ভারতে ইসলাম কিভাবে এল ?

0Shares

parvez salim alordeshe

পারভেজ সেলিম ।।


পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম এখন ইসলাম। ১৪০০ বছর আগের শুরু হয়ে এখন তা ১৯০ কোটি মানুষের ধর্মে পরিনত হয়েছে। বাংলাদেশে মুসলমানের সংখ্যা ১৪ কোটি। আর মাত্র তিনটি দেশে এর চাইতে বেশি মুসলমান বসবাস করে। ভারতে ১৮ কোটি, পাকিস্তানে ২০ কোটি আর ইন্দোনেশিয়ায় মুসলমানের সংখ্যা ২৩ কোটি। 

১৯৪৭ সালের আগে ভারতবর্ষই ছিল সবচেয়ে বেশি মুসলমানের দেশ। আর এখন ভারতবর্ষ ভেঙ্গে আলাদা দুইটি মুসলিম রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে। এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলমানের বসবাস করে এই উপমহাদেশেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো কিভাবে ইসলাম আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের মন জয় করলো?

ভারতে ইসলাম :

ভারতে ইসলাম  প্রবেশ করেছে মহানবী হয়রত মুহাম্মদ (সা.) জীবিত থাকা অবস্থায়। ইসলাম প্রচারের জন্য সাহাবীরা তখন দুর দুরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। সেই সাহাবীরা ইসলাম প্রচারে এই অঞ্চলে আসেন। মুসলমানদের মক্কা জয়ের পর ইসলাম আরো দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে সারাবিশ্বে।

আরব বনীকদের সাথে দীর্ঘদিনের ব্যবসার সম্পর্ক ছিল ভারতের ব্যবসায়ীদের। উপকুলীয় রাজ্য কেরালা মালাবারের তখন আরব ব্যবসীদের যাতায়ত ছিল। সেখানকার মাপ্পিলা সম্প্রদায়ের  মানুষরাই প্রথম ইসলামের সন্ধান পায়। তারাই প্রথম ভারতে ইসলাম গ্রহণ করেন।

জানা যায় চেরামন পেরুমল নামের এক ব্যক্তি প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সাহাবী মালিক বিন দিনার আরো বিশ সাহাবীকে নিয়ে কেরালায় একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। যার নাম দিয়েছিলেন ‘চেরামন জুম্মা মসজিদ’। এটিই ভারতবর্ষের প্রথম মসজিদ। যা নির্মিত হয়েছিল ৬২৯ সালে, তার পরের বছর মুসলমানেরা মক্কা জয় করেন। 

বাংলাদেশে ইসলাম :

আমাদের বাংলাদেশের লালমনিরহাটে জেলায় ১৯৮৫ সালে একটি পুরাতন মসজিদটির খোঁজ পায় স্থানীয়রা। ইটের গায়ে খোদাই করা তারিখ দেখে ধারণা করা হয় মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল ৬৮৯ সালে।

স্থানীয়দের কাছে এটি নাম ‘হারানো সমজিদ’। আবার কেউ কেউ এর নাম দিয়েছেন ‘সাহাবায়ে কেরাম মসজিদ’।

ধারণা করা হয় মহানবীর মামা আবি ওয়াক্কাস এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। যিনি ছিলেন শেষ নবীর মা আমেনার চাচাতো ভাই। তিনি কিছু সাহাবী নিয়ে ব্রষ্মপুত্র নদ দিয়ে চীনে গিয়েছিল ইসলাম প্রচারের জন্য। তাদের যাতায়তের কোন এক সময় এই মসজিদটি নির্মাণ করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হয়। 

চীনের ‘হুয়াইশেং মসজিদ’ ছিল আবি ওক্কাসের হাতে নির্মিত চীনের প্রথম মসজিদ, যা নির্মিত হয় ৬২৭ সালে। তার ৬২ বছর পর বাংলায় মসজিদ নির্মাণের তথ্য পাওয়া যায়। লালমনিরহাটের মসজিদটি এখন পর্যন্ত আমাদের এই বাংলা অঞ্চলে ইসলামের সবচেয়ে পুরাতন নিদর্শণ ।

