ছন্দ: সহজ পাঠ


আনিসুল হক


ছন্দ শেখার প্রথাগত পদ্ধতিটা একটু কঠিন। খুব সহজ ভাষায় সহজ কথায় ছন্দ শেখার একটা ফন্দি হলো এই সহজ পাঠ।

কবিতায় ছন্দ থাকতে হয়। ছন্দ মানে মিল নয়। মিল ছাড়াও ছন্দ হয়।

(মিলকে অন্ত্যানুপ্রাস বলে)

যেমন: স্বাধীনতা তুমি রবি ঠাকুরের অজর কবিতা অবিনাশী গান–– এই কবিতায় ছন্দ আছে। কিন্তু মিল নাই।

বাংলা কবিতার ছন্দ প্রধানত তিন প্রকার।

১. অক্ষরবৃত্ত

২. মাত্রাবৃত্ত

৩. স্বরবৃত্ত

ছন্দ জানতে হলে প্রথমে জানতে হবে মাত্রা, পর্ব আর চরণ।

মাত্রা: মাত্রা হলো শব্দের সবচেয়ে ছোট একক।

পর্ব: কয়েকটা মাত্রা নিয়ে একটা পর্ব হয়।

চরণ: কয়েকটা পর্ব মিলে একটা চরণ হয়। চরণের শেষের পর্বটা অপূর্ণ থাকতে পারে।

বাংলা কবিতায় মাত্রা তিন ধরনের ছন্দে তিনভাবে মাপা হয়।

অক্ষরবৃত্ত————————————

অক্ষরবৃত্ত ছন্দে একটা অক্ষর এক মাত্রা।

যুক্তাক্ষরও এক মাত্রা।

যেমন: চন্দন, এটায় আছে অক্ষরবৃত্ত তিন মাত্রা। আবির্ভাব, এটায় আছে চার মাত্রা।

অক্ষরবৃত্তে সাধারণত ৪ মাত্রায় একটা পর্ব ধরা হয়। একটা পঙ্ক্তি বা চরণে সাধারণত ৬ মাত্রা (৪+২), ১০ মাত্রা (৪+৪+২), ১৪ (৪+৪+৪+২), ১৮ (৪+৪+৪+৪+২), ২২ (৪+৪+৪+৪+৪+২), ২৬ টি মাত্রা থাকে।

এর মধ্যে বিখ্যাত হলো পয়ার। এক লাইনে ১৪টি মাত্রা বা ১৮ টি মাত্রা থাকে পয়ারে। আরো বেশি, ২২, ২৬ হলে তাকে মহাপয়ার বলে।

১৪ মাত্রার উদাহরণ:

লাখে লাখে সৈন্য মরে হাজারে হাজার।

শুমার করিয়া দেখে, চল্লিশ হাজার।

৮+৬ এই ভাবেই প্রধানত এটা ভাগ করা যায়।

প্রথম ৮ টা ৩+৩+২ করেও করা যায়। (৫+৩ হয়। বেশি ভালো হয় না।)

পয়ারের উদাহরণ:

মানুষ এমন তয় একবার পাইবার পর,

নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।

পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা,

আহত দারুণ বটে আর্ত সব শিরা উপশিরা।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য

অতি দূর সমুদ্রের পর

হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ….

(বি: দ্র:সংবাদ, এই শব্দে মাত্রা আছে তিনটা। ং কে মাত্রা ধরা হয় না। কিন্তু চরণের শেষ অক্ষর ং হলে আবার মাত্রা ধরা হয়। রং বা সং যদি চরণের শেষে থাকে, তখন এই শব্দ দুটোকে দুই মাত্রা করে ধরা হবে। মাভৈ তিন মাত্রা ধরা হতে পারে)

মাত্রাবৃত্ত।——————————–

চন্দনে মাত্রাবৃত্তে চার মাত্রা গোনা হয়।

প্রতিটা অক্ষর এক মাত্রা। যুক্তাক্ষর দুই মাত্রা। (তবে শব্দের শুরুতে যুক্তাক্ষর থাকলে এক মাত্রাই ধরা হবে। যেমন: স্থান দুই মাত্রা)

১. ৬ মাত্রায় একটা পর্ব ধরে লেখা:

যেমন:

স্বাধীনতা তুমি/ রবি ঠাকুরের/ অজর কবিতা,/ অবিনাশী গান,

স্বাধীনতা তুমি/ কাজী নজরুল/, ঝাকড়া চুলের/ বাবড়ি দোলানো/ মহান পুরুষ।

সৃষ্টিসুখের উল্লাসে/ কাঁপা। (কাঁপাটা অপূর্ণপদী পর্ব)

প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই

কিন্তু শান্তি পাবে না পাবে না পাবে না…

একটি কথার/ দ্বিধা থরথর/ চূড়ে

ভর করেছিল/ সাতটি অমরা/বতী

একটি নিমেষ/ দাঁড়াল সরণী/ জুড়ে

থামিল কালের/ চির চঞ্চল/ গতি

৫ মাত্রের মাত্রাবৃত্ত:

রক্ত দিতে/ চেয়েছিলাম/ বলে

মোহিনী তোর/ এমনি ছল/ যে

সোনার থালে/ চাইলে টুক/টুকে

টুকরো করা/ আমার কলজে

ভোলো না কেন/ ভুলতে পারো/ যদি

চাঁদের সাথে/ হাঁটার রাত/গুলি

নিয়াজ মাঠে/ শিশির লাগা/ ঘাস

পকেটে কার/ ঠাণ্ডা অঙ্গুলি (অং/গুলি)

ঢুকিয়ে তুমি/ বলতে অভ্যাস (অভ/ ভাস)

বকুল ডালে/ হাসত বুল/বুলি

৪ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত

আমাদের ছোট নদী চলে আঁকেবাঁকে

বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে

(বৈশাখ টা না থাকলে এটা পয়ারই হয়ে যেত)

৭ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত: (৩+৪) মাত্রা

জেনেছি কাকে চাই/ কে এলে চোখে ফোটে/ খুশির জ্যোতিকণা

তোমার মুখ আঁকা/ একটি দস্তায়

বিকিয়ে দিতে পারি/ পিতার তরবারি

বাগান জোতজমি/ সহজে সস্তায়

পরীর টাকা পেলে/ কেউ কি পস্তায়

৩. স্বরবৃত্ত:————————————————————–

এটায় ইংরাজির সিলেবলের মতো মাত্রা গোনা হয়। শব্দের যে অংশটি একবারে উচ্চারণ করা হয়, তাকে সিলেবল বলে। এক সিলেব্ল এক মাত্রা। সাধারণত চারমাত্রায় এক পর্ব ধরে স্বরবৃত্ত ছন্দে লেখা হয়। সাধারণত ছড়া লেখা হয়।

চন্দন: স্বরবৃত্তে দুই মাত্রা। চন আর দন।

আব্বা বলেন/ পড়রে সোনা,/ আম্মা বলেন/ মন দে

পাঠে আমার/ মন বসে না/ কাঁঠালচাপার/ গন্ধে

বা

যে টেলিফোন/ আসার কথা/ সেই টেলিফোন আসে না

একান্তে যার/ হাসার কথা

হাসে না

বা

আলো আমার/ আলো ওগো

আলো ভুবন/ ভরা

আলো নয়ন/ধোয়া আমার/ আলো হৃদয়/হরা

আলোর স্রোতে/ পাল তুলেছে/ হাজার প্রজাপতি

( লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত )


আনিসুল হক

লেখক, সাংবাদিক ও কবি


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x