টিকা আবিস্কারের ইতিহাস


পারভেজ সেলিম ।


পৃথিবীর আদিকাল থেকেই মানুষ মৃত্যু বরণ করছে নানান রোগে। অসুখ বা রোগ মানুষের সমান বয়সী। টিকা বা প্রতিষেধক আবিস্কার করে কিছু রোগকে মানুষ যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে তেমনি নতুন কিছু রোগ এসে মানবজাতিকে আবার কাবু করে দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে পৃথিবীতে  ২৫টি মারাত্বক রোগ আছে যাদের ভ্যাকসিনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু মানুষ কখন কিভাবে এই টিকা বা ভ্যাকসিন আবিস্কার করলো ?

টিকা আসলে কোন ওষুধ নয় এটি একটি প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা। টিকা তৈরি করা হয় সেই রোগের জীবাণু থেকেই। এই টিকা শরীরে প্রবেশ করালে রোগের জীবাণুটি শরীরে আর বাসা বাঁধতে পারেনা, তখন মানুষ সেই রোগ থেকে মুক্তি পায়। আর এজন্যই চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো’।

প্রথম টিকা :

থুসিডিডেস

খ্রী. পু ৪২৯ সালে গ্রিক ইতিহাস বিদ থুসিডিডেস প্রথম একটি বিষয় খেয়াল করলেন। তিনি দেখলেন  যার একবার গুটিবসন্ত হচ্ছে তার আর কখনো সেই রোগ হচ্ছে না। তার মানে তার শরীরে এমনকিছু তৈরি হচ্ছে যা আবারো রোগটি  হতে বাধা দিচ্ছে। এটাকে বলে এন্টিবডি। টিকার ধারণা এখান থেকেই শুরু।

টিকা আবিস্কারের প্রথম তথ্য পাওয়া যায় চীনে। যাকে বলা হতো ‘ভ্যারিওলেশন’। সেটি ১০০০ সালের দিকে। এটাকে টিকার আদিরুপও বলা হয়।

আধুনিক টিকা :

এ্যাডওয়ার্ড জেনার নামের একজন বিট্রিশ বিজ্ঞানী প্রথম ধারণা দেন  আধুনিক টিকার। ১৭৯৮ সালে প্রথম স্মলপক্স বা গুটিবসন্তের টিকা আবিস্কার করে তিনি চিকিৎসা ব্যবস্থার মোড় ঘুরিয়ে দিলেন।


গো-বসন্ত থেকে টিকা

 তার টিকা আবিস্কারের কাহিনীটি বেশ মজাদার। গুটিবসন্তের মহামারির সময়  তিনিও লক্ষ করলেন যে গোয়ালারা এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন না। কারণ হিসেবে তিনি দেখলেন গরুর শরীরে যে গোবসন্তের জীবাণু থাকে তা গোয়ালাদের শরীরে প্রবেশ করে। আর গোবসন্তের জীবাণু গুটিবসন্তের জীবাণুকে প্রতিহত করে। ফলে তারা থাকেন রোগমুক্ত। এবার তিনি একটি পরীক্ষা চালালেন।

‘গোবসন্তে’ আক্রান্ত গরু থেকে পুঁজ নিয়ে তিনি আট বছরের এক সুস্থ বালকের শরীরে প্রবেশ করালেন। ফলে ‘জেমস ফিপস’ নামের সেই বালকের শরীরে গোবসন্তের লক্ষণ দেখা দিল। তবে এটি তেমন মারাত্বক কোন রোগ নয়। এরপর ছেলেটির শরীরে তিনি গুটিবসন্তের ভাইরাস ঢুকিয়ে দেন। দেখা গেল জেমস গুটি বসন্তে আক্রান্ত হলেন না। গরুর বসন্তের জীবানু তাকে ভয়ংকর গুটিবসন্ত থেকে রক্ষা করল। এই পরীক্ষার ফলে পৃথিবীতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক নতুন দুয়ার খুলে গেল। তৈরি হল গুটিবসন্তের টিকা বা ভ্যাকসিন। ‘ভ্যাকসিন’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘ভ্যাক্সা’ থেকে যার অর্থ হল গরু।


এডওয়ার্ড জেনার

আর এজন্যই অ্যাডওয়ার্ড জেনার  বলা হয় রোগ প্রতিরোধ বিজ্ঞানের জনক। প্রায় আড়াই হাজার বছরের রোগকে মানুষ নিয়ন্ত্রণ শুরু করে  তার হাত ধরেই। পরবর্তীতে ১৯৫৫-১৯৭৫ সালে এই গুটিবসস্তের টিকার ব্যাপক উন্নতি লাভ করে। ফলে ১৯৮০ সালে বিশ্বকে গুটিবসন্তমুক্ত বলে ঘোষনা করা হয়। এটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এ যাবৎ কালের সবচেয়ে সেরা অর্জন হিসেবে ধরা হয়।

লুই পাস্তুর

লুই পাস্তুরের টিকা :

এরপর লুই পাস্তুর  জলাতংকের টিকা আবিস্কার করেন ১৮৮৫ সালে । এই আবিস্কারের ফলে ব্যাকটেরিয়াকে মানুষ কাবু করতে শুরু করে। লুই পাস্তুরের গবেষণার ধারাবাহিকতায় কলেরা ও পরে প্লেগের টিকা আবিস্কার করেন ওয়েল্ডেমার হফকিন্স।  ইউক্রেন এই তরুন দুই দুইটি মরণঘাতি রোগের টিকা আবিস্কার করে বাঁচিয়ে দিয়েছে মানবজাতিকে। কারন প্লেগ আর কলেরা ছিল মানুষের কাছে এক আতংকের নাম। ১৩ শতকে ২০ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল প্লেগের ব্লাক ডেথ মহামারিতে। ২ হাজার বছরের পুরোনো রোগকে বিদায় জানায় হফকিন্সের টিকা। নিজের শরীরেই টিকা দুটির প্রথম সফল পরীক্ষা চালিয়েছিল হফকিন্স।

ওয়েল্ডেমার হফকিন্স

অ্যাডওয়ার্ড জেনার ও লুই পাস্তুরকে তাই বলা হয় ভ্যাকসিন দুনিয়ার প্রধানতম দুই পুরুষ।

টিকা আবিস্কার করে ব্যাকটেরিয়াকে পুরো বিধস্ত করে দিতে পেরেছে মানুষ। ফলে ব্যাকটেরিয়ার মহামারি আর দেখা যায়না পৃথিবীতে। এরপর মহামারি  শুরু ভাইরাস জনিত রোগের কারনে।


আরো পড়ুন :

জীবাণু অস্ত্রের ইতিহাস

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারি প্লেগ


ভাইরাসের টিকা :

১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর  ইনফুলেঞ্জায় মারা যায় ৫ কোটি মানুষ। কিন্তু দ্রুতই মানুষ এই ভাইরাসকে কাবু করতে পারে। ইর্স্টান উইলিয়াম গুডপাস্তুর ও তার সহকর্মীরা মিলে এই রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি করেন। ১৯৪৫ সালে ইনফুলেঞ্জার টিকার অনুমোদন দেয় আমেরিকা। এটা বলা হয় ভাইরাসের সবচেয়ে কার্যকরি  টিকা।

পোলিও টিকা আবিস্কার হয় ১৯৫০ সালে। আমেরিকান ভাইরাসবিদ জোনাস সাল্ক এটি আবিস্কার করেন। বাংলাদেশকে পোলিও মুক্ত ঘোষনা করা হয় ২০১৪ সালে।

একই বছরে ইবোলা নামের নতুন একটি ভাইরাস দেখা দেয় পৃথিবীতে। ২০১৯ সালে অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানী সারা গিলবার্ট মাত্র ৫ বছরে এর টিকা আবিস্কার করেন। এটিই সবচেয়ে কম সময়ে আবিস্কার করা টিকা।

সারাহ গিলবার্ড

যে টিকা এখনও আবিস্কার হয়নি :

এখনও অনেক ভাইরাসের টিকা আবিস্কার  করতে পারেনি মানুষ। জিকা ভাইরাসের আক্রমন শুরু হয় ১৯৪৭ সালে। ৭৩ বছর হতে চলল মানুষ এখন জিকাকে পরাজিত করতে পারেনি। ১৯৮০ ভয়ংকর এইডস রোগ দেখা দেয়। ৪০ বছর পরও টিকা পাওয়া যায়নি। আর সার্চ ও মার্স  ভাইরাস দেখা দিয়েছে ২০০২ সালে। ১৮ বছর শেষ হয়েছে এখনও অধরাই থেকে গেছে এই দুই ভাইরাসের টিকা।

সবশেষ পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। এখন পর্যন্ত ৪ টি টিকার পরীক্ষা চালানো হয়েছে। তবে সফলতার মুখ দেখেনি কোনটি।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সারাহ গিলবার্ড আবারো এগিয়ে এসেছেন টিকা আবিস্কার জন্য। এবছরের ২৩ এপ্রিল তিনি পরীক্ষা চালিয়েছেন করোনার ভ্যাকসিনের। তিনি খুব আশাবাদিএই টিকার সফলতা নিয়ে। এটাকে বলা হচ্ছে সুপারটিকা।  কারণ অন্য কোন প্রাণীর শরীরে নয় প্রথমেই সরাসরি মানুষের শরীরে প্রয়োগ করা হচ্ছে এই টিকা। যারা এই ট্রাইলে অংশ নিচ্ছেন তাদেরই একজন এলসা গ্রানাটো।

এলসা গ্রানাটো

 আর এরকম আরো ৫০০ জনের উপর পরীক্ষা চালানো হবে। এদের শরীরের এনটিবডি তৈরি হলে দেয়া হবে ভাইরাসের জীবাণু। যদি তারা অসুস্থ না হন তবে ধরে নেয়া হবে টিকা কাজ করছে। ফলাফল ইতিবাচক হলে তবে এটিকে টিকা হিসেবে অনুমোদন দেয়া হবে। তারপর এই টিকা বাজার আসতে সময় লাগবে তিন থেকে চার মাস।

গিলবার্টের সফলতার দিকে তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্বের মানুষ। আমরাও গিলবার্ট এর সাফল্য কমানা করি। তিনি সফল না হলেও হতাশ হবার কিছু নাই  কারন কেউ না কেউ অবশ্যই একদিন করোনার টিকা আবিস্কার করবেন এবং এই ক্ষুদ্র ভয়ংকর ভাইরাসটিকে পরাজিত করবেন। মানব জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় আমাদের শুধু সেই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে এবং নিরাপদে থাকতে হবে।


পারভেজ সেলিম

গণমাধ্যমকর্মী


আরো পড়ুন :

জীবাণু অস্ত্রের ইতিহাস

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারি প্লেগ

মানবজাতির ইতিহাস বদলে দেয়া মহামারি

মরণঘাতি জীবানুর ইতিহাস !

ভিডিও সৌজন্য : Banglabox