মঙ্গল মানুষের পরবর্তী ঠিকানা


পারভেজ সেলিম
পারভেজ সেলিম

মঙ্গলের মাটি আবারো স্পর্শ করেছে নাসার মঙ্গলযান ‘পারসিভিয়ারেন্স রোভার’। যানটি যখন মঙ্গলের মাটি স্পর্শ করে তখন বাংলাদেশে গভীর রাত। দুহাজার একুশ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারির রাত তখন ৩ টা ৫৫ মিনিট। নাসার বিজ্ঞানীদের বাধ ভাঙ্গা উচ্ছাস ছড়িয়ে পড়ে সারবিশ্বে। যেন নতুন বসতি গড়ার দিকে আরেকটি ধাপ এগিয়ে গেল মানুষ। তবে কি মানুষের পরবর্তী ঠিকানা হতে চলেছে মঙ্গল গ্রহ ?

কেমন গ্রহ মঙ্গল !

পৃথিবীর চাইতে ছোট একটি গ্রহ মঙ্গল। সৌরজগতে এর চাইতে ছোট শুধু বুধ গ্রহ। পৃথিবীর অর্ধেকের চাইতেও একটু বড় হবে এই লাল গ্রহটি। পৃথিবীর প্রায় সমান বয়সি এই গ্রহটির জন্ম  সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে। পৃথিবীর সাথে অমিল যেমন রয়েছে তেমনি মিলের পরিমানও কম নয় গ্রহটির।

এই বিশ্বব্রষ্মাণ্ডে এখন পর্যন্ত বসবাসের যোগ্য এর চাইতে ভালো কোন স্থান মানুষ আবিস্কার করতে পারেনি। পৃথিবী ৭০ ভাগ পানি দিয়ে ভরা আর মঙ্গলের পৃষ্ঠ পুরোটাই লাল পাথর আর শিলা দিয়ে ভরা। এজন্য এর নাম শিলাময় গ্রহ। আয়রণ অক্সাইড দিয়ে তৈরি এর পাথরগুলো তাই এটি দেখতে লাল দেখায়। মঙ্গল পৃথিবীর চাইতে ঠান্ডা গ্রহ। অতীতে পানির অস্তিত্ব ছিল তবে বর্তমানে মাটির নিচে বরফ জমা পানির অস্তিত্বের কথা বলছে বিজ্ঞানীরা।

আমাদের চাঁদ যেমন একটি মঙ্গলের চাঁদ আছে দুইটি। ফেমোস ও ডিমোস। মানে রাতের আকাশে দুইটি চাঁদ জ্বলজ্বল করে মঙ্গলের আকাশে।

পৃথিবী আর মঙ্গলের দিন রাত্রি প্রায় সমান। মঙ্গলে চব্বিশ ঘন্টা ৩৭ মিনিটে হয় দিন কিন্তু বছর প্রায় ৬৮৭ দিন। মঙ্গলে লাফ দিলে অনেক উপরে ওঠা যায় কারন সেখানে মধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর তুলনায় অনেক কম।


আরো পড়ুন : আইনস্টাইনের জীবনের পাঁচ নারী

মঙ্গলযাত্রার হিড়িক :

মানুষ এ পর্যন্ত ৪৯ বারের মতো মঙ্গলের দিকে যাত্রা করেছে। সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আমেরিকানরা। যদিও অনেক কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে মঙ্গলে যাবার সকল প্রস্তুতি শেষ করছে। এখন পর্যন্ত এই যাত্রায় যোগ দিয়েছে ৯ টি দেশ। এর মধ্য চীনের যান তো মঙ্গলের রাস্তায় । আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই মঙ্গলের মাটিতে পা দেবে। এছাড়া ইরান, রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান, ভারত সকলে এখন মঙ্গলের দিকে ছুটছে । সবশেষ এই তালিকায় নাম লিখিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।

এলন মাস্ক তো আগামী দুই বছরের মধ্যে মানুষ পাঠাতে চায় মঙ্গলে বসত গড়ার জন্য। সেজন্য তার কোম্পানী স্পেস এক্স উঠে পড়ে লেগেছে। সাথে অ্যামাজন ও ভার্জিন কোম্পানী বেসরকারি ভাবে মহাকাশ পর্যটন ব্যবসা চালু করেছে। মঙ্গল হচ্ছে মহাকাশ টুরিজমের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

‘পারসিভিয়ারেন্স’ বিশেষ কেন ?

