হিটলার কেন ইহুদি হত্যা করেছিলেন?


পারভেজ সেলিম

পারভেজ সেলিম।।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ৬০ লক্ষ ইহুদী হত্যা করেছিলেন এডলফ হিটলার। ইতিহাসে এটি ‘হলোকস্ট’ নামে পরিচিত। হিটলার চেয়েছিল পৃথিবী থেকে ইহুদীদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে। তাই তিনি এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছিলেন। ধারণা করা যায় ইহুদীদের প্রতি হিটলারের অতিমাত্রায় ক্ষোভ এবং ঘৃণাই ছিল এই হত্যাকান্ডের মুল কারণ ।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন এমন বিভৎস ক্ষোভ আর নির্মম ঘৃণা জন্ম নিয়েছিল জার্মান এই রাষ্ট্র প্রধানের মনে ?

ইহুদীদের প্রতি  হিটলারের এমন ভয়াবহ ঘৃণার সঠিক কারন বের করা অসম্ভব। হিটলার নিজেও সরাসরি কোন কারণ বলে যান নি। ইতিহাসবিদেরাও সঠিক কোন কারন বের করতে পারেনি। তবে কয়েকটি কারন অনুমান করা হয়, যা হিটলারের মনে ইহুদী বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছিল।

১. আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে না পারা

হিটলারের ছোটবেলার আর্ট স্কুলে ভর্তি হবার খুব ইচ্ছে ছিল। আর্টের হাতও ভালো ছিল হিটলারের। ভিয়েনার স্কুলে কয়েকবার চেষ্ঠা করেও হিটলার ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়। এই স্কুলের প্রধান ছিলেন একজন ইহুদী। স্কুলের বেশিরভাগ ছাত্রই ছিলেন ইহুদী। এই ব্যর্থতা ছোট হিটলারের মনে অনেক প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করেন অনেকেই।  হিটলারের ইহুদী বিদ্বেষ শুরু ছোটবেলা থেকেই।

২. মায়ের মৃত্যু ইহুদী চিকিৎসকের হাতে

বলা হয়ে থাকে হিটলার ভালোবাসতো শুধু তার মাকে আর জার্মানীর জনগনকে। সেই মা মারা যান ১৯০৭ সালে একজন ইহুদী চিকিৎকের হাতে । যার নাম এডওয়ার্ড ব্লোচ। ছোট বেলা থেকে হিটলার তার মায়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী করতেন এই ইহুদী চিকিৎককে।  ইহুদীদের প্রতি ক্ষোভের জন্ম এখান থেকেও শুরু হয়ে থাকতে পারে ।

হিটলার ক্ষমতায় আসার পর এই চিকিৎসক আমেরিকা পালিয়ে গিয়েছিল। অবশ্য অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন চিকিৎসকে হিটলার একজন সৎ ইহুদী হিসেবে মনে করতেন।


আরো পড়ুন : ক্রীতদাস ব্যবসা বাংলা থেকে আমেরিকা

খলিফা উমর হত্যাকান্ড: রাজনৈতিক না ব্যক্তিগত আক্রোশ!


৩. জার্মানরাই শ্রেষ্ঠ মানুষ ।

হিটলার মনে করতের জার্মানরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। জার্মান রক্তই আর্যদের রক্ত। ইহুদীরা সেই রক্তকে কুলষিত করেছে। জার্মানীর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য ইহুদীদের নিশ্চিহ্ন করতে হবে।এটাই ছিল তার ভাবনা । তার রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এই ইহুদী বিদ্বেষ। ইহুদীদের হত্যা করে তিনি জার্মানদের রক্ত পরিশুদ্ধ করতে চেয়েছিল। 

৪. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরাজয়ের কারণ ইহুদীরা

হিটলার সবসময় মনে করতের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ জার্মানরা হেরেছে শুধু ইহুদীদের কারণে। ভার্সাই চুক্তির ফলে যে কোটি কোটি ডলার ক্ষতিপুরণ দিতে হয় জার্মানকে এটা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি হিটলার। তার রাজনীতি শুরু এই চুক্তিকে অমান্য করা দিয়ে। তার মাইন ক্যাম্প বই এমন ধারণা যাওয়া যায়। ১৯১৮ সালের নভেম্বর জার্মান রাজতন্ত্র বিলুপ্তির পিছনেও ইহুদীদের ষড়যন্ত্র ছিল বলেই বিশ্বাস করতেন হিটলার।

