শ্রীলংকায় অর্থনৈতিক সংকটের কারণ কি?

পারভেজ সেলিম
পারভেজ সেলিম ।।

শ্রীলংকা বর্তমানে উৎকন্ঠা, আশংকা এবং আতংকের দেশ। অন্ততো বাংলাদেশের মানুষের কাছে, বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়া দেশটির নাম শ্রীলংকা। অনেকে বাংলাদেশের সাথে দেশটির মিল খুজে পাচ্ছেন, অনেক বলছেন তার উল্টোটা।শ্রীলংকার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কয়েক পর্বের ধারাবাহিকের আজ ২য় পর্ব । নজর দেয়া যাক কেন শ্রীলংকার অর্থনীতির অবস্থা এমন হল ?

করোনা : পর্যটনের সর্বনাশ

শ্রীলংকার মোট আয়ের একটা বড় অংশ (১২ শতাংশ) আসে পর্যটন খাত থেকে।

২০১৯ সালের ইস্টার সানডের সময় বড় ধরনের জঙ্গি হামলার শিকার হয় দেশটি। গির্জা ও তিনটি হোটেলে হামলায় ২৫৩ জন নিহত হয়। ব্যাপকভাবে বিদেশি পর্যটক কমতে শুরু করে দেশটিতে। তারপর হানা দেয় করোনা। দুবছরে ভয়াবহ ধ্বস নামে তাদের পর্যটন ব্যবসায়।

এরপর ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে আবারও বিপর্যয় নেমে আসে। কারণ শ্রীলংকার বেশির ভাগ পর্যটকই রাশিয়ান। টানা কয়েক বছরে এমন পরিস্থিতিতে সর্বনাশের চুড়ান্তে চলে যায় দেশটি।

অর্গানিক ফুড: একরাতেই উল্টাপাল্টা

হঠাৎ করেই সকল প্রকার রাসায়নিক সার ব্যবহার বন্ধ ঘোষণা করে শ্রীলংকান সরকার।

২০২১ সালের মে মাসে রাসায়নিক সার আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। দেশকে অর্গানিক ফুড উৎপাদনে নিয়ে যেতে চায় সরকার। সিদ্ধান্তটি খুবই ভালো। একটা দেশের উন্নতির লক্ষণ। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হয়েছে।

দেশের কৃষক এখনও  প্রস্তুত হয়নি জৈব- উৎপাদন পদ্ধতিতে। কোন ধরণের পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্তে ব্যাপকহারে কমে যায় উৎপাদন। ধান উৎপাদন কমে যায় ২০ শতাংশ। আর এক বছরে চা রপ্তানী কমে যায় ১০০ কোটি ডলারের বেশি।

করোনাকালীন সময় সেই দেশগুলো ভালো অবস্থানে ছিল, যাদের কৃষি উৎপাদন ভালো ছিল। শ্রীলংকা এসময় দেশীয় উৎপাদনের তলানীতে নেমে যায়।

ঋণ : জালে আটকে হাসফাঁস

সিঙ্গাপুর, মালেশিয়ার চাইতে আধুনিক উন্নত রাষ্ট্র বানানো জন্য বিশাল বিশাল প্রকল্প হাতে নেয় শ্রীলংকান সরকার। নিজেদের টাকা নয়, ঋনের টাকায় শুরু হয় এসব বড় প্রকল্প।

সেই বিশাল বিশাল প্রকল্পে শুরু হয় সীমাহীন দুর্নীতি। ফলাফল হয় ভয়াবহ। প্রকল্প গুলো মুখ থুবড়ে পড়ে। অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়।

হাম্বানটোটায় দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করে শ্রীলংকা। সেসময়ের রাষ্টপতি মাহেন্দ্র রাজাপাকসের নামে করা হয় নামকরণ। এর মোট বিনিয়োগের ৮৫ ভাগই করে চীন। প্রায় ৩১ কোটি ডলার ঋণ আসে চীন থেকে। বন্দরটি উদ্বোধন করা হয় ২০১০ সালে।

যেভাবে ভাবা হচ্ছিল সমুদ্রবন্দর থেকে সেরকম আশানুরুপ কোন আয় হচ্ছিল না। কিন্তু এটি চালু রাখতে ব্যয়ের পরিমান বাড়ছিল। পরিচালন ব্যয় মেটাতে আরো ৭০ কোটি ডলার ঋণ নেয় চীন থেকে।

সময় মতো সেই ঋণের টাকা শোধ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে ১১০ কোটি ডলারের বিনিময়ে ৯৯ বছরের জন্য বন্দরটিকে চিনের কাছে লীজ দিতে বাধ্য হয় শ্রীলংকা।

সবচেয়ে সম্ভাবনাময সমুদ্র বন্দরটি এখন চীনের মালিকানায়। নিজের ভুখন্ড এখন অন্যের দখলে। চীন তাদের ঋণের জালে ভালোভাবে ফাঁসিয়ে দেয় দেশটিকে ।

শুধু তাই কলম্বোর সমুদ্রের ভিতর বিশাল শহর, মাত্তালা রাজাপাকসে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো বিশাল বিশাল প্রকল্পগুলো ঋণের টাকা করা এবং তা পুরোপুরি অলাভজনক প্রকল্পে পরিনত হয়।

তবে চীনই শ্রীলংকার প্রধাণ ঋণদাতা নয়। মোট ঋণের মাত্র ১০.৮ শতাংশ ঋণ চীন থেকে নেয়া। এছাড়া জাপান থেকে ১০.৯, এডিবি থেকে ১৪.৬ শতাংশ এবং আর্ন্তজাতিক সার্বভৌম বন্ড থেকে তারা নিয়েছে তাদের মোট ঋণের ৩৬.৪ শতাংশ।

এ বছর তাদের শোধ করতে হবে ৫০০ কোটি ডলার অথচ তাদের আছে মাত্র ২৩১ কোটি ডলার। একটি দেশের অর্থনীতির এক ভয়াবহ দুরব্স্থার প্রকাশ এর চাইতে আর কি হতে পারে।

কর ভ্যাট কমানো:

নির্বাচনে জেতার জন্য কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল গোটাবায়া রাজাপাকসে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনে ৮ শতাংশে। ‘আর যত আয় তত কর’ এই নীতির বিলুপ্তি ঘোষণা করেন সরকার ।

ফলাফল এক বছরে সরকারের আয় কমে যায় ৫০ শতাংশ কিন্তু ব্যয় বেড়ে গেছে কয়েকগুন বেশি। সংকট সমাধানের কোন উপায়ই বের করতে পারেনি শ্রীলংকা।

তৈরি পোষাক, চা, রাবার, পর্যটন, রেমিটেন্স এই কয়েকটি খাত থেকেই আয় করতো দেশটি। তার সব কয়টিতে একসাথে ধ্বস নামায় অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে যায় দ্বীপ রাষ্ট্রটির।

দুর্নীতি ও লুটতরাজ: প্রধানতম সমস্যা

রাজাপাকসেরর পরিবার ও অন্যান্য সরকারগুলো ব্যাপক দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল। বড় বড় প্রকল্প গুলো তারা যতটা দেশের উন্নয়নের আশায় নিয়েছিল, তা চেয়ে বেশি নিয়েছিল নিজেদের পকেট ভারি করার জন্য। হাম্বারটোটায় সমুদ্র বন্দর ও জঙ্গলের মধ্যে যে বিমানবন্দর বানানো হয়, দুটোই বানানো হয় রাজাপাকসের পরিবারের নামে। এর সবগুলোই ‘সাদা হাতির প্রকল্পে’ পরিনত হয়েছে। বিমানবন্দর দিয়ে বিমান উঠানামা করে হাতে গোনা আর সমুদ্রবন্দরে তেমন কোন জাহাজই ভিড়েনা।

কোন দেশের বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশ হলেই যেখানে বিপদসংকেত হিসেবে ধরা হয়, সেখানে শ্রীলংকার বাজেট ঘাটতি ১০ শতাংশ। সীমাহীন দুর্নীতি, সরকারের স্বজনপ্রীতি আর পরিবারতন্ত্রই এই সংকটকে আরো জটিল করে দিয়েছে।

বর্তমান অর্থমন্ত্রী চামাল রাজাপাকসে প্রেসিডেন্টের ভাই। সবাই তাকে চেনে ‘মিস্টার ১০ পার্সেন্ট’ নামে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা।

( চলবে …)

পারভেজ সেলিম

লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী

আরো পড়ুন :

x