রসায়নে নোবেল : মেধাস্বত্ব মামলা এখনও চলমান

মোস্তফা কামাল পলাশ।।

২০১২ সালের আবিষ্কার ২০২০ সালের রসায়ন বিজ্ঞানের নোবেল পুরষ্কার সম্ভবত কোন বৈজ্ঞানিকের জীবনে সবচে দ্রুততম সময়ে নোবেল পুরষ্কার অর্জনে ইতিহাস। যে আবিষ্কারের জন্য এবছর নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়েছে তা আবিষ্কৃত হয়েছে মাত্র ২০১২ সালে। আবিষ্কারের মাত্র ৮ বছর পরেই নোবেল পুরষ্কার অর্জন করলো আমেরিকার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ও জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউটের দুই গবেষক।

২০২০ সালের পদার্থ বিজ্ঞানে যে ৩ জন নোবেল পুরষ্কারও অর্জন করেছে তাদের দুইজন এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের। তবে রসায়ন বিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেছেন যে দুইজন বৈজ্ঞানিক তাদের এই অর্জনের সংবাদ অপেক্ষা বেশি আলোচিত হবে এখন পর্যন্ত আমেরিকার আদালতে বিচারাধীন থাকা এই প্রযুক্তির প্যাটেন্ট বা মেধা-সত্ত্ব বিষয়টি যা CRISPR patent battle নামে পরিচিত বৈজ্ঞানিক কমিউনিটিতে। আদালতে বিচারাধীন থাকা এই কেসের এক পক্ষে রয়েছে আমেরিকার বিশ্ববিখ্যাত অন্যপক্ষে রয়েছে MIT ও Harvard এবং অন্যপক্ষে আমেরিকার আর এক বিশ্ববিখ্যাত বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়। বলা হয়ে থাকে আমেরিকার ইতিহাসে মেধা সত্ত্ব নিয়ে যুদ্ধে এত বড় বিশ্ববিদ্যালয় কখনও মুখোমুখি হয় নি। CRISPR এমন এক প্রযুক্তি যা আবিষ্কারের পরের সপ্তাহ থেকে বৈজ্ঞানিক কমিউনিটি অপেক্ষা করিতেছিল কবে আবিষ্কারকদের নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হবে? আবিষ্কারের ৮ বছরের মাথায় সেই অপেক্ষার অবসান হলও। আবিষ্কারকদের নোবেল পুরষ্কার অর্জন নিশ্চিত ভাবেই প্রভাব ফেলবে আদালতে বিচারাধীন CRISPR patent battle এর অবসান ঘটাতে।

যে কারণে আদালতে CRISPR patent দখলের যুদ্ধ। উপরে উল্লেখ করেছি যে CRISPR এমন এক প্রযুক্তি যা আবিষ্কারের পরের সপ্তাহ থেকে বৈজ্ঞানিক কমিউনিটি নিশ্চিত হয়েছিল এর আবিষ্কারকরা নোবেল পুরষ্কার পাবে। সেই সাথে এটা এমন এক প্রযুক্তি যা বাণিজ্যিক ভাবে বিক্রি করে হাজার-হাজার কোটি ডলার (টাকা না) অর্জন করতে পারবে আবিষ্কারক বৈজ্ঞানিকরা।

কেন CRISPR patent যুদ্ধ আদালতে গড়াল?

আমেরিকার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের Jennifer Doudna ও জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউটের Charpentier CRISPR প্রযুক্তি আবিষ্কার নিয়ে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেন ২০১২ সালের জুন মাসে ও সেই গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করেন যে ডাক্তাররা অপারেশনের সময় সাধারণ ছুরি বা কাচি দিয়ে মানব দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যজ্ঙ কেটে খারাপ অংশ বা নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশ কেটে ফেলে দেন (যেমন টিউমার) তেমনি করে এই প্রযুক্তি বয়োলজিকাল ছুরি হিসাবে ব্যবহার করে বায়োলজিক্যাল সিস্টেমের সবচেয়ে মূল অংশ DNA (Deoxyribonucleic acid) পরিবর্তন করতে ব্যবহার করা যাবে। আরও সহজ ভাষায় বলতে বা উদাহরণ দিলে বলা যায়: মানব দেশে কোন-কোন রোগ বংশ পরম্পরায় হয়ে থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন মা-বার ডায়াবেটিস থাকলে সন্তানের ডায়াবেটিস হওয়া সম্ভাবনা খুবই বেশি বা নিশ্চিত। একই ভাবে, হৃদ রোগের ঝুঁকিও পারিবারিক ভাবে সম্পর্ক যুক্ত বলে একাধিক গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেছে। বংশ পরম্পরায় এই রোগগুলোর জন্য মানব দেহের DNA তে অবস্থিত কিছু প্রোটিনকে চিহ্নিত করা হয়েছে একাধিক গবেষণায়। ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত CRISPR প্রযুক্তি ব্যব হার করে DNA তে অবস্থিত ক্ষতিকর প্রোটিন গুলোকে কেটে ফেলে দেওয়া যাবে যেমন করে ডাক্তার মানব দেহ হতে ছুরি/কাচি দিয়ে টিউমার কেরে ফেলে দেন। আশা করি এইবার বুঝতে পারতেছেন কেন CRISPR প্রযুক্তির patent যুদ্ধ আদালতে গড়িয়েছে।

