পারভেজ সেলিম
শীত আসলো বলে। জানালার পর্দার ফাঁক গলে রোদ ঢুকছে । কুসুম নরম ছোঁয়ায় চোখ খুলতেও কেমন আবেশ লাগে।
মেয়েটা দৈনিক রান্নার টুঙটাঙ শব্দ করছে। বালিশে আর রোদের কোলে নাড়াচাড়া করতেই কোথা হতে যেন বের হয়ে আসলো, গুপ্তধন। যা ছিল, আছে জানি তবে এত প্রাণ নিয়ে ধরা দেবে তা তো অজানা ছিল।
অনেকগুলো ছোট বাচ্চা একসাথে মালতিলতার মতো দুলে দুলে একসাথে গাইছে ‘ওই মালতিলতা দোলে….’। সাথে টুং টুং করে ‘মুরতি’ বাজাচ্ছেন শিক্ষক।
কি অদ্ভুত সৌন্দর্য্যে বেজে ওঠল প্রাণ। দোলা দিলো হৃদয়ে। আহা! কি নির্মল ছন্দের ঢেউ আর বাণী। রবীন্দ্রনাথের আরেকটি পুরাতন গান নতুন প্রাণের পরশ ছুঁয়ে গেলো এই শীতের সকালে।
নব্বই বছর আগে, জীবনের শেষ দশকে তখন রবীন্দ্রনাথ। শান্তিনিকেতনে বসে তার প্রকৃতি দেখার বোধকে, কি আনন্দ অবলিলায়, ছন্দে সুরে বলে গেছেন অব্যর্থভাবে।
শত বছর পরে যন্ত্রের শহরে কোন এক মধ্যবয়সী যুবককে মোহিত করে রাখলো সেই সুর, ছন্দ আর দৃশ্য ভাবনা।
মালতিলতা ফুল দুলছে। এতটুকুই ঘটনা।
কবির প্রথমে চোখে পড়েছে। পরে হৃদয়ে দোলা দিয়েছে। তিনি প্রথমে ঘটনার বর্ননা করেছেন, পরে অনুভব ব্যক্ত করছেন। তারপর দার্শনিক চিন্তায় মগ্ন হচ্ছেন। শব্দে সুরে তিনি প্রকাশ ঘটাচ্ছেন সেই মুহর্তের অনুভুতির। জীবন আনন্দময় হয়ে উঠছে।
ওই মালতী লতা দোলে…
কোথায়?
পিয়াল তরুে কোলে
কেন?
পুবের হাওয়ায়
এরপর কবি গাইছেন…
মোর হৃদয়ে লাগে দোলা, ফিরি আপন ভোলা
মোর ভাবনা কোথায় হারায়
মেঘের মতন যায় চলে।
কাহরবা তালের ঢেউয়ে মন ভেসে যায়।
শুধু প্রকৃতিকে দেখা ও অনুভুতিকে প্রকাশের একটা নিটোল ভাষা দিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেন না কবি। এরপর তার ছোট মালতি লতার দোল থেকে আসল খোঁজ শুরু হইলো!
ছোট্ট এক ফুলের নড়াচড়া কবিকে কি রকম আলোড়িত করে তার প্রকাশ দেখতে পাই এখানে।
এরপর যা বলছেন তাই আসলে রবীন্দ্রনাথ।
আজীবনের অন্বেষণকারী। খুঁজতে খুঁজতে পুরো জীবন পার করে দেয়া এক অভিযাত্রী।
এই গানটি যখন লিখছেন তখন তার বয়স হয়ত ৭৫ বছর।
এই যে হৃদয়ের এত নড়চড়া এগুলো কেন? কে করে? কিছু ক্লু দিচ্ছেন।
জানি না কোথায় জাগো ওগো বন্ধু পরবাসী।
কোন নিভৃত বাতায়নে।
কবি জানেনা কিন্তু জানার জন্য খুব উতলাও নয়। যেন মেনে নিয়েছে সেই স্রস্টার মহত্ব, দান ও করুণা। যিনি মাধবীলতাকে জাগিয়ে রাখে সে পরবাসী ও নিভৃতে থাকা কেউ হবে একজন।
তিনি এসে মালতি লতার কানে কিছু বলছে তাতেই দুলে উঠছে লতা। সহজের রুপে ধরা পড়ে প্রকৃতির সাথে স্রষ্টার কথোপোথন হচ্ছে। তারই আনন্দ নাচন প্রত্যক্ষ করছেন কবি। এই হচ্ছে মর্মমথা।
শেষের লাইটা.
সেই পরবাসে কোন এক বিরহিণী নিশিথের জলভরা কন্ঠে কি বলে যায় ।
কি বলে যায় তা কবি জানেন না।
কিন্তু এই বলে যাওয়ার প্রতিক্রিয়া এত সুন্দর, এত অপরুপ ছন্দে দোলা দেয় এক মালতি ফুলকে। ঠিক সেই সময় নজরে আসে কবির।
রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন প্রকৃতির মুখপাত্র।
কতবার এই গান আগে শুনেছি। কখনো এত রুপ রসও গন্ধে ধরা পড়েনি। আজ এত বছর পর, এত বয়স হবার পর, যে দোলা হৃদয়ে দিল সেই হৃদয়টুকু বেঁচে থাকুক।
ঐ বাচ্চা গুলোর মতো আমার সন্তানও গেয়ে উঠুক মালতি লতা দোলে। তার হৃদয়ও নেচে গেয়ে উঠুক জীবনের আলো ছায়ায়। প্রশান্তিতে বাঁচুক প্রকৃতি, মানুষ ও তার সন্তানেরা।
আর রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাক যতদিন না আরেক রবীন্দ্রনাথ জেগে ওঠে।
পারভেজ সেলিম
লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী

