খলিফা আলী হত্যাকান্ড কেন এবং কিভাবে?


পারভেজ সেলিম

পারভেজ সেলিম


হয়রত  মুহাম্মাদের (সা.) মৃত্যুর পর ২৯ বছর ইসলামি রাষ্ট্রের ক্ষমতায় ছিলেন খলিফারা।হয়রত আবু বকর,‌ হয়রত উমর, হয়রত উসমান ও হয়রত আলী। এই চারজনকে বলা হয় খুলাফায়ে রাশেদিন। তারাই হচ্ছেন খলিফাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

শেষ নবী যেহেতু কাউকে মনোনিত করে যাননি এবং কিভাবে খলিফা নির্ধারিত হবেন তারও কোন সমাধান দিয়ে যাননি তাই বারবার ইসলামের উত্তরসুরি নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সেই জটিলতার সমাধান হয়েছে রক্তাত্ব অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে। চার খলিফার মধ্যে তিন জনকেই হত্যা করা হয়েছে।  

কিন্তু কেন, কারা, কিভাবে হত্যা করলো খলিফাদের? আর ইসলামের শুরুতেই কেন এমন নৃশংস আর রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো ? এই পর্বে নজর দেয়া যাক খুলাফায়ে রাশেদিনের সবশেষ খলিফা হয়রত আলীর হত্যাকান্ডের দিকে ।

আলী ( ৬৫৬-৬৬১ খ্রি.)

ইসলামের তৃতীয় খলিফা হয়রত উসমানের মৃত্যু পর আবারো এক ভয়াবহ সংকটে পড়ে ইসলাম। দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে মুসলমানেরা। নিজেদের মধ্য যুদ্ধে নিহত হন ৯০ হাজার মুসলমান। ইসলামের এমন এক ভয়াবহ সংকটকালে তৃতীয় খলীফার মৃত্যু পাঁচদিন পর মুসলিম উম্মাহর প্রধান হন আলী ইবনে আবু তালিব।

কিন্তু বেশিদিন স্থায়ী হয়না চতুর্থ খলিফার মেয়াদকাল।মাত্র ৪ বছর ৯ মাস ক্ষমতায় থাকার পর ইরাকের কুফায় ‘ইবনে মুলজাম’ নামে এক খাওয়ারিজের হাতে খুন হন খুলাফায়ে রাশেদীনের শেষ খলিফা হয়রত আলী। তখন তার বয়স হয়েছিল ৬০ বছর।


আরো পড়ুন : চার খলিফা: ইসলামের সংঘাত ও অর্জনের ২৯ বছর !

খলিফা হত্যাকাণ্ড: ইসলামের রক্তাক্ত ইতিহাস


আলী খলিফা হবার পর : 

খলিফা হবার পর হয়রত আলীর উপর সবচেয়ে বেশি চাপ আসতে থাকে দ্রুত উসমান হত্যার বিচার করার জন্য। কিন্তু সেই সময়ের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এই বিচার করাটা বড় জটিল ও অসম্ভব হয়ে পড়ে। 

এর প্রেক্ষিতেই বিরোধীরা এবার ‌উসমান হত্যার সাথে খলিফা আলীর জড়িত থাকার অভিযোগ  আনতে থাকেন। হয়রত আলী এমন গুরুতর অভিযোগকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। 

কিন্তু পরিস্থিতি ধীরে ধীরে এত খারাপ হয় যে শেষ নবীর স্ত্রী হয়রত আয়শা (রা.) তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। নিজেই উটে পিঠে চড়ে যুদ্ধের ময়দানে আসেন এবং যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। এই যুদ্ধ ‘বসরার যুদ্ধ’ বা ‘জংগে জামাল’ বা ‘উটের যুদ্ধ’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। হয়রত আলী এই যুদ্ধে জয় লাভ করলে বিবি আয়শাকে তিনি স্বসম্মানে মক্কায় পাঠিয়ে দেন।

বিবি আয়শার মতো উসমান হত্যার বিচারের সবচেয়ে বড় দাবিদার ছিলেন মুয়াবিয়া ও আমর ইবনে আস। বসরার  যুদ্ধে হয়রত আলী জয়ের পর, সিরিয়ার গর্ভনর মুয়াবিয়া, আলীর খেলাফতকেই অস্বীকার করে বসেন। শুরু হয় আলী- মুয়ারিয়ার নতুন যুদ্ধ ।‘সিফফিনের যুদ্ধ’। 

মুয়াবিয়ার শঠতার কারণে বাধ্য হয়ে হযরত আলী এই যুদ্ধে বিরতি দেন এবং আলোচনায় বসেন মুয়াবিয়ার সাথে। আলোচনায় বসায় এবার নতুন জটিলতা তৈরি হয় মুসলমানদের মধ্যে। খাওয়ারিজ মুসলামানেরা বিদ্রোহ করে বসেন। তারা মনে করেন  মুয়াবিয়ার সাথে যুদ্ধ বন্ধ করে খলিফা আলি কাফের হয়ে গেছেন। তাকে আগে তওবা করতে হবে তারপর অন্যকিছু। হয়রত আলী তাদের বোঝাতে ব্যর্থ হন যে, তিনি ভুল করেননি তিনি বাধ্য হয়েছিলেন এই আলোচনায় বসতে।