১৯২২ সালে যখন হিটলার উদীয়মান রাজনীতিবিদ তখন  সাংবাদিক মেজর জুসেফ হেলকে হিটলার বলেছিলেন, ‘তিনি যদি ক্ষমতায় যান তবে তার প্রথম কাছ হবে ইহুদীদের শেষ করে দেয়া’।

 ধারণা করা যায় তরুণ বয়সের হিটলারের সেই ইহুদী বিদ্বেষ পরিনত বয়সে এসে ভয়াবহ রুপ নিয়েছিল।


আরো পড়ুন : আলেকজান্ডারের অবাক করা ১০টি ঘটনা

আলেকজান্ডার কি সমকামি ছিলেন ?


৫. ইহুদীরা বিশ্ব চক্রান্তকারী

হিটলার মনে করতেন ইহুদীরা চক্রান্তকারী। ইহুদীদের বিশ্বাসঘাতকার কারণে ক্রশবিদ্ধ হয়েছিল যীশু। বিশ্বে আজ যত চক্রান্ত চলে তার মুলে এই ইহুদীরা। ইহুদীদের শেষ করে দিতে না পারলে বিশ্বকে পুরো পুরি দখল করা যাবে না।এমন একটি নিজস্ব কাল্পনিক জগতে বাস করতো হিটলারের মন। 

১৯৩০ সালে জার্মানীতে ক্ষমতায় আসে নাৎসী বাহিনী। এই ক্ষমতায় আসার পিছনে সবচেয়ে বেশি ভুমিকা পালন করেছিল এন্টি সেমিটিজম বা ইহুদি বিদ্বেষের ব্যাপক প্রচারণা।

১৯৩৩ সালে হিটলার জার্মানী রাষ্ট্রপ্রধান হবার পর ইহুদী হত্যা আর লুটতরাজ বাড়তে থাকে। এভাবে অত্যাচার করেই ইহুদীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিল হিটলার। কিন্তু নিজের দেশ থেকে কাউকে এভাবে বের করে দেয়াটা সহজ ছিল না। 

১৯৩৫ সালে নতুন আইন চালু করে হিটলার।দেশে জার্মান আর ইহুদী আলাদা ভাগ করেন। ইহুদীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়, চাকরি থেকে বাদ দেয়া, বন্ধ করে দেয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি। সেসময় ইহুদীদের হাতে একটি বিশেষ ব্যন্ড পরে রাস্তায় চলাচল বাধ্যতামুলক করা হয়েছিল। 

শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করতে শুরু করেন ইহুদীদের।৬০ লক্ষ ইহুদীকে হত্যা করে হিটলার। ৮/১০ লক্ষ ইহুদী কোন রকমে পালিয়ে বেঁচেছিল। 

জার্মান জনগনের মধ্যে ইহুদি বিদ্বেষ ছিল অমানবিক পর্যায়ে। ইহুদীদের প্রতি অমানবিক অত্যাচারের ব্যাপারে শতভাগ সমর্থন ছিল জার্মান জনগনের। তারা মনে করতো সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের চেয়ে অনেক বেশি অত্যাচার করেছে ইহুদীদের। তাই শুধু হিটলারকে একা নয় ইহুদী নিধনের জন্য সমানভাবে দায়ি জার্মান জনগনও।

১৯৪৮ এ ব্রিটেনের মদদে, জাতিসংঘের মধ্য দিয়ে ইহুদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠিত হয়।ফিলিস্তিনিদের কাছে থেকে তাদের ভুখন্ড ছিনিয়ে নিয়ে বানানো হয়েছিল এই রাষ্ট্র। এক অপরাধ থেকে বাঁচতে গিয়ে আরেক অপরাধ করা হয়। সে অন্য ইতিহাস। 

এখন সেই ইহুদীদের একমাত্র রাষ্ট্র ইসরাইলে বাস করে ৯০ লাখ ইহুদি।হিটলারের ইহুদী নিশ্চিন্ন করার সেই মহাপরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়।

পারভেজ সেলিম

লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী


ভিডিও পার্টনার : Banglabox

২০ thoughts on “হিটলার কেন ইহুদি হত্যা করেছিলেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published.