চতুর্থ ফিতনা: আব্বাসীয় ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ


পারভেজ সেলিম


আব্বাসীয় খিলাফতের ৬ষ্ট খলিফা আল আমিন (৮০৯-৮১৩) ও ৭ম খলিফা আল মামুনের (৮১৩-৮৩৩) মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে যে দ্বন্দ ও যুদ্ধ শুরু হয় তাই ইতিহাসে ‘চতুর্থ ফিতনা’ নামে পরিচিত।

চতুর্থ ফিতনা শুরু হয় ৮০৯ সালে আব্বাসীয় খিলাফতের পঞ্চম ও সবচেয়ে প্রভাবশালি খলিফা হারুন অর রশিদের মৃত্যুর কিছুপর।

তবে অনেকে একে ইসলামের ফিতনা বলতে নারাজ। এর চাইতে এই যুদ্ধকে দুই ভাই এর ক্ষমতার দ্বন্দ হিসেবে দেখতেই বেশি পছন্দ করেন।

এই ফিতনার ফলে আব্বাসীয খিলাফতে একক কতৃত্ব চলে যায় আল মামুনের হাতে। পর্ববর্তীত প্রায় ২০ বছর শাসন করেন আব্বাসীয় খিলাফতের এই প্রভাবশালী খলিফা।

 শুরুটা কিছুদিন আগে ।

আব্বাসীয় খিলাফতের সবচেয়ে প্রভাবশালী খলিফা ছিলেন হারুন অর রশিদ। ৭৮৬ থেকে ৮০৯ এই ২৩ বছরের তার শাসনামলটি আব্বাসীয় খিলাফতে সবচেয়ে বড় স্বর্নযুগ।

বড় ভাই হাদি এক বছর ক্ষমতায় থাকার পরই মৃত্যুবরণ করলে ক্ষমতা চলে যায় হারুন আর রশিদের কাছে ।

আরব্য রজনী বিখ্যাত গল্প এসময়েই লিখা হয়।

তাছাড়া শিক্ষা,চিকিৎসা, বিজ্ঞান,  শিল্পকলা সবখানে ব্যাপান উন্নয়ন সাধান করে আব্বাসীয়রা। এসময়ে জন্ম নেয়া ইমাম  বুখারী (রা.) পরবর্তীতে হাদিস শাস্ত্র  প্রণয়ন করেন

খলীফা হারুন-অর-রশীদ হানাফী মাযহাবকে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছিলেন।

খলিফা হারুন অর রশিদের সন্তান ছিল ১২ জন ।

মৃত্যুর আগেই তিনি খিলাফতের দ্বায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে যান প্রথম চার ছেলে উপর। যারা একের পর এক ক্ষমতায় বসবে শর্তে লিখিত চুক্তি করে যান।

গন্ডগোলের সুত্রপাত এখান থেকেই।

হারুণের দ্বিতীয় পুত্র আল-আমিন ছিলেন খাঁটি আরব বংশদ্ভূত মাতা যুবাইদার পুত্র। আর অপরদিকে প্রথম সন্তান আল-মামুন ছিলেন একজন পারসিক ক্রীতদাসীর সন্তান।

খলীফা তাঁর প্রিয়তমা পত্নী জুবাইদা ও তাঁর ভ্রাতার চাপে পড়ে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র অযোগ্য আল-আমিনকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন।  

আর বড় ছেলে মামুণকে দেন খোরাসানের দায়িত্ব। আর বাকি দুই ভাই কাশিম আল মুতামিন ও আবু ইসহাক মোহাম্মদ মুতাসিমকে দুই প্রদেশের ক্ষমতায় বসান।

মক্কায় গিয়ে এক চুক্তির মাধ্যেম এই সম্পাদন করেন। প্রথমদিকে ভাইয়েরা সন্তুষ্ট ছিলো পিতার এমন সিদ্ধান্তে। তবে পিতার মৃত্যুর ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে দৃশ্যপট।

আল-আমিন ছিলেন অদূরদর্শী, আমোদপ্রিয়। তিনি রাজদরবারকে নর্তকী ও গায়িকার আবাসস্থলে পরিণত করেছিলেন। আমোদ-প্রমোদ ও বিলাসবহুল জীবনে ব্যাপক অর্থ অপচয় করতে লাগলেন।

অন্যদিকে আল মামুন ছিলেন প্রজ্ঞাবান-বিচক্ষণ, দার্শনিক ও আইনজ্ঞ। তিনি পবিত্র কুরআন কণ্ঠস্থ করেন। সাধারন মুসলমানের কাছে আল মামুন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন পর খলিফা আল-আমিন তাঁর পিতা কর্তৃক লিখিত চুক্তিপত্রের শর্ত লংঘন করতে শুরু করেন। তিনি তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে ভাই মামুনের পরিবর্তে নিজ পুত্র মুসাকে মনোনীত করেন।  সাথে আল মামুনের দুই পুত্রকে হত্যার নিদের্শ প্রদান করেন।

শেষ পর্যন্ত দুই ভাই এর পারিবারিক দ্বন্দ রুপ নেয় যুদ্ধে। ৮১১ সালে রাবী নামক স্থানে খলিফা আল আমিন পরাজিত হন আল মামুন কাছে।

আল আমিন আত্নসর্ম্পন করেন। কিন্তু উগ্র পারসিক সৈন্যের হাতে নিহত হন দুবছর পর ৮১৩ সালে।

এরপরই নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন আল মামুন। পুরো মুসলিম জাহানের ক্ষমতা এখন খলিফা আল মামুনের কাছে।

পরবর্তীতে ৮১৩-৮৩৩ প্রায় ২০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন আব্বাসীয় খলিফারদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী এই খলিফা আল মামুন।

দুই ভাই এর ক্ষমতার এই দ্বন্দকে অনেকেই ফিতনা বলতে চান না। তাদের মতে এটি দুই ভাই এর ক্ষমতার দ্বন্দ। আরবদের সাথে পারসিকদের দ্বন্দ হিসেবেও অনেকে দেখতে চান এই যুদ্ধকে।

১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের হাতে ক্ষমতা হারান আব্বাসীয়রা। অবশ্য তার অনেক আগে থেকেই পারসীদের কাছে আব্বাসীয়দের ক্ষমতা সংকুচিত হতে শুরু করেছিল । তারা নামে মাত্র খলিফা ছিলেন।

ক্ষমতার দ্বন্দে আব্বাসীয় দের মধ্যে আরো কিছু যুদ্ধ সংঘাত হয়। মুসলমান মুসলমান এই যুদ্ধ আর হানাহানি শান্তির ধর্ম নামে পরিচিত ইসলামের ইতিহাসে এক অন্ধকার বাস্তবতার উপাখ্যান।


পারভেজ সেলিম

লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী


One thought on “চতুর্থ ফিতনা: আব্বাসীয় ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x