খাওয়ারিজদের বিদ্রোহ :

পরিস্থিতি এত খারাপ হয় যে মুয়াবিয়ার সাথে আবারো যুদ্ধ শুরুর আগে খাওয়ারিজদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ শুরু করেন খলিফা আলী। ইতিহাসে সেই যুদ্ধ  ‘নাহরাওয়ানের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত । অংশ নেয়া নয় হাজার খাওয়ারিজের প্রায় সকলেই নিহত হয়েছিলেন এই যুদ্ধে। বেঁচে থাকেন মাত্র নয়জন খাওয়ারিজ। তারাই পরে কাবা ঘরে এসে এক চরম আত্নঘাতি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।যা ইসলামের গতিপথকে আবারো বদলিয়ে দিয়েছিল।

খাওয়ারিজরা মনে করেন মুসলমানদের মধ্যে এই গৃহযুদ্ধের জন্য তিনজন ব্যক্তি দায়ী। আর তারা হলেন হয়রত আলী, মুয়াবিয়া আর আমর ইবনে আস। তারা নিজেদের বিবাদই  মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধিয়ে রেখেছে। তাদেরকে একসঙ্গে হত্যা করতে পারলে ইসলামে শান্তি ফিরে আসবে বলে তারা বিশ্বাস করেন।  

আর তাই নিজেদের জীবনের বিনিময়ে হলেও এই তিনজনকেই একসাথে হত্যার শপথ নেন যুদ্ধে বেঁচে যাওয়া খাওয়ারিজরা। তিনজন খাওয়ারিজ প্রস্তুত হন আত্নহুতি দিতে। এরা হলেন বারেক ইবনে আব্দুলাহ, আমর ইবনে বকর ও আব্দুর রহমান ইবনে মুলজাম। হত্যার সময় নির্ধারণ করেন ১৬ রমজান শুক্রবার। 

পরিকল্পনা অনুযায়ি দামেস্কের মসজিদে মুয়াবিয়াকে হত্যা করতে বের হন বারক ইবনে আব্দুল্লাহ। আঘাত করেন কিন্তু মুয়াবিয়া প্রাণে বেঁচে যান। অন্যদিকে আমর ইবনে আস নামাজ পড়তে না আসায় তাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হন। আমর ভেবে অন্য এক মুসল্লিকে খুন করেন খাওয়ারিজ আত্নঘাতি আমর ইবনে বকর। দুই হত্যার প্রচেষ্টা সফল না হলেও সফল হয় হয়রত আলির হত্যার চেষ্টা ।

কুফা শহরের গ্রান্ড মস্ক যেখানে খলিফাকে আঘাত করা হয়েছিল PC: wikimedia Comm

হয়রত আলী হত্যাকান্ড :

শুক্রবার কুফার মসজিদে ফজরের নামাজ আদায়ে আসেন খলিফা হয়রত আলী। খলিফা ঠিক যে সময়  সিজদা দিচ্ছিলেন ঠিক তখন বিষ মাখা ছুরি দিয়ে মাথায় আঘাত করে আবদুর রহমান ইবনে মুলজাম। তারপর দ্রুত পালিয়ে যান সেখান থেকে।

ছুরির আঘাতেই রক্তাত্ব ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে খলিফার শরীর। মসজিদ থেকে তাকে বাসায় নেয়া হয়। হামলার দুই দিন পর ২৯ জানুয়ারি, ৬৬১ সালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন খুলাফায়ে রাশেদীনের শেষ খলিফা হয়রত আলী ইবনে আবু তালিব।  

তবে কারো কারো মতে মুয়াবিয়াই এই হত্যাকান্ডের পরিকল্পনাকারী। তার নির্দেশেই হযরত আলীকে হত্যা করা হয়েছিল। যদিও তার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। খলিফার নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তীতে ইবনে মুলজামকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছিল। 

মৃত্যুর আগে হয়রত আলী তার বড় ছেলে ইমাম হাসানকে পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত করে যান। কিন্তু ছয় মাসের মাথায় আবারো মুয়াবিয়ার সাথে চুক্তি করে খেলাফত হস্তান্তরে বাধ্য হন ইমাম হাসান।ইসলামের নুতন নেতা হন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান। ইসলাম এক গভীর সংকটের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। আর এভাবেই শেষ হয়ে যায় ইসলামের স্বর্নযুগ নামে খ্যাত ২৯ বছরের ‘খুলাফায়ে রাশিদুনের যুগ’!


সৌজন্যে : Banglabox

৫৪ thoughts on “খলিফা আলী হত্যাকান্ড কেন এবং কিভাবে?

  1. Метод семейных расстановок по Берту Хеллингеру.
    Системно-семейные расстановки Структурные расстановки.
    Системные перестановки. Новые семейные расстановки.
    Структурные расстановки.
    Системные перестановки.

Leave a Reply

Your email address will not be published.