চর্যাপদ: বাঙলায় লিখিত প্রথম বই

0Shares
পারভেজ সেলিম

পারভেজ সেলিম ।

বাঙলা ভাষার বয়স কত তার প্রমাণ পাওয়া যায় একটি মাত্র গ্রন্থে, আর সেটি হলো চর্যাপদ। ১৯০৭ সালে এটি আবিস্কারের আগে কেউই ভাবতে পারেনি আমাদের ভাষার বয়স এত পুরনো হবে। ড.সুনীত কুমারের মতে চর্যাপদ লেখা হয়েছে ৯২০-১২০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। তবে ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে এটি আরো প্রাচীন ৬৫০-৭০০ খ্রী.। তার মানে ৮০০ অথবা ১৩৫০ বছর হচ্ছে আমাদের ভাষার বয়স। তার প্রাচীনতম লিখিত প্রমাণ হচ্ছে ‘চর্যাপদ’।

নেপাল থেকে আবিস্কার :

১৯০৭ সাল পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবার থেকে আনেন কয়েকটি অপরিচিত বই। তালপাতায় লেখা প্রাচীন একটি বই এর প্রতিলিপি নিয়ে এসেছিলেন হরপ্রসাদ। পরে তিনি নিশ্চিত হন এটিই বাংলা ভাষায় লিখিত প্রাচীন গ্রন্থ । 

এর আগে দুইবার নেপাল গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছিলেন এই গবেষক। তার মনে এইরকম একটি বই পাবার সম্ভাবনা জেগেছিল রাজা রাজেন্দ্র লালমিনের লেখা ‘Sanskrit Buddhist Literature in Nepal (1882)’ নামের একটি বই পড়ে। এই বইতে লালমিন চর্যাপদের অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা দিয়েছিলেন। তৃতীয় দফায় নেপাল গিয়ে শাস্ত্রী সফল হন। চারখানা পুঁথি সংগ্রহ করে আনেন তিনি। প্রথমটি ছিল ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয় বা চর্যাপদ’ সাথে আরো দুটি পুঁথি ডাকার্নব ও দোহাকোষ।  

বৌদ্ধ গান ও দোহা
বৌদ্ধ গান ও দোহা

চর্যাপদ আবিষ্কারের নয় বছর পর ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে আধুনিক লিপিতে প্রকাশিত হয় চর্যাপদ। বইটি প্রকাশ পায় ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে। সম্পাদনা করেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। 

বইটি প্রকাশের পর চারিদিকে রইরই পড়ে যায়। অন্য ভাষাভাষীরা এর মালিকানা দাবি করে বসেন। অসমীয়া, মৈথিলি, ওড়িয়া সকলে বলতে শুরু করেন এটা তাদের আদি ভাষায় লেখা। রাহুল সাংস্কৃতায়ণ বলেন এটা হিন্দির আদি রুপ।

পন্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

কার অবদান :

সবাই যখন বলতে শুরু করলেন চর্যাপদ আমাদের আমাদের, তখন সুনীতিকুমার তার পান্ডিত্য আর গবেষণা দিয়ে বিশাল এক ইংরেজি বই লিখেলেন এবং প্রমাণ করে দিলেন যে চর্যাপদ অন্য কারো নয় এটি বাংলার আদি রুপ। সবাই তার পান্ডিত্যের কাছে হার মেনে গেল। চর্যাপদ আমাদের হয়ে গেল। বাংলা ভাষার গৌরব গিয়ে ঠেকলো হাজার বছরে। তবে অসমীয় ও বাঙলা প্রায় একই ভাষা ছিল। ফলে চর্যাপদের উপর অনেকের অবদানকে কেউ কেউ অস্বীকার করতে চান না।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর চর্যাপদ আবিস্কারের পরে সেটিকে আমাদের নিজেদের করার পিছনে ড. সুনীতি কুমার, ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, প্রবোধ চন্দ্র বাগচি, ড. সুকুমার সেন, ড.শশিভুষণ দাশ গুপ্ত সহ অনেক ভাষা বিজ্ঞানীর অবদান স্মরণযোগ্য।

কারা লিখেছেন ?

আমাদের প্রথম কবিরা ছিলেন গৃহহীন বৌদ্ধ বাউল সাধক। ২২/২৪ জন বৌদ্ধ বাউল এই লিখা গুলো লেখন। সাহিত্যচর্চার জন্য এগুলো রচিত হয়নি, হয়েছিল বৌদ্ধ সহজ সাধনার গভীর ইঙ্গিত এবং সেই অনুযায়ী জীবনের আনন্দ ব্যক্ত করার জন্য। সেসময়ে সাধারন জীবন যাপনের অনেক প্রমাণ পাওয়া যায় এই সকল গানে।

সবেচেয়ে বেশি কবিতা লিখেছেন কাহ্নপাদ ১৩ টি, ভুসুকুপাদ লিখেছেন ৬ টি, সরহপাদ ৪ টি, কুক্কুরিপাদ ৩ টি, লুইপাদ, শবরপাদ, শান্তিপাদ লিখেছেন ২ টি করে। এছাড়া আছেন চাট্টিল্লপাদ, ডোম্বিপাদ, ঢেন্টণপাদ। এর মধ্যে কুক্করিপাদ ছিলেন একমাত্র নারী কবি।

তালপাতায় লেখা চর্যাপদের রঙ্গিন ছবি : সংগৃহীত

কি আছে চর্যাপদে :

৪৬ টি পুরো কবিতা, একটি ছেঁড়া কবিতা মোট সাড়ে ছেচল্লিশটি কবিতা আছে চর্যাপদে। পরে  প্রবোদ চন্দ্র বাগচী চর্যাপদের একটি তিব্বতি অনুবাদ আবিস্কারের পর দেখেন সেখানে পদ সংখ্যা ছিল ৫০ টি। ধারণা করা হয় বাংলা ভাষার বাকি কয়েকটি পদ হারিয়ে গেছে।

চর্যাপদের বিষয় ধর্মভিত্তিক হলেও সেসময়ে সাধারন জীবন, প্রেম, কল্পনা ও শিক্ষার বেশকিছু চিত্র পাওয়া যায়।

ঢেন্ঢণের লেখা ৩৩ তম পদে মানুষের প্রতি ভালোবাসার এক অকৃত্রিম বহি:প্রকাশ দেখা যায়। ‘টালত মোর ঘর নাহি পরবেষী।/হাড়ীত ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।” (টিলার উপর আমার ঘর, কোনও প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতেও ভাত নেই, তবু নিত্য অতিথি আসে।)

আজকের অনেক প্রবাদ প্রবচন এসেছে এই চর্যাপদ থেকেই। যেমন ভুসুকুপাদ লিখেছেন ‘আপনা মাংসেঁ হরিণা বৈরী / হরিণের মাংসই তার জন্য শত্রু‘। সরহপা লিখেছেন ‘বর সুন গোহালী কিমু দুঠ্য বলন্দেঁ/ দুষ্ট গরুর চেয়ে শুন্য গোয়াল ভালো‘।ঢেন্টণপাদের লিখা ‘দুহিল দুধু কী বেল্টে সামায়/ দোহন করা দুধ কি বাটে প্রবেশ করা যায়’? এমন অনেক প্রবাদ এখনও মানুষের মুখে মুখে ঘোরে।

 চর্যাপদ নেপালে গেল কি করে ?

পাল রাজাদের পর এদেশে সেন বংশের রাজারা ক্ষমতায় বসেন। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হলেও সেন রাজারা ছিলেন ব্রাহ্মণ্যবাদের পৃষ্ঠপোষক। এসময় রাজা ও রাষ্ট্র বৌদ্ধ ধর্মের বিরোধী হয়ে উঠেছিল। ফলে অনেক বৌদ্ধ ভিক্ষু এদেশ থেকে চলে গিয়ে নেপালে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ধারণা করা যায় এসময় বাঙলা ভাষায় লিখিত অনেক গ্রন্থ সাথে করে নেপালে নিয়ে গিয়েছিলেন ভিক্ষুরা। চর্যাপদও সেভাবে নেপালে গিয়ে থাকতে পারে।

গর্বের চর্যাপদ :

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরাতন ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে তামিল ভাষা। যার বয়স ধরা হয় ৫ হাজার বছর। তবে এর লিখিত প্রমাণ পাওয়া গেছে ৩০০ খ্রি.পূর্ব মানে ২৩০০ বছর আগে।

এছাড়া সংস্কৃত ভাষার বয়স চার হাজার বছর, গ্রিক ভাষার বয়স সাড়ে তিন হাজার বছর ও হিব্রু তিন হাজার বছরের প্রাচীন ভাষা। সে হিসেবে এক হাজার বছর ধরলেও বাংলা ভাষার বয়স খুব বেশি নয়। 

তবে পৃথিবীতে ছয় হাজারের মত যে ভাষা আছে তাতে হাজার বছরের পুরাতন ভাষার সংখ্যা খুব বেশি নেই। সেই হিসেবে পুরাতন ভাষাগুলোর মধ্যে বাঙলা এখনও টিকে আছে তা নিয়ে গর্ব করাই যায়। আমাদের প্রাণের এই ভাষাকে আরো হাজার হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব এখন আমাদের।

পারভেজ সেলিম

লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী

আরো পড়ুন :

কত বিবিধ রতন তব মধুসূদনের ভান্ডারে !

প্রাচীন বাঙ্গালীরা কি ডাল খাইতো ?

0Shares

২৮ thoughts on “চর্যাপদ: বাঙলায় লিখিত প্রথম বই

  1. I wish to voice my love for your kindness giving support to persons that really need assistance with your area of interest. Your very own commitment to getting the solution throughout appears to be incredibly important and have frequently encouraged women like me to realize their desired goals. Your important report entails much to me and much more to my peers. Many thanks; from everyone of us.

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x