বিশ্ববিখ্যাত গবেষণা জার্নাল সাইন্সে প্রকাশিত একটি আলোচনা থেকে কিছু অংশ কোট করছি:

“Jennifer Doudna, a biochemist at UC Berkeley, and Charpentier, now with the Max Planck Institute for Infection Biology, first published evidence that the bacteria-derived CRISPR system could cut targeted DNA in June 2012, 7 months before the Broad team led by Feng Zhang published its own evidence it could be a genome editor. But the CVC team did not show in its initial paper that CRISPR worked inside eukaryotic cells as Zhang’s team did in its report, even though the original CVC patent application broadly attempted to cover any use of the technology. The U.S. Patent and Trademark Office issued several CRISPR-related patents to Broad beginning in 2014, sparking a legal a battle in 2016 based on CVC claims of patent “interference.””

বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের Jennifer Doudna ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউটের Charpentier যখন CRISPR প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করছিলেন ঠিক একই সময় MIT ও Harvard বিশ্ববিদ্যালয়ের Broad Institute এর তরুণ বৈজ্ঞানিক Feng Zhang ও ঐ প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করিতেছিলেন। ২০১২ সালের জুন মাসে যখন CRISPR প্রযুক্তি নিয়ে প্রথম গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় তা দেখে মাথা খারাপ হবার উপক্রম হয়ে পড়ে Feng Zhang যেহেতু তিনিও একই বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। ৭ মাস পরেই Feng Zhang নিজের গবেষণার রেজাল্ট প্রকাশ করেন ও নিজের গবেষণার পেটেন্টের জন্য দরখাস্ত করেন। বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের Jennifer Doudna ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউটের Charpentier MIT ও Harvard বিশ্ববিদ্যালয়ের Broad Institute এর তরুণ বৈজ্ঞানিক Feng Zhang এর পূর্বেই একই বিষয়ে পেটেন্টের জন্য দরখাস্ত করেছিলেন যা ইতিমধ্যেই Feng Zhang জেনেছিলেন। ফলে নিজের পেটেন্ট দরখাস্তের সময় কিছুটা চালাকির আশ্রয় নেন MIT ও Harvard বিশ্ববিদ্যালয়ের Broad Institute এর তরুণ বৈজ্ঞানিক Feng Zhang।

বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউটের বৈজ্ঞানিক-দ্বয় পেটেন্টের দরখাস্ত করেছিলেন যা সাধারণ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা হবে ও কিছুটা দীর্ঘ সময় লাগবে। পক্ষান্তরে MIT ও Harvard বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক Feng Zhang অতিরিক্ত ৮০ ডলার খরচ করে নিজের পেটেন্ট দরখাস্ত করেছিলেন যা জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করা হবে। সোজা বাংলায় বলা চলে আমেরিকায় থাকা পুত্র-কন্যার কাছে এক মা চিঠি পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে পক্ষান্তরে অন্য একজন মা নিজের পুত্র-কন্যার কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল ফেডেক্স কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে।

Feng Zhang যেহেতু দ্রুত প্রক্রিয়া নিজের পেটেন্ট আবেদন সম্পন্ন করার আবেদন করেছিলেন তাই তার পেটেন্ট আবেদন নিয়ে ২০১৪ সালে সিদ্ধান্ত পেয়ে যান বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউটের বৈজ্ঞানিক-দ্বয় পেটেন্টের দরখাস্তের সিদ্ধান্তের পূর্বেই। উপরে উল্লেখ করেছি যে CRISPR এমন এক প্রযুক্তি যা আবিষ্কারের পরের সপ্তাহ থেকে বৈজ্ঞানিক কমিউনিটি নিশ্চিত হয়েছিল এর আবিষ্কারকরা নোবেল পুরষ্কার পাবে। ফলে পেটেন্টের সিদ্ধান্ত MIT ও Harvard বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক Feng Zhang কে দেওয়ার পরেই বিষয়টি বৈজ্ঞানিক সমাজের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয় ও ২০১৬ সালে আদালতে কেস করেন বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেই থেকে এই কেস চলেছে আমেরিকার নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে। ১ মাস পূর্বেও এই কেস নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় বিশ্ববিখ্যাত গবেষণা জার্নাল সাইন্সে।

আমেরিকার পেটেন্ট আদালতের বিচারক CRISPR প্রযুক্তির আবিষ্কার নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকলেও নোবেল পুরষ্কার মনোনয়ন কমিটি প্রথম আবিষ্কারককে চিনতে কোন দ্বিধা দণ্ডে ভুগে নি। সত্যের জয় অনিবার্য; হয়ত কিছুটা সময় বেশি অপেক্ষা করতে হয়। অভিনন্দন Jennifer Doudna ও Charpentier।

মোস্তফা কামাল পলাশ

লেখকের ফেসবুক হতে

Image courtesy: Nobel Prize

নোবেল বিজয়ী দুই নারী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *