স্কুইড গেম: সমাজের এক নির্মম নৃশংসতার গল্প!

0Shares
parvez salim alordeshe

পারভেজ সেলিম

চরম হতাশা গ্রস্থ একদল মানুষকে একটি বিশেষ খেলায় অংশগ্রহণ করার প্রস্তাব দেয়া হয়। খেলায় জয়ী হলে পাবেন বিশাল পরিমান অর্থ (৩২৫ কোটি) আর হারলে নিশ্চিত মৃত্যু। 

যদিও মৃত্যুর কথা প্রথমে প্রতিযোগীদের বলা হয়না। প্রথম রাউন্ড শুরুর পর যখন তারা বুঝতে পারে ততক্ষনে খেলার শর্তের মধ্যে ঢুকে গেছে চরিত্রগুলো, শর্তানুয়াযী সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিযোগী না চাইলে কেউ খেলা থেকে মুক্তি পাবে না। হয় মৃত্যু নয়ত বিজয়।

ছয় রাউন্ডের খেলা শেষে বেঁচে থাকেন মাত্র একজন প্রতিযোগী। তিনি বিজয়ী এবং পুরস্কৃত হন। এই হচ্ছে সিরিজের সংক্ষিপ্ত গল্প।

এখন কথা হচ্ছে, এমন আজগুবি একটা গল্পের সিরিজে ইউরোপ আমেরিকা সহ সারা দুনিয়া বুঁদ হয়ে পড়লো কেন? 

মাত্র ১৫০ কোটি টাকা দিয়ে বানানো নয় পর্বের সিরিজটি নেটফ্লিক্সের ইতিহাসের সকল হিসেব উল্টে পাল্টে দিয়ে ৮০০০ কোটি টাকা কেমনে আয় করলো? সিরিজটি দেখতে বসার আগে এটাই ছিল আমার প্রধান আগ্রহ। কি আছে এতে? কেন এত মানুষ দেখছে কোরিয়ান এই সিরিজটি ? 

খুন খারাবি, জম্বি, হরর ধরনের সিনেমা আমাকে খুব আগ্রহী করেনা। জানতাম অনেক নির্মমতা আছে সিরিজটিতে, তাই খুব বেশি ভালো লাগবে এমন আশা নিয়ে দেখতে বসিনি। কিন্তু আমার প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে বহুদুর চলে গেছে সিরিজটি। 

নয়টি পর্ব একটানা শেষ না করে অন্য কিছুতেই মন বসাতে পারিনি। যদিও আমার সিরিজটি শেষ করতে ২৮ ঘন্টা সময় লেগেছে।

প্রথম গেমের দৃশ্য ; Source : Netflix

কি আছে স্কুইড গেম এ ?

স্কু‌ইড গেমকে আমার একটি ‘দার্শনিক সিরিজ’ বলে মনে হয়েছে। জীবনের মানে কি? জীবনে কত অর্থের প্রয়োজন? কোনটি বেশি মুল্যবান অর্থ নাকি সম্পর্ক? জয় পরাজয় কি? গল্পের ছলে আসলে এসবের উত্তর খোঁজার চেষ্টা আছে সিরিজটিতে।

এই পুঁজিবাদী সমাজে নৃশংসতা, স্বার্থপরতা,শঠতা আর হিংস্রতায় ডুবে আছে মানুষ, শুধু নিজে জিতবে বলে। নিজের বিজয়কে নিশ্চিত করতে সবকিছু করছে মানুষ নামের প্রাণীটি।  কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি আসলেই সফল হন তথাকথিত বিজয়ীরা? এসবের একধরনের উত্তর পাওয়া যাবে সিরিজে।

অতিমাত্রায় নৃশংসতার প্রদর্শণ এই সিরিজের সবচেয়ে দুর্বল দিক মনে হয়েছে। তবে গল্পটি বলার জন্য এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী পদ্ধতি কিনা তা নিয়ে বির্তক হতে পারে। 

যাই হোক, আপাতত আমি আমার সন্তানকে নিয়ে একসাথে এই সিরিজ দেখতে পারবো না বলেই একে দুর্বল বলছি।

খুব সহজে বললে, এই চরম অস্থির সময়টিতে আমাদের জীবনটাই আসলে স্কুইড গেম। আমাদের সকল জয় কাউকে না কাউকে পরাজিত করে। একসাথে সকলের জয় পৃথিবীর মানুষ এখনও দেখেনি।আদৌ দেখতে পাবে কিনা তা একটি বিরাট প্রশ্ন!

সিরিজে দেখানো হয় , জয় পরাজয়ে হিসাব নিকেশ নির্ধারিত হয় কিছু মানুষের বানানো আইন দ্বারা, আয়োজকেরা নিজেদের বিনোদনের জন্য এই নিয়ম যখন তখন পরিবর্তনও করে। ফলাফল মৃত্যু হয় প্রতিযোগীর। আর তাতে পৈশাচিক আনন্দ পান বৃদ্ধ ধনকুবেরা।

সিরিজের মতো বাস্তব জীবনেও কোন লেবেলে গিয়ে কার খেলা কখন শেষ হয়ে যায় তা আমরা জানি না, তবে সবার গেমই যে একদিন শেষ হয়ে যায় সেটা নিশ্চিত শুধু সময়টা অনিশ্চিত।সিরিজের চরিত্রগুলোর সাথে দর্শক নিজেদের মিলিয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছে বলেই হয়ত এত সাড়া ফেলেছে সিরিজটি ।

সিরিজে আমরা দেখি বিজয়ী ছাড়া আর কেউ নৈতিকতার জয় দেখে যেতে পারেন না, সকলে খারাপ মানুষের জয় দেখেই মারা যান। যেমনটা বাস্তবের দুনিয়ায় দেখি বাজে মানুষগুলোর জয়জয়কার চারিদিকে।

সিরিজের একটি দৃশ্য ; Source : Netflix

সেই পুরাতন শিক্ষাটিকে ভিন্নভাবে বলার চেষ্টা হয়েছে সিরিজে, জীবনে দু:খ আছে, হতাশা আছে তার মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে পালিয়ে গিয়ে আসলেই কি সফল হওয়া যায়?  

দেখতে বসে আপনিও হয়ত ভাবতে বাধ্য হবেন, মানুষের আসলে একসাথে লড়াই করা ছাড়া উপায় নাই।একক সাফল্য আসলে শেষ পর্যন্ত কোন সফলতা আনেনা। সবার যেখানে মঙ্গল নাই, সেই জয়ের মধ্যে সাময়িক আনন্দ থাকলেও এর গভীরে আছে নৃশংসতা আর আদিম পৈচাশিকতা। আমাদের মানবিক হওয়া প্রয়োজন, যে কোন মুল্যে বিজয় ছিনিয়ে আনা নয়। 

সিরিজটি অসাধারণ অভিনয় করেছেন চরিত্রগুলো। বিশেষ করে প্রধান কয়েকটি চরিত্র, স্যে-বেয়ক (০৬৭) নামে উদ্বাস্তু মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করা জ্যাং হো ইয়ন, মুল চরিত্রে অভিনয় করা লি জং জে (৪৮৬) আর বৃদ্ধ চরিত্রে উ ইয়াং সু (০০১) ছিল অসাধারণ। 

আর জং দেওক সু (১০১) চরিত্রে অভিনয়কারী হেও সাং তাই এর  অভিনয় অনেকদিন মনে রাখবে মানুষ।

নির্মাতা হোয়াং ডং হেয়ুক ; Source : Netflix

অভিনয়, চিত্রনাট্য, সেট ডিজাইন, কস্টিউম, সঙ্গীত সহজেই আপনাকে আকৃষ্ট করবে। পরিচালক হোয়াং দং হিউক ১২ বছর আগে এই গল্পে সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খুনোখুনি ধাঁচের এই সিনেমা দর্শক কতটুকু নিতে পারবে তা নিয়ে তিনি সন্দিহান ছিলেন বলেই তখন তিনি আর তা নির্মাণ করেননি ।

২০১৯ সালে এসে নেটফ্লিক্সের মত প্লাটফর্ম এটি নির্মাণে আগ্রহ দেখায় , তিনি সাহস করে বানিয়ে ফেলেন এবং দুনিয়া কাঁপাতে শুরু করেন। পরিচালক এক সাক্ষাতকারে বলেছেন ‘আমি একটি গল্প লিখতে চেয়েছি যা আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের গল্প তুলে ধরবে। এই চরিত্রগুলো বাস্তব জীবনে সবার চেনা” । একটি সহজ সাবলিল গল্পের ছলে পুঁজিবাদি সমাজের সেই চরিত্র নির্মাণে দারুণ সফল হয়েছেন পরিচালক ও তার টিম। 

তবে জনপ্রিয় হয়েছে বলেই যে সিরিজটি সবার ভালো লাগবে তা নয়। জনপ্রিয়তা সফলতার মানদন্ড নয় অনুসঙ্গ মাত্র। কারো যদি সিরিজটি একেবারে অপছন্দ হয় তাহলেও অবাক হবার কিছু নাই।

খেলোয়াড় ও সৈনিক Source : Netflix

নেটফ্লিক্স এই সিরিজটি নিয়ে কোন ধরনের প্রচারণা চালায়নি অথচ এ বছর ১৭ সেপ্টেম্বরে মুক্তি পাবার পর প্রথম মাসেই ১১ কোটি মানুষ সিরিজটি দেখা শেষ করেছে। ৩৭ টি ভাষায় ডাব করা হয়েছে। ভালো নির্মাণ আর গল্প হলে যে ভাষা এখন আর কোন বাধা নয় তার প্রমাণ দক্ষিক কোরিয়ার এই সিরিজটি ।

৯০ টি দেশে সিরিজ র‍্যাঙ্কিং এর প্রথমে উঠে আসে সিরিজটি। মানুষ নিজেরাই নিজে এই সিরিজের প্রচারণা চালিয়েছে। ফলাফল নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে বেশি আয় করা সিরিজ এখন ‘স্কুইড গেম’। বর্তমান সমাজের এক নির্মম নৃশংসতার এক অসাধারণ রুপক চিত্রায়ণ।

আরো পড়ুন :

মাজিদির সেরা পাঁচ সিনেমা

কিম কি দুক কোরিয়ান সিনেমার ‘গড’

0Shares

৮ thoughts on “স্কুইড গেম: সমাজের এক নির্মম নৃশংসতার গল্প!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x