শশাঙ্ক : প্রথম স্বাধীন বাঙালী রাজা

পারভেজ সেলিম
পারভেজ সেলিম

শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা এবং প্রথম বাঙ্গালী রাজা। এর আগে বড় বড় সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে আমাদের এই বাংলা শাসিত হতো। 

গৌড়কে কেন্দ্র করে প্রথম কোনো একক ব্যক্তি এই অঞ্চলের নেতৃত্বে আসেন। ৩৫/৪৫ বছর শাসন করেন। এই অঞ্চলে জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্রথম শক্তিশালী রাজা হলেন শশাংক। তাঁর কোন রাজবংশও তৈরি হয়নি। ইতিহাসে তিনি একাই এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। তার মৃত্যুর পর ছেলে মানব মাত্র আট মাস ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন।

গুপ্তযুগের শেষ দিকের দুর্বল শাসনের কারণে ছোট ছোট স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব হয়েছিল। 

বাংলা অঞ্চলে সেসময় দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র তৈরি হয়েছিল। দক্ষিন পুর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলার দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে ‘বঙ্গ রাজ্য’ এবং পশ্চিম ও উত্তরবাংলা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল ‘গৌড় রাজ্য’।

বঙ্গ রাজ্যের সেসময়ের তিনজন স্বাধীন রাজার নাম পাওয়া যায়। গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব। এই তিন রাজা ৫২৫ থেকে ৬০০ খ্রি. পর্যন্ত বঙ্গ রাজ্য শাসন করেছিলেন বলে ধরা হয়।

এরপর শশাংক মুলত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে এক বিশাল গৌড় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।  গুপ্ত বংশের পর প্রথম কোন শক্তিশালী রাজা আবারো এই অঞ্চলের ক্ষমতায় বসেন।

তবে বঙ্গের দক্ষিণ পুর্ব অঞ্চল তার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল কিনা তা সঠিক করে বলা সম্ভব নয়।তবে ক্ষমতায় বসেই মগধ, উড়িষ্যাসহ বিশাল এলাকা দখল করেছিলেন শশাংক।

শশাংকের ক্ষমতায় বসার তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে। কারো মতে ৫৯০ কারো মতে ৬০০ এবং কেউ কেউ বলেন শশাংক সিংহাসনে বসেছিলেন ৬০৬ সালে।

ক্ষমতায় বসেই শশাংক হাজার বছর ধরে চলা রাজধানীর পরিবর্তন করেন। পাটালিপুত্র থেকে  রাজধানী নিয়ে আসেন কর্নসুবর্ণে। 

বর্তমানে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলায় এর অবস্থান ছিল। মানে বাংলার রাজধানী এ অঞ্চলের আরো কাছে চলে আসে। 

এ সময়  উত্তর ভারতে এক পরাক্রমশালী রাজা হিসেবে আবির্ভুত হয়েছিলেন তার নাম হর্ষবর্ধন। শশাঙ্কের সাথে মহারাজা হর্ষবর্ধনের বৈরিতার কথা কিংবদন্তিতুল্য।

প্রাচীন লেখক বাণভট্ট রচিত ‘হর্ষচরিত’ গ্রন্থে এবং চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এর লেখায় এই বৈরিতা এবং যুদ্ধের কথা লিপিবদ্ধ আছে। শশাংকের সাথে হর্ষবর্ধনের বৈরিতার কারনটি বুঝতে একটু পিছনে ফিরতে হবে।

হর্ষবর্ধণের পিতা প্রভাকর বর্ধন মেয়ে রাজ্যশ্রীকে বিয়ে দিয়েছিলেন মৌখরি রাজা গ্রহবর্মণের সাথে। এর কিছুদিন তিনি মারা গেলে থানেশ্বর রাজ্যের ক্ষমতায় বসেন হর্ষবর্ধনের বড় ভাই রাজবর্ধন।

শশাংক বুঝতে পেরেছিলেন এতে মৌখরি রাজার শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই নিজদেশ রক্ষার স্বার্থে তিনি পাশ্ববর্তী মালবরাজা দেবগুপ্তের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন।

এরপর দেবগুপ্ত সুযোগ বুঝে কনৌজ আক্রমন করে মৌখরি রাজা গ্রহবর্মনকে হত্যা করেন ও রাজ্যশ্রীকে বন্দি করেন। 

বোনকে উদ্ধার করতে রাজবর্ধন কনৌজে পৌঁছায় এবং দেবগুপ্তকে হত্যা করতে সমর্থ হন। কিন্তু কনৌজে পুর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও বোনকে উদ্ধারের আগেই নিহত হন রাজবর্ধন।

