সৌমিত্র চট্রোপাধ্যয়ের অমৃত কথামালা

গাছের মতো বড় হয়ে যেতাম

স্কুলে যাওয়ার পথে রান্নাঘর থেকে দুই ভাই দুটো বিরাট বিরাট কাঁসার গেলাস নিয়ে উঠোন পেরিয়ে বাড়ির পেছনের গোয়ালে গিয়ে দাঁড়াতাম। ওই ভোরেই গরু-দোয়া ফেনা-ওঠা গরম দুধে ভর্তি হয়ে যেত কাঁসার গেলাস, চোঁ-চোঁ করে খেয়ে স্কুলের দিকে এগোতাম। এখন শুনি কাঁচা দুধ খেলে নাকি ইনফেকশন হয়, আমরা তো বছরের পর বছর খেয়েছি, কিস্যু হয়নি। এখনকার বাচ্চাদের যেমন আতুপুতু করে মানুষ করার চেষ্টা হয়, আমাদের ছেলেবেলায় তা হতো না। আমরা গাছপালার মতো বড় হয়ে যেতাম।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১১ জুন ২০১৭

বাঘা যতীনের স্মৃতি

অভিনয়ের ভালোবাসার মতো আরেকটা ভালোবাসার জাগরণও হয়েছিল ওই ছেলেবেলাতে। তা হলো দেশকে ভালোবাসা। আমার দাদু হাওড়া বোমার মামলায় জেল খেটেছিলেন, বাবা জেল খেটেছিলেন আইন অমান্য অসহযোগ আন্দোলনের সময়, এসব গল্প স্মৃতির উষালগ্ন থেকেই শুনে আসছি। দাদু ছিলেন ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, তাঁদের ছিল একান্নবর্তী বিরাট পরিবার। পরিবারের মেয়েদের বিয়ের পরেও বাপের বাড়ি ছেড়ে যেতে হতো না, দাদুর যিনি বড়দিদি তিনিও বাপের বাড়িতেই থাকতেন, তিনি কবিতা লিখতেন সেই যুগে। তাঁর ছেলে জ্যোতিন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন দাদুর সমবয়সী ও বন্ধু, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যিনি ‘বাঘা যতীন’ বলে বিখ্যাত। বর্গীয় ‘জ’ বদলে তাঁর নামের বানান কীভাবে অন্ত্যস্থ ‘য’ হয়েছিল, সেটা এখন মনে নেই। তবে অসামান্য এই মানুষটির অসাধারণ জীবনের নানা কাহিনি কিংবা ঘটনা, মহত্ত্বের নানান নিদর্শন শুনতে শুনতে বড় হয়েছি, আজও সেসব আমার স্মৃতিতে অম্লান।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১১ জুন ২০১৭

ঘিয়ে ভাজা বই

শীতকালে সকালবেলায় পুরোনো বই, যেগুলো নতুন সিলেবাসের সঙ্গে মিলত, সেগুলো এপাড়া-ওপাড়ায় ঘুরে ঘুরে জোগাড় করতে হতো। নতুন ক্লাসে ওঠার পর নতুন বইয়ের সিলেবাস পেতাম বটে, বইগুলো সব নতুন কেনা হতো না। সেকেন্ডহ্যান্ড বই, আগের বছর যারা ওই ক্লাস থেকে পাস করে গিয়েছে, খুঁজেপেতে অর্ধেক দামে কিনতে হতো তাদের কাছ থেকে। শুধু খেয়াল রাখতে হতো, বইগুলো ‘ঘিয়ে ভাজা’ অর্থাৎ অতি ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে গিয়েছে কি না। দাদা বলে ডাকি এমন কোনো আগের ক্লাসের ছেলের বাড়িতে হয়তো গিয়েছি বই খুঁজতে, তাদের বাড়িতে মাটির উঠোন, শিরশিরে ঠান্ডা উঠত ওই মাটি থেকে পায়ে। আজও যখন শীতের দিনে খালি পায়ে শুটিং করতে যাই, দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, এখনো যেন সেই ঠান্ডাটা টের পাই।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১১ জুন ২০১৭

শুধু শারীরিকভাবে বেঁচে থাকা মূল্যহীন

আমি মনে করি জাস্ট রিমেইনিং অ্যালাইভটা কোনো জীবন নয়। ইফ ইউ আর নট বিয়িং কালচারালি অ্যালাইভ। ইফ ইউ আর নট বিয়িং ক্রিয়েটিভলি অ্যালাইভ। ইফ ইউ আর নট বিয়িং ক্রিটিক্যালি অ্যালাইভ। তাহলে তুমি বেঁচে নেই। আমার কাছে সেটা জীবন নয়। তাহলে তুমি জাস্ট শারীরিকভাবে বেঁচে আছ। যেটা আমার কাছে মূল্যহীন।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ৮ জানুয়ারি ২০১৬

