স্বাধীনতার পঞ্চাশ


সম্পাদকীয়


বাংলাদেশ নামের প্রিয় দেশটির বয়স আজ পঞ্চাশ হলো। বাঙ্গালীর গর্বের সবচেয়ে বড় অধ্যায়টির নাম মুক্তিযুদ্ধ। নানান চড়াই উতরাই পেরিয়ে সোনার দেশটি এখন মধ্যবয়সী। আজ এক বিশেষ ক্ষণ, বিশেষ মাইলফলক। আজ স্বাধীনতার পঞ্চাশ।

খাদ্য উৎপাদনে আমরা স্বনির্ভর হয়েছি ঠিকই কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় আমরা পিছিয়ে পড়েছি বহুগুনে। বস্ত্র উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বকে পথ দেখিয়েছে কিন্তু কর্মীদের নিরাপত্তা আর কর্ম মুল্যের দিকে নজর দেয়া হয়েছে খুব কম। দেশের প্রতিটি মানুষের এখনও মাথা গোঁজার একটি ঘর হয়নি, সে এক করুণ বাস্তবতা আমাদের এই পঞ্চাশ বছরে এসে।

শিক্ষা আমরা ছড়িয়ে দিয়েছে প্রান্তিক পর্যন্ত কিন্তু শিক্ষার মান নেমেছে তলানিতে। স্বাস্থ্যের অনেক অর্জন আমাদের আছে কিন্তু দুর্নীতি নির্ভর এক সিন্ডিকেট থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি পুরো খাতটি। শিল্প সাহিত্যে বাংলায় দেখা দিয়েছে করুণ দশা।

গান, চলচ্চিত্র, সাহিত্য , শিল্পের কোন শাখাতেই আমরা মাথা উঁচু করে চলতে পারছিনা। আমরা বিশাল এক বইমেলা করি প্রতি বছর, অনেক বই প্রকাশ হয় ঠিক তবে সমৃদ্ধ বই এর দেখা মেলা ভার।


আরো পড়ুন : করোনা এক বিষ্ময়ের কাল


খেলাধুলায় উজ্জ্বল হয়েছে ক্রিকেট তেমনি ফুটবল হারাতে বসেছে বাংলাদেশ থেকে। এশিয়ার মধ্যেই সেরা হয়ে উঠতে পারিনি আমরা এখনও, বিশ্ব মঞ্চ এখনও অনেক দূরে। আমাদের বয়স পঞ্চাশ পেরুলো, আর কত অপেক্ষা করতে হবে আমাদের !

দেশের মানুষ রাজনৈতিক সচেতনার কমতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাক স্বাধীনতা কমে গিয়েছে। ভোট প্রদানে উৎসাহ খুঁজে পাচ্ছে না মানুষ। দেশে সুস্থ একটি রাজনৈতিক পরিবেশ নাই মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধির এবং মুক্ত আন্দোলনের। বিরোধীদল, বিরোধীমতকে দমন করা হচ্ছে গায়ের জোরে।

দেশের বিচার ব্যবস্থায় আস্থা হারাতে বসেছে মানুষ।বিচারের দীর্ঘসুত্রিতা, দুর্নীতি আর ক্ষমতার কাছে ন্যায্য বিচার পাওয়া আজ অনেক দুরের বিষয় মনে করছে সাধারন মানুষ।

নারীর ক্ষমতায়ন ঘটছে এদেশে তবে নির্যাতণ কমেনি বরং কিছু ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা পেয়েছে। ধর্মীয় উগ্রবাদিতা লক্ষ করা যাচ্ছে দেশে। দেশে বোরখা পরা নারীর সংখ্যা বেড়েছে বহুগুনে। পোষক বাছাই এখনও এদেশে ব্যক্তির নিজের ইচ্ছাধীন নয়।ধর্ষণ কমেনি কোন অংশে, কমেনি ধর্ষণের কারন হিসেবে পোষাককে দায়ি করার পুরনো মানসিকতা।

দেশের মানুষ বিদ্যুৎ পেয়েছে, রাস্তার উন্নয়ণ হচ্ছে, সড়ক হচ্ছে, পদ্মা সেতু হচ্ছে । ইন্টারনেটের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। সরকারি দপ্তরগুলো ডিজিটালাইজেশনের দিকে যাচ্ছে কিন্তু তার গতি এত ধীর যে তার সুফল পেতে আরো অপেক্ষা করতে হবে অনেকদিন ।

গ্রামগুলো উন্নত হচ্ছে, শহরের সাথে পাল্লা দিয়ে কাজের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে গ্রামগুলো। চাকরির না করে উদ্দ্যোক্তা হবার প্রবণতা বেড়েছে তরুনদের মাঝে। তবে মানুষের নীতি নৈতিকতায় সে উন্নয়ন ধরা দিচ্ছে না।


আরো পড়ুন : মহামারির ঈদ !


ব্যাংক ডাকাতি হলে তার বিচার হয়না এদেশে, হত্যার বিচার ঝুলে থাকে, আইন -বিচার ক্ষমতাবানদের হাতে বন্দি হয়ে আছে এখনও। সামান্য কার্টুন আঁকার অপরাধে জেলে মরতে হয় এখনও এদেশে সাধারন মানুষকে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে এসেও সাধারনরা ভাবতে পারেনা এই দেশে সকলের অধিকার সমান।

বাহ্যিক অবকাঠামো উন্নয়নের সাথে এই দেশের প্রতিটি মানুষের অধিকারের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়া জরুরী। জনগনকে এই রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে বিবেচনা করা জরুরী।

আমাদের অতীত গর্বের। আমরা ভাষার জন্য যুদ্ধ করেছি, নিজের দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। আমার রক্ত দিয়ে অধিকার আদায় করা জাতি। জাতির পিতা বলেছেন ‘আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবেনা’। ইংরেজরা চেয়েছিল পাকিস্তানিরা চেয়েছিল কেউ পারেনাই । তবে স্বাধীনতার পঞ্চাশেও আমরা নিজেরাই নিজেদের দাবিয়ে রাখছি। এবার মুক্তির পালা। এখন আমাদের নিজেদের কাছ থেকে নিজেদের মুক্ত হতে হবে। সেই সুদিনের অপেক্ষা।

সুখে- আনন্দে ভরে উঠুক আমাদের এই বাংলাদেশ। আজ পঞ্চাশে কায়ো মন প্রাণে শুধু এতটুকুই চাওয়া।

.

শিল্পিত পারু

সম্পাদক, আলোর দেশে

আরো সম্পাদকীয় পড়ুন : মহামারির ঈদ

করোনা এক বিষ্ময়ের কাল

One thought on “স্বাধীনতার পঞ্চাশ

Leave a Reply

Your email address will not be published.