ভারতবর্ষ তথা বাংলা অঞ্চলে প্রথমদিকে ইসলাম প্রচার হয়েছিল মুলত সুফি-দরবেশ আর সাহাবীদের দাওয়াতের মাধ্যমে। যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানেরা ভারত জয় শুরু হয় আরো অনেক পরে।  


আরো দেখুন : খলিফা হত্যাকাণ্ড: ইসলামের রক্তাক্ত ইতিহাস

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের ইতিহাস (পুরো পর্ব)


বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার পাওয়া যায় চট্রগ্রামে। ধারণা করা হয় নবম শতকের মাঝামাঝি কোন সময় তিনি চট্রগ্রাম অঞ্চলে এসেছিলেন। পারস্যের এই ইসলামিক ব্যক্তির চট্রগ্রামে আসা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে এই অঞ্চলে তার প্রভাব অনেক গভীরে।

বারো শতকের শেষ দিকে মইনুদ্দিন চিশতি এবং তের শতকের প্রথম দিকে নাজিমউদ্দিন আউলিয়া ভারতে ইসলাম প্রচারে বিশেষ ভুমিকা রাখেন ।

হয়রত শাহজালালের সাথে ৩৬০ জন আউলিয়া বা ধর্মপ্রাণ মুসলমান বাংলায় আসেন ১৩০৩ সালে।সুদুর ইয়েমেন থেকে তারা সিলেটে এসে ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেছিলেন। আউলিয়ারা সবাই ছড়িয়ে পড়েছিলেন সারা দেশে। ১৩৪৫ সালে মরক্কো থেকে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলায় এসেছিলেন শুধু ইসলামের এই বিশাল ব্যক্তিত্বের সাথে দেখা করতে। 

আর শাহ পরান ইসলাম প্রচারের গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা পালন করেন সিলেট অঞ্চলে। তিনিও ছিলেন শাহজালালের সাথে আসা আউলিয়াদের একজন। 

তখনকার বরেন্দ্র ও গৌড় যা এখন রাজশাহী অঞ্চল, সেখানে ইসলাম প্রচারে আসেন শাহ মুখদুম। তের শতকের শেষ দিকে তার হাতে ইসলাম গ্রহণের হিড়িক পড়েছিল বরেন্দ্র অঞ্চলে।  

১৪০১ সালে বাগেরহাটে খান জাহান আলী, উনিশ শতেকে শেষ দিকে রংপরে মাওলানা কেরামত আলী সহ নানা সুফি এবং ধর্মপ্রাণ মানুষ বাংলার গ্রামে গ্রামে গিয়ে ধর্ম প্রচার করতে থাকেন। সাথে নির্মাণ করতে থাকেন মসজিদ।শান্তির ধর্ম হিসেবে বাংলায় খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ইসলাম।

 সামরিক আক্রমণ :

৭১১ সালে মুহাম্মাদ বিন কাশেম ভারতে আসেন ছয় হাজার সৈন্য নিয়ে। তখন তার বয়স মাত্র ১৭ বছর। সিন্ধুর রাজা দাহির তখন তাকে বাধা দেয় কিন্তু খুব সহজে  সিন্ধু ও মুলতান দখল করে নেন তিনি। বিন কাশেমের সিন্ধু বিজয়কে ভারতে হাজার বছরের ইসলামের গোড়াপত্তন হিসেবে ধরা হয়। যদিও তিনি মুল ভারতে দখল করতে পারেননি।

৯৮৬ থেকে ৯৮৭ সালে গজনীর সুলতান সুবক্তিগীন কয়েকবার ভারত আক্রমন করেন । ততদিনে আফগানিস্তানের এই সম্রাজ্য ইসলামের দখলে চলে এসেছে। তিনিও ভারতবর্ষ দখল করতে ব্যর্থ হন।

তার মৃত্যুর পর গজনীর সুলতান হন তার ছেলে মাহমুদ। ক্ষমতা গ্রহণের পর ১০০০ থেকে ১০২৭ সালের মধ্যে সুলতান মাহমুদ ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেন এবং  শুধু পাঞ্জাব জয় করতে সমর্থ হন। ভারতের সোমনাথ মন্দির ধ্বংস ও লুন্ঠনরে অভিযোগ আছে তার  বিরুদ্ধে। তিনি প্রথম সুলতান যিনি আব্বাসীয় খিলাফতের আনুগত্য স্বীকার করে নিজের শাসন চালু রেখেছিলেন। তিনিও পুরো ভারত দখল করতে ব্যর্থ হন।

এরপর ১১৯১ থেকে ১১৯৪ সালের মধ্যে মোহাম্মাদ ঘুরি সফলভাবে ভারত জয় করেন। দিল্লীর সিংহাসনে বসেন। মোহাম্মদ ঘুরির হাত ধরে ভারতে শুরু হয় মুসলিম শাসন। মুহাম্মদ ঘুরিই ভারতের প্রথম মুসলিম শাসক। 

মোহাম্মদ ঘুরি যখন ভারত জয় করেন তখন দিল্লির ক্ষমতায় ছিলেন পৃথ্বিরাজ চৌহান। প্রথম তরাইনের যুদ্ধে তিনি জিতলেও দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধে তিনি পরাজিত ও নিহত হন। ভারতে মুসলমান শাসন শুরু হয়।

১২০৬ সালে ঘুরি দিল্লীর ক্ষমতা তুলে দেন তার দাস ও সেনাপতি কুতুবউদ্দীন আইবেকের হাতে। কুতুবউদ্দীনকে তিনি তার সন্তানের মতো মনে করতেন এবং তাকে নিজ মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে জামাতা বানিয়েছিলেন। এরপর ৬৬৫ ( ১১৯২-১৮৫৭) বছর ভারত শাসন করে মুসলমানেরা।

১২০৪ ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি  হাত ধরে বাংলায় শুরু হয় মুসলিম শাসন। এটি ছিল মুসলমানদের সবচেয়ে উত্তর দিকের দখল করা এলাকা। নেপাল ভুটান, তিব্বত, তামিলনাড়ু সহ আরো উত্তরের অনেক এলাকা জয় করার চেষ্ঠা করেও তা করতে পারেনি মুসলমানেরা।

১৭৫৭ সালে ইংরেজদের কাছে ক্ষমতা হারানোর আগ পর্যন্ত ভারতের ক্ষমতা মুসলমানদের হাতেই ছিল।পলাশী যুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে হারের পর মুসলমানরা ক্ষমতা হারায় প্রথমে বাংলায়, তারপর গোটা ভারতবর্ষে। 

টিপু সুলতান শেষ মুসলমান রাজা যে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শহীদ হন। সময়টা ১৭৯৯ সাল। 

১৯০ বছর পর ব্রিটিশরা চলে যাবার সময় ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে যায় হিন্দু মুসলমান দ্বন্দে। ভারতে সংখ্যাগরিষ্ট হয় হিন্দুরা আর পাকিস্তানের শাসক হয় মুসলমানেরা। 

এরপর ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙ্গে হয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশে মুসলমানে সংখ্যা ৮৮ শতাংশ।   এটিই এখন বিশ্বের চতুর্থ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট মানুষের দেশ। ১৪০০ বছর ধরে এই  বাংলা অঞ্চলের মানুষ ইসলামকে তাদের কাছে সবর্শ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসেবে পালন করে আসছে।

পারভেজ সেলিম
লেখক , সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী

ভিডিও সৌজন্যে : banglabox

0Shares

৫ thoughts on “ভারতে ইসলাম কিভাবে এল ?

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x