চেহারা নিয়ে হীনমন্যতা ছিল

আমার ভেতরে একটা হীনমন্যতা ছিল। আর সেটা ছিল আমার চেহারা নিয়ে। একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতার মুখে এ কথা শুনে হয়তো হাসবেন। তবে এর কারণ ছিল। অল্প বয়সে টাইফয়েড হয়েছিল। খুব রুগ্‌ণ ছিলাম। বাড়ির লোকেরা বলত ছেলেটা কালো, নাক-চোখ-মুখও তেমন নেই। এসব শুনে সংকুচিত হতাম। খেলাধুলো খুব করতাম, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো ছিলাম না। তবে অভিনয় দেখে অনেকেই ভালো বলত। অভিনয়ে তো নিজেকে আড়াল করা যায়। এ জন্যই অভিনয়ে এসেছি।

সূত্র: ভোরের কাগজ, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫

সহ–অভিনেতার দৈন্য

আমি এমন সহ-অভিনেতার কথা জানি, যাঁর সঙ্গে আমি একটি ছবির শুটিং করছিলাম, প্রয়াত বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির প্রায় পাশেই একটি গৃহে। সেই সুযোগে আমি কবিপত্নী মীনাক্ষীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। ফিরে আসার পর আমার অভিনেতা সহকর্মী আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি কোথায় গিয়েছিলে, সকলে খুঁজছিল?’ আমি বললাম, ‘আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়েছিলাম।’ ও প্রশ্ন করেছিল, ‘দেখা হলো?’ আমি আর একবার বললাম, ‘আমি কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়েছিলাম।’ ও তখন বলল, ‘বাড়িতে ছিলেন? দেখা হলো?’ আমি বাধ্য হয়ে বললাম, ‘ওর সঙ্গে দেখা করতে গেলে এখন তো বহুদূর যেতে হবে। ডাক না এলে সেখানে আর যাচ্ছি কী করে?’

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই

ক্যানসার ডিটেক্টেড হওয়াটা একটা ভয়ানক ধাক্কা। আমার বন্ধুরা শক খাওয়ার মতো তখন বলেছিল, কী রে পুলু বলছিস কী! আমার দাদা প্রচণ্ড আপসেট হয়ে গেলেন। এদের আতঙ্কিত হাবভাব দেখে আমি আরও নার্ভাস হয়ে গেলাম। মৃত্যু তো জানিই—একদিন যেতে হবে। কিন্তু ক্যানসার মানে তো প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিয়ে মৃত্যু। মনে মনে ভাবলাম, আমি এর কাছে সাবমিট করব? এই রোগটাকে শিরোধার্য করব? করলে তো হয়েই গেল। তার চেয়ে ফাইট করে দেখি না। আমার আশ্রয় এসব জায়গায় একমাত্র আমিই হতে পারি। ঠিক করলাম, যা থাকে কপালে, আমিই লড়ব।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ৮ জানুয়ারি ২০১৬

রবীন্দ্রনাথ থাকুক জীবনে

শক্তির জন্যই তো আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জলপ্রপাতের ধারে দাঁড়াব বলে’ প্রকাশিত হলো। অনেক দিন ধরেই ও বলছিল ‘পুলুবাবু একটা কবিতার বই বের করো।’ কিন্তু আমার মনে হতো তখনো সময় আসেনি। এই করতে করতে ৪০ বছর বয়সে শক্তি উঠে পড়ে লাগল। এক প্রকাশক ওর কাছে এসে হাজির আমার কবিতাগুলো বই আকারে বের করবে বলে। শক্তি আমায় বলল, ‘দ্যাখ পুলু, প্রকাশক নিজে এসেছে। আমরা চেষ্টাচরিত্র করে জোগাড় করিনি যখন এবার বই বের হওয়া উচিত।’ শক্তি মাঝেমধ্যে আমার কবিতা পড়ে বলত, “এই কবিতাটা একটু রবীন্দ্রনাথের মতো হয়েছে”। সেই শুনে কবিতা আমি বাতিল করে দিতাম। আসলে তখন আমাদের প্রভাবিত করছে জীবনানন্দ দাশ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়েরা। লেখায় রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থাকুক আমরা চাইতাম না। সেটা থাকুক জীবনে।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ মে ২০১৪

প্রথমআলোর সৌজন্যে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *