দেবী দূর্গা এত জনপ্রিয় কেন ?


পারভেজ সেলিম

পারভেজ সেলিম


 

দূর্গা পুজা বাঙ্গালী হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব । বাংলাদেশ, ভারতের কলকাতা, ঝাড়খন্ড, বিহার, ত্রিপুরা  এবং নেপালের হিন্দুরা সবচেয়ে  আড়ম্ববরের সাথে পালন করে এই পুজাকিন্তু পৃথিবীর সকল হিন্দুরা দেবী দূর্গা পুজা করেনা কেন?  ভারতের মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশে বেশি পুজো হয় গনেশের । মহাধুমধামে  শিবের পুজো হয় ভারতের কিছু রাজ্যে। বর্তমানে রাধা-কৃষ্ণ পুজাও বেড়ে গেছে কিছু হিন্দুদের মাঝে । এখন প্রশ্ন হচ্ছে দেবী দুর্গা পুজা কিভাবে বাঙ্গালী হিন্দুদের মধ্যে দেবী দূর্গা এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল ?

 

হিন্দুদের রয়েছে অসংখ্য দেব দেবী। দেবতার একক শক্তিতে তাদের বিশ্বাস নাইদুর্গা হচ্ছে হিন্দুদের এক বড় দেবতা  শিব বা মহাদেবের স্ত্রী । তার  ৪ সন্তান দুই ছেলে গনেশ ও কার্তিক আর দুই মেয়ে স্বরস্বতি ও লক্ষীস্বামীর বাড়ী স্বর্গ থেকে প্রতি বছর বাবার বাড়ি পৃথিবীতে আসেন তিনিচারদিন  বাবার বাড়ি থেকে আবার স্বামীর বাড়ি মর্ত্যে ফিরে যান প্রতি বছর ভক্তদের কাছে হাতি, নৌকা, পালকি এবং ঘোড়ায় চড়ে অসুরদের বধ করে ফিরে যান স্বর্গে

মন্ডপে মন্ডপে  আমরা যা দেখি তা হল দেবী দুর্গা ও তার চার সন্তান এবং তাদের বাহন এছাড়া দুর্গার পায়ের নিচে অসুরকে বধ করা দৃশ্য

মোটা দাগে এই দশদিনের আনন্দ উৎসব আর পুজোই হচ্ছে বাঙ্গালীর শারোদীয় দুর্গোৎসব অন্য  হিন্দুদের  থেকে বাঙ্গালী হিন্দুদের কাছে দূর্গা জনপ্রিয় হবার কিছু কারন অনুমান করা যায়।

 রামায়নে দূর্গা : 

আজ থেকে ৬০০ বছর আগে সংস্কৃত থেকে রামায়ন বাংলায় অনুবাদ করেন কৃতিবাস ওঝাতখন তিনি চিরায়ত বাংলায় দেবী দুর্গাকে নিয়ে যে লোককথা প্রচলিত ছিল নিয়ে তা ঢুকিয়ে দিলেন বাংলা রামায়নে দেখা যায় রাবনকে বধ করতে দূর্গার সাহায্য চেয়ে পুজো করে নিয়েছিলেন রাম এবং  দেবী দূর্গার সাহায্যেই রাবন বধ করতে সমর্থ হয়েছিলেন রাম

 

রাবন বধের শক্তির সাথে দুর্গার এই মাতৃরুপ বাঙ্গালী হিন্দুদের মনে দারুণ দাগ কাটে কারন তখন বাংলায় পরিবাবের মায়ের  ছড়িয়ে আছে সম্মানে আর শাসনে তবে অন্য সব দেব দেবীকে ছাপিয়ে দুর্গা সাধারন মানুষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হতে আরো কয়েকশ বছর লেগে যায় ।

দূর্গাপুজার পৃষ্ঠপোষকেরা :

দুর্গা পুজোকে সার্বজনীন করে তুলতে বিট্রিশ, এলিট হিন্দু ও জমিদারদের পৃষ্টপোষকতা বা অবদান সবচেয়ে বেশি । এমন জাকজমক করে দুর্গা পুজা প্রথম পালন করতে শুরু করে ব্রিট্রিশ হিন্দু জমিদাররাইতাদের খরচে প‍্যান্ডেল ও মন্ডপ সাজানো হত এবং বলা হত এটা সার্বজনীণ দুগোর্ৎসব  সবাই অংশগ্রহন করতে পারবে ব্রিটিশরাও  তাদের শাসনকে পাকাপোক্ত করার জন্য  ভারতে হিন্দুদের এমন একটি সার্বজনীন উৎসব চাচ্ছিল যাতে সাধরণ নিম্নবিত্তের মানুষ অংশগ্রহন করতে পারে দরিদ্র হিন্দুদের একসময় যেখানে পুজো করারই অধিকার ছিলনা এখন সেটা ঘুচে গেলমন্ডপে মন্ডপে মানুষের ঢল নামতে শুরু করলো

 

আর সময়টা শরৎকালকে বেছে নেয়ার কারণ হলো রাম যখন রাবন বধ করার জন্য দূর্গার পুজো শুরু করে সেটা ছিল এই শরৎ কাল ।  তবে এই সময় পুজো হবার অন্য একটা কারনও ছিল, এসময় বৃষ্টি কম হত আর নবান্নের কারনে আর্থিক অবস্থা ভালো থাকায় মানুষ আনন্দ করতে পারতো চৈত্রমাসেও এই দূর্গা পুজো হয় তাকে বাসন্তী পুজো বলে যদিও বাংলা আশ্বিন মাসের এই শারদীয় দুর্গাপুজাই হিন্দুদের সবচেয়ে জনপ্রিয় উৎসব

প্রথম দুর্গাউৎসব :

প্রাচীনকাল থেকে এদেশে বিভিন্ন দেব দেবীর পুজো করলেও  দূর্গা পুজা প্রচলন শুরু হয় ১৫০০ সালের দিকে । বাংলাদেশের রাজশাহীর তাহেরপুরের জমিদার রাজা কংসনারায়ন প্রথম শারদীয় দূর্গা পুজার প্রচলন করেন বলে ধারনা করা হয়অন্য আরেকটি মতে ভারতে নদীয়ার ভাষানন্দ মজুমদার এই পুজো শুরু করেন বলে জানা যায়

 

১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে জয়ে পর লর্ড ক্লাইভকে খুশি করতে ব্রিটিশদের সহযোগী রাজা নবকৃষ্ণ দেব তার কলকাতার  বাড়িতে দুর্গাপুজার আয়োজন করেছিলসেই পুজোয় লর্ড ক্লাইভও উপস্থিত ছিল বলে জানা যায় ।  এই শোভাবাজার রাজবাড়ির দূর্গাপুজোই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে পুরাতন দূর্গাউৎসব। ২২৯ বছর হতে চলল এই পুজোর বয়স

তবে দূর্গা পুজা জমিদার বা বাবু ঘরনার বাহিরে বেরিয়ে এসে সার্বজনীন হয় ওঠে ১৯১০ সালেসনাতনী ধর্মোতসাহিনি সভার আযোজনে কলকাতার বাগবাজারে প্রধম সাধারন মানুষের জন্য  সার্বজনীন দূর্গোৎসব শুরু হয় আর এখন ধীরে ধীরে হিন্দু ছাড়াও বাঙ্গালী সকল সম্প্রদায়ের কাছে দূর্গা পুজা একটি সার্বজননীন উৎসবে পরিনত হয়েছে



পারভেজ সেলিম
লেখক ও চলচ্চিত্রকার