অনেকের মতে শশাংকের হাতেই নিহত হয়েছিলেন রাজ্যবর্ধন।তবে রাজ্যবর্ধনের মৃত্যু নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে।

ধারণা করা হয়, শশাংক  দেবগুপ্তকে সাহায্যের জন্য কণৌজের দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন। শশাংকের সাথে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হয়েছিলেন রাজবর্ধণ। আবার কারো মতে রাজবর্ধন যে কোন কারনে হোক শশাংকের কাছে এসেছিলনে সেসময়  শশাংকের মন্ত্রীরাই হত্যা করে রাজবর্ধনকে ।

রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর মাত্র ১৬ বছর বয়সে থানেশ্বরের ক্ষমতায় বসেন হর্ষবর্ধণ।হর্ষবর্ধণের সাথে শশাংকের বৈরিতা  সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পায় ভাই হত্যার পর থেকে। 

যদিও শশাংকের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হর্ষবর্ধন বাংলা বা গৌড় অঞ্চল দখল করতে পারেননি। তবে মৃত্যুর পরই গৌড় ও বঙ্গ হর্ষবর্ধনের দখলে চলে যায়।

শশাঙ্ককে বৌদ্ধ বিরোধী রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে বানভট্ট ও হিউয়েন সাং এর লিখিত গ্রন্থে, যার সত্যতা নিয়ে ইতিহাসবিদেরা দ্বিমত পোষণ করেছেন। 

কারণ বাণভট্ট ছিলেন হর্ষবর্ধনের সভাকবি আর হিউয়েন সাং এসেছিলেন হর্ষবর্ধনের আমন্ত্রণে। তাই হর্ষবর্ধনের পক্ষে স্তুতিগাথা  লিখতে গিয়ে তারা শশাংকের বিষেদগার করেছিলেন বলে অনেক পন্ডিত মনে করেন।

শশাংক ছিলেন ব্রাক্ষ্মণ্যধর্মের পৃষ্ঠপোষক।শশাংকের সময় বঙ্গাব্দ চালু হয়। কারো কারো মতে পুন্ডবর্ধণও তখন গৌড়ের অধীনে ছিল। তবে শশাংক সেসময়ের পুরো বঙ্গ রাজ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবু ওবাংলার ইতিহাসের একজন খুবই গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি হয়ে আছেন শশাংক।

শশাংক যখন ক্ষমতায় বসেন তার বিশ বছর আগে ৫৭০ খ্রি. মানব জাতীর ইতিহাস বদলে দেয়া আরেক মহামানবের জন্ম হয় মক্কায়। তিনি হলে ইসলামের প্রধান ব্যক্তি মহানবী মুহাম্মদ (সা.)।

 যদিও শশাংকের ক্ষমতা গ্রহণ ও মৃত্যুর তারিখ নিয়ে দ্বিমত আছে। তবু কারো মতে ৫৯০ সাল, কারো মতে ৬০০/৬০৬ সালে তিনি ক্ষমতায় বসেন। আর তার মৃত্যু হয় ৬৩৮ সালে। মহানবীর মৃত্যুর (৬৩২) কাছাকাছি সময়। শশাংকের  মৃত্যুর ৬০০ বছর পর তার এই বাংলা মুসলমানদের দখলে চলে যায়।

কে এই শশাংক? 

শশাংকের বংশ পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায় না। কারো কারো মতে তার নাম ছিল নরেন্দ্রগুপ্ত। তাই তাকে গুপ্ত বংশের কোন এক বংশধর  হিসেবে ধরা হয়।

আবার কিছু  কয়েকটি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে মহাসামন্ত হিসেবে শশাংকের পরিচয় পাওয়া যায়। তাই ধরা  হয় তিনি একসময় সময় সামন্ত রাজা ছিলেন পরবর্তীতে বিশাল তিনি গৌড় সাম্রায্য প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন।

শশাংকের মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন ও কামরুপের রাজা ভাস্কর বর্মণ কতৃক দখল হয়ে যায়। বাংলা দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। কিছুদিনের মধ্যে তাদের শাসনও শেষ হয়। ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এই অঞ্চলের শাসন। বিশৃংখলা দেখা দেয় পুরো বাংলায়। আবারো ১০০ বছরের বেশি সময়ের জন্য এক গভীর নেতৃত্বের সংকটে পড়ে আমাদের এই বাংলা অঞ্চল। শুরু হয় মাৎস্যন্যায় বা অরাজকতার যুগ

পারভেজ সেলিম

লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী

ভিডিও দেখুন : সৌজন্যে : Banglabox

আরো পড়ুন :

৮ thoughts on “শশাঙ্ক : প্রথম স্বাধীন বাঙালী রাজা

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x