ইয়াজিদের শাসনকালে অত্যাচার

0Shares

পারভেজ সেলিম

পারভেজ সেলিম ।।


সাল ৬৮০। ১০ ই অক্টোবর। এই দিন কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ইমাম হোসাইন ও তার ৭২ জন সঙ্গীকে।  এরপর আবারো এক বিশাল গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে মুসলমানেরা। ইসলামে যা ‘দ্বিতীয় ফেতনা’ নামে পরিচিত । কিন্তু এই কারবালার জঘন্যতম হত্যাকান্ডের পর কতদিন টিকে ছিল ইয়াজিদের ক্ষমতা? আর ইসলাম কিভাবে এমন এক অন্ধকার যুগ থেকে মুক্তি লাভ করল ?

কারবালা যুদ্ধের পর :

ইমাম হোসাইন ও তার সঙ্গীদের নির্মমভাবে হত্যার পর তাবু লুট করে  ধরিয়ে দেয়া হয় আগুন। নারী ও শিশুদের বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় কুফার গভর্নর ওবায়েদুল্লাহ বিন জিয়াদের কাছে। সেখানে তাদের করা হয় চরম অপমান আর অত্যাচার।

এরপর  শহরের রাস্তায় শিকল পরিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মানুষদের দেখানো হয় বন্দিদের। তারপর পাঠিয়ে দেয়া হয় দামেস্কে। ২০ দিন পায়ে হেঁটে  হোসাইনের সন্তান আর  প্রিয় মানুষগুলো পৌঁছায় ইয়াজিদের প্রসাদে। সেই দলে পুত্র জয়নাল ছিল একমাত্র পুরুষ বাকিরা নারী ও শিশু। অসুস্থ থাকার কারনে  যুদ্ধে অংশগ্রহন না করায় তিনি নিহত হননি। বন্দি অবস্থায় বোন জয়নবই ছিল সবচেয়ে তেজি এবং প্রতিবাদে সরব। পুরো যাত্রাপথে এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করতে থাকেন তিনি। ইয়াজিদের অন্যায় আচরণের কথা বলে উদ্ধুদ্ধ করতে থাকেন শেষ নবীর নাতনী জয়নব।

বোন জয়নব ছিল সবচেয়ে প্রতিবাদি

প্রিয় নবীর পরিবারের সদস্যদের এমন পরিনতি দেখে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠতে থাকে মুসলমানেরা। সবচেয়ে বড় বিদ্রোহটি দেখা দেয় মদিনায়। এতে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠে ইয়াজিদ।  আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে আক্রমণ চালায়  মদিনায়।


আরো পড়ুন : ইয়াজিদের মৃত্যু যেভাবে হল


মদিনা আক্রমণ :

কারবালা যুদ্ধের দুবছর পর ৬৮২ সালে ১০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল সেনাবাহিনী পাঠায় মদিনার মুসলমানদের দমন করতে। যার নেতৃত্বে ছিল ইয়াজিদের কুখ্যাত সেনাপতি মুসলিম ইবনে উকবা। সৈন্যরা  গিয়েই চরম অবমাননা শুরু করে মসজিদে নববীর। তিনদিন ধরে চলে তাদের তান্ডব লীলা। সেসময় গণধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ করে  ইয়াজিদের বাহিনী। আর ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয় ১২ হাজার মুসলমানকে। যার মধ্যে ছিল ৭০০ কুরআনের হাফেজ। ইসলামে এটি ‘হাররার গণহত্যা’ নামে পরিচিত।

মুসলিম ইতিহাসবিদরা বলছেন এই তিন দিন মদিনায় কোন আজান হয়নি, নামাজ পড়তে দেয়া হয়নি মুসলমানদের আর মসজিদগুলো ভর্তি ছিল ঘোড়া আর সৈন্যদ্বারা। শেষ পর্যন্ত ৬৮৩ সালের ২৬ শে আগস্টে মদিনাবাসী পরাস্ত হয় ইয়াজিদ বাহিনীর কাছে।

এই ঘটনার পর মক্কার মুসলমানেরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। সেখানে তখন মুসলমানদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের। তার নেত্বত্বে  শক্তিশালি প্রতিরোধ গড়ে তোলে মক্কাবাসী।

মক্কায় আগুন :

মদিনা দখল শেষে মক্কার দিকে অভিযান শুরু করে ইয়াজিদের সৈন্যরা। তবে প্রবল প্রতিরোধের কারনে কিছুতেই মক্কা দখল করতে পারেনি তারা। বাধ্য হয়ে চারিদিক দিয়ে মক্কাকে অবরোধ করে রাখে সৈন্যরা ।

শেষ পর্যন্ত দখল করতে না পেরে ৬৮৩ সালে  ৩১ অক্টোবর আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় মক্কায়। ইয়াজিদ বাহিনীর গোলার আঘাতে আগুনের সুত্রপাত বলে ধারণা করা হয়। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জ্বলতে থাকে ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র জায়গাটি। যদিও আগুন লাগার কারন নিয়ে কিছুটা বির্তক আছে ।

তবে সাধারন মুসলমানেরা এমন ঘটনা দেখে ইয়াজিদকে আল্লাহ বিরোধী শাসক বলে মনে করতে থাকেন। কাবা ঘরে  আগুন দেয়াকে তারা কোনভাবে মেনে নিতে পারেন না। এই ঘটনার পর সাধারন মক্কাবাসী ইয়াজিদের বিরুদ্ধে আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠেন ।

মক্কায় আগুন লাগানোর ১১ দিন পর হঠাৎ খবর আসে মারা গেছে ইয়াজিদ। তারিখটা ১২ নভেম্বর ৬৮৩ সাল। এমন খবরে মক্কার পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। আবদুল্লাহ বিন যুবায়ের নিজেকে সীমিত আকারে খলিফা ঘোষণা করেন। শান্ত হয়ে আসে পুরো মুসলিম বিশ্ব। শেষ হয় ইয়াজিদের তিন বছর ৯ মাসের কুশাসন। ইসলাম পার করে এক অন্ধকার যুগ।

ইয়াজিদের মৃত্যুর পর :

ইয়াজিদের মৃত্যুর পর ৬৯২ সাল পর্যন্ত বিদ্রোহ, পাল্টা বিদ্রোহ হতে থাকে ইসলামে প্রধান শহরগুলোতে। এতে বারবার ক্ষমতার পরিবর্তন হয় দামেস্ক, মক্কা আর কুফায়। মক্কার নেতা আব্দুলাহ ইবনে জুবায়েরের মৃত্যুর পর আবারো ক্ষমতা চলে যায় উমাইয়া খেলাফতের কাছে।

ইয়াজিদকে নিয়ে পশ্চিমা ইতিহাসবিদ এবং ইসলামী ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নমত লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমারা বলছেন “ইয়াজিদকে যতটা বলা হয় ততটা খারাপ শাসক ছিল না’। আর ইসলামি ইতিহাসবিদেরা বলছেন “ ইয়াজিদ ছিল এক ভয়ংকর শাসক। পৈত্রিক সুত্রে খেলাফত দখলকারী শাসক সে ।

ইয়াজিদের সবচেয়ে বড় অপরাধ ধরা হয় তিনটি। এক. কারবালার নির্মম হত্যাকান্ড সংঘটিত করা এবং খুনিদের কোন বিচার না করা। দুই.মদিনায় ধ্বংসযোগ্য চালানো। তিন. পবিত্র নগরী মক্কায় আগুন ধরিয়ে দেয়া। শুধু এই তিন বড় অপকর্মের জন্যই ইয়াজিদ ইসলামে আজীবন ঘৃণিত ব্যক্তি হিসেবে  চিহ্নিত থাকবে।


পারভেজ সেলিম

লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী

আরো পড়ুন : কারবালা : বেদনার এক ইতিহাস (পুরো পর্ব)

0Shares

২৬ thoughts on “ইয়াজিদের শাসনকালে অত্যাচার

  1. Консультация и лечение психотерапевта (психолога) Профессиональные психологи Психологи онлайн.
    Консультация психолога онлайн.
    Консультация и лечение психотерапевта
    (психолога) Консультация Психолога –
    Профессиональная поддержка.
    Психологи онлайн. Психологи онлайн.

Leave a Reply

Your email address will not be published.

x