‘পারসিভিয়ারেন্স’ মানে অধ্যবসায় বা উদ্দ্যম। এবারই প্রথম এমন একটি মহাকাশ যান পাঠানো হয়েছে যেটির এযাবৎ কালে সবচয়ে বুদ্ধিদীপ্ত যান। ছবি ভিডিও পাঠানো এবার খুব সহজে কর্ম বানিয়ে ফেলেছে মহাকাশ যানটি। এতে ২৩ টি ক্যামেরা আর ২ ট মাইক্রোফোন রয়েছে । আছে একট ড্রোন ক্যামেরাও। ফলে অন্য গ্রহে গিয়ে প্রথমবারের মতো আকাশে উড়বে কোন যান ।

মঙ্গল পৃথিবী থেকে ৪৭ কোটি মাইল দুরে । যেতে সময় লেগেছে ৭ মাস। আর সেখান থেকে ছবি আসতে সময় লাগবে ১১ মিনিটের বেশি ।

এবারের ‘পারসিভিয়ারেন্স’ মঙ্গলের মাটি ২ মিটার পর্যন্ত খুড়তে পারবে এবং সেই মাটি নিয়ে উড়াল দেবে ইউরোপিয়ান স্পেস স্টেশনের দিকে। সেখান থেকে মঙ্গলের মাটি চলে আসব পৃথিবীতে। এ এক অভাবনীয় ব্যাপার।

এবার এমন একটি জায়গায় এই যানট নামানো হয়ছে যেখানে প্রাচীনকাল পানির প্রবাহ ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতীতকালে প্রাণের অস্তিস্ব ছিল কিনা তা প্রমাণই হবে এবারের গবেষণার মুল বিষয়।

কত দুরে মঙ্গল ?

পৃথিবী থেকে মঙ্গলের দুরুত্ব ৪৭ কোটি মাইলের বেশি । সাধারনতে  মঙ্গলে যেতে  দুই আড়াইবছর লাগে। তবে এখন এই সময় কমিয় নয় মাসে আনা গেছে । এবারের রোবার তো মাত্র ২০৩  পৌছে গেছে মঙ্গলে। তবে নিউক্লিয় শক্তি ব্যবহার করে রকেটের গতি যদি বাড়ানো যায় তাহলে ধারনা করা হচ্ছে এই সময়টা কমিয়ে তিনমাসে আনা সম্ভব। কেউ কেউ আরেকটু বাড়িয়ে সম্ভবনা দেখছেন ৩৯ দিনে মঙ্গলে পোছানো।

নাসার ধারণা মঙ্গলে মানুষ যেতে ২০৩৩ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এটা ২০৩৯ সাল পর্যন্ত লাগতে পারে। তবে এলন মাস্ক ২০২৫ সালের মধ্য মানুষ পাঠাতে চায় মঙ্গলে। দেখা যাক কবে মানুষ এই পৃথিবী ছেড়ে বসবাসের জন্য নতুন আরেক পৃথিবীতে পাড়ি জমায়। ততদিন পর্যন্ত  শুধু অপেক্ষা।


পারভেজ সেলিম
লেখক ও চলচ্চিত্রকার

আরো পড়ুন : টিকা আবিস্কারের ইতিহাস

ভিডিও সৌজন্য : Banglabox

৩ thoughts on “মঙ্গল মানুষের পরবর্তী ঠিকানা

Leave a Reply

Your email address will not be published.