হাস্যকর লাগে হয়ত! কাল্পনিক গল্পের মতো! তাদের কাছে খুবই বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য মতবাদটি হলো, স্রষ্টা মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাদের কিছু পরিবর্তন হয়ত হয়েছি কিন্তু বিবর্তন হয়নি। আদম-হাওয়া, অ্যাডাম-ইভ কিংবা মনু – সতরুপা রুপে পৃথিবীতে এসেছে । তারাই বংশবিস্তার করে আজকের অবস্থানে এসেছে। এই মতবাদটি খুব সহজ এবং সাধারণ। তাই হয়ত বেশির ভাগ মানুষ এটাতে প্রশান্তি পায়।

অন্যদিকে অল্প কিছু মানুষ তাদের সহযাত্রীদের উন্নয়ন আর দূর্দশার প্রাচীন ও বর্তমান বয়ান লিপিবদ্ধ করায় মনোনিবেশ করেন।  ৩০ হাজার বছরের আগে ফ্রান্সের শভে পুঁদ্যার্ক গুহায় আমাদের কোন এক পূর্বপুরুষ তার হাতের ছবি একে হয়ত বলতে চেয়েছে আমিও ছিলাম তোমাদের সাথে। আজ এত বছর পর তার হাত স্পর্শ করে বলতে ইচ্ছে করে আমরা এখনো যাত্রা জারি রেখেছি। হয়ত অনন্তের পথে !!


পারভেজ সেলিম

লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী


৪ thoughts on “বিবর্তনবাদ: শিকারি থেকে কৃষক তারপর সভ্যতা !

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x