প্রাচীন বঙ্গ থেকে যেভাবে আজকের বাংলাদেশ

parvez salim alordeshe

পারভেজ সেলিম ।।

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভুমি’। আমাদের এই জন্মভূমির নাম ‘বাংলাদেশ’। জন্মের পর এই দেশটির নাম ‘বাংলাদেশ’ জানলেও আমাদের বাবারা জন্মের পর জেনেছিল তাদের দেশের নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’। আর আমাদের দাদা কিংবা দাদার  দাদারা কয়েক প্রজন্ম ধরে জেনেছিল এই প্রিয় দেশটির নাম ‘বাঙলা’ বা ‘বঙ্গ’।

ইংরেজরা এই সোনার বাংলা দখল করে নেয় ১৭৫৭ সালে। তারপর থেকে তারা এই অঞ্চলটির নাম উচ্চারণ করতে থাকে ‘বেঙ্গল’ বলে। তবে ইংরেজদের ‘বেঙ্গল’ শুধু আজকের বাংলাদেশ নয় এটি ছিল আরো বৃহৎ। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম মিলে ছিল ব্রিটিশ ‘বেঙ্গল’। কিন্তু ইংরেজরা আসার আগে আরো কয়েকশ বছর ধরে আমার এই জন্মভুমির নামটি কিভাবে বদল হলো ? 

প্রাচীনকালে এই অঞ্চলের নাম :

প্রাচীনকালের কোন ইতিহাস আমাদের লিখিত আকারে নাই। আমরা কেউ আমাদের নিজেদের ইতিহাস লিখে রাখি নাই। বাংলার প্রাচীন যেটুকু ইতিহাস আমরা পাই তার সবটুকুই ধার করা। যার বেশিরভাগ এসেছে ইউরোপ, চীন এবং পারস্য থেকে।

মধ্যযুগের দুইটি বড় শক্তি ছিল পারস্য ও ইউরোপ। এরা দীর্ঘসময় ধরে আমাদের এই অঞ্চল শাসন করেছে। বলা যায় প্রায় হাজার বছর ধরে। একমাত্র চীন আমাদের শাসন না করলেও নানা কারনে আমাদের কিছু লিখিত ইতিহাস তাদের কাছে পাওয়া যায়।

সেই ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি কয়েকটি আলাদা আলাদা নামে পরিচিত ছিল। তার কয়েকটি মিলে কখনো একটি শক্তিশালী দেশ হয়েছে, আবার সময়ে সময়ে সেটি ভেঙ্গে আলাদাও হয়েছে।

এই অঞ্চলে মানুষ বসবাসের সবচেয়ে প্রাচীন যে তথ্য পাওয়া যায় তা বিশ হাজার বছরের পুরোনো। প্রস্তর যুগের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে বাঙলার এই অঞ্চলে। মানে এ অঞ্চলে মানুষের বসবাস শুরু বিশ হাজার বছর অথবা তার কিছু আগে বা পরে।

মহাভারতেও এই বঙ্গের নাম উল্লেখ আছে। ভীমের বিশ্বজয় আটকে দিয়েছিল দুইজন রাজা, তারা হলেন চিত্রসেন ও সমুদ্রসেন। দুজনে ছিলেন বঙ্গের অতি পরাক্রমশালী নৃপতি।মহাভারতের রচনাকাল তিন হাজার খ্রিষ্টপুর্বাব্দে ধরা হয়, মানে আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে।

এই অঞ্চলের নাম ‘বঙ্গ’ পাওয়া যায় প্রাচীন গ্রন্থ অর্থববেদেও। সেটা ১২০০ খ্রি.পুর্বাব্দে। সেখানে অঙ্গ, বঙ্গ ও মগধ নামের তিন শক্তিশালী রাজ্যের উল্লেখ আছে।গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয় ৫৬৩ খ্রি.পুর্বে, তখন এই অঞ্চল পুরোটাই মগদ রাজ্যের দখলে ছিল। ধারণা কার যায় ‘বঙ্গ’ তখন মগদের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

খ্রিষ্টপুর্ব ৩২৭ সালে যখন আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমন ব্যর্থ হয়, তখন এই অঞ্চলে ‘গঙ্গারিডাই’ নামের এক শক্তিশালী রাজ্যের কথা জানা যায়। গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষার লিখিত ইতিহাস অনুযায়ী এই ‘গঙ্গারিডাই’ আসলে প্রাচীন ‘বঙ্গ’ দেশ বলেই ধারণা করা হয়।


আরো পড়ুন : বাংলার সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (১ম পর্ব)

পঞ্চাশের মনান্তর : বাংলার দুর্ভিক্ষ (২য় পর্ব)


ছয় দেশের সমষ্টি আজকের বাংলাদেশ :

আজকের বাংলাদেশ প্রাচীনকালে মুলত বঙ্গ, গৌড়, হরিকেল, বরেন্দ্র, পুন্ড্র, সমতট এই ছয় ভাগে ছিল। 

আজকের বগুড়া ছিল পুন্ড্র নামে, কুমিল্লা- নোয়াখালি ছিল সমতট নামে, গৌড় ছিল চাপাইনবাবগঞ্জের পূর্ব নাম। এছাড়া সিলেট – চট্রগ্রামের আদি নাম ছিল হরিকেল। ঢাকা, মানিকগঞ্জ, বরিশালের আশেপাশের অঞ্চল পরিচিত ছিল ‘বঙ্গ’ নামে। বরিশাল অঞ্চলটি পরে ‘চন্দ্রদ্বীপ’ নামেও পরিচিতি লাভ করে।

ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খলজি বাংলার উত্তর দিকের একটি অংশ দখল করেন।সময়টা ১২০৪ সাল। এর মধ্য দিয়ে এই বাংলা অঞ্চলে শুরু হয় মুসলমানের শাসন।

বখতিয়ার খলজি যখন বাংলা দখল করে তখন এই অঞ্চলের নাম ছিল ‘বঙ্গ’। বাঙলা নামে তখন একক কোন দেশ ছিল না। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই –সিরাজ তার মুসলমানদের বাংলা বিজয়ের ইতিহাস গ্রন্থে বরেন্দ্র, রাঢ ও বঙ্গ নামের বিভিন্ন এলাকার জয়ের কথা বলেছিলেন। তার মানে মুসলমানেরা যখন এই অঞ্চলে আসে তখন এই অঞ্চলের নাম ‘বাঙলা’ ছিল না।

ইলিয়াস শাহের বাঙ্গালাহ :

রাজনৈতিক পটপক্রিমায় বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান হন ইলিয়াস শাহ। তার সময়কাল ১৩৪১- ১৩৫২। তার সময় থেকে এই অঞ্চলটির নাম ‘বাঙ্গালাহ’। দুইশ বছর স্বাধীন ছিল ইলিয়াস শাহের ‘বাঙ্গালা’। তাকেই প্রথম বলা হত ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালা’ বা ‘শাহ-ই- বাঙ্গালা’ বা ‘বাঙ্গালার সুলতান’।

মোঘলদের আমলে (১৫২৬-১৮৫৭)  এই অঞ্চলের নামটি কিছুটা পরিবর্তন হয়ে ‘সুবা বাঙলা’ নামে পরিচিত হতে থাকে।

পুর্তগীজরা এ দেশে আসে ১৪৯৮ সালে। তার এসে ইলিয়াস শাহের ‘বাঙ্গালাহ’ নামটি গ্রহণ করে। তাদের ভাষায় উচ্চারণ করে ‘বেঙ্গালা’ নামে। পরে পুর্তগীজদের উচ্চারণ ‘বেঙ্গালা’ থেকে ইংরেজরা উচ্চারণ করতে থাকে ‘বেঙ্গল’ বলে।

১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ এই একশত নব্বই বছর এই অঞ্চলের নাম উচ্চারিত হতে থাকে ‘বেঙ্গল’ নামে। পরের ২৩ বছর ‘পূর্ব পাকিস্তান’। ১৯৭১ থেকে স্বাধীন সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’।


আরো পড়ুন : স্বাধীন বাংলাদেশের একমাত্র দুর্ভিক্ষ (শেষ পর্ব)

পঞ্চাশের মনান্তর : বাংলার দুর্ভিক্ষ (২য় পর্ব)


‘বাঙ্গালাহ’ নামটি কোথা থেকে এল :

এই ‘বাঙ্গালাহ’ নামটি কোথা থেকে এসেছে তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছুটা বির্তক আছে। ইতিহাসবিদ আবুল ফজল বলছেন ‘বাঙ্গালাহ’ বা ‘বাঙ্গালা’ নামটি এসেছে আদি ‘বঙ্গ’ শব্দ থেকে। প্রাচীন কালে এ দেশের রাজারা জমি কিংবা নদীতে ছোট বড় আল বা বাধ দিতো। বঙ্গ শব্দের সাথে এই আল যুক্ত হয়ে বঙ্গাল বা বাঙ্গালা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায় তার এই যুক্তিকে সমর্থন করেছেন।

তবে আরেক ইতিহাস পন্ডিত রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন নামটি এসেছে ‘বঙ্গাল’ শব্দ থেকে। তার মতে প্রাচীনকালে এই অঞ্চলে ‘বঙ্গ’ ও ‘বঙ্গাল’ দুটি দেশের নাম পাওয়া যায়। আর তাই এই অঞ্চলের মানুষকে এখনও অনেকে বলে ‘বঙ্গাল’।

শেষের কথা :

তাহলে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় প্রাচীনকালে এই অঞ্চলের কয়েকটি নামের মধ্যে একটি ছিল ‘বঙ্গ’, সেখান থেকে ‘বাঙ্গালা’ বা ‘বাঙ্গালাহ’ নামটি এসেছে। মুসলমানেরা এই অঞ্চলে আসার পর এই নামটির প্রচলণ বেশি হয়। এরপর পর্তুগিজরা ‘বেঙ্গালা’ পরে ইংরেজরা ‘বেঙ্গল’ নামে ডাকতে থাকে এই অঞ্চলকে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে আমাদের এই অংশের নাম হয় ‘পূর্ব বঙ্গ’। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর নামটি পাল্টে যায় ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামে। 

১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম প্রস্তাব রাখেন এই দেশটির নাম হবে ‘বাংলাদেশ’। এরপর  সাধারণ মানুষের কাছে তাদের প্রাণের জন্মভূমির নাম হয়ে ওঠে ‘বাংলাদেশ’। ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় একটি নতুন দেশ। যার নাম ‘বাংলাদেশ’।

পারভেজ সেলিম

লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকর্মী


ভিডিও সৌজন্য : Banglabox

১৯ thoughts on “প্রাচীন বঙ্গ থেকে যেভাবে আজকের বাংলাদেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published.