হাথরসে গণধর্ষণ : বিচারহীনতার নির্মম উপাখ্যান

সাইদুজ্জামান আহাদ ।।

মনীষা বাল্মীকি নামের মেয়েটার বয়স ছিল ১৯ বছর। মায়ের সাথে জমিতে কাজ করতে গিয়েছিল। অভাবের সংসার, নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা। দুপুর নাগাদ ক্লান্ত শরীরে মা ফিরে এসেছিল, বিকেলে মনীষারও ঘরে ফেরার কথা। কিন্ত ফেরা হলো না আর। সন্ধ্যে পেরিয়ে যাবার পরও মেয়ের কোন খোঁজ না মেলায় মনীষার মা আর দুই ভাই গেল জমিতে, যেখানে থাকার কথা ছিল তার। মনীষা সেখানে ছিল, তবে ক্ষতবিক্ষত শরীরে। এর আগে ঘন্টাকয়েক যাবত তার ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছে চার পিশাচ। জিভে কামড় দিয়ে ছিঁড়ে নেয়া হয়েছে, শ্বাসরোধের চেষ্টা করেছে, তাতে মেয়েটার মেরুদণ্ডের হাড়ে ফ্র‍্যাকচার হয়েছে। এর আগে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। অজ্ঞান মনীষাকে মৃত ভেবে জমিতেই ফেলে রেখে চলে গেছে চারজন।

জমি নিয়ে ঝামেলা নেই, পারিবারিক শত্রুতার ইতিহাস নেই, প্রেমের সম্পর্ক বা বিরক্ত করা নিয়েও এদের সঙ্গে মনীষার পরিবারের বিরোধ হয়নি কখনও। তবু মনীষার সঙ্গে এই পৈশাচিক ঘটনাটা ঘটেছে। কারন মনীষা জন্মসূত্রে দলিত। এই শব্দটার সঙ্গে যারা পরিচিত নন, তাদের জন্য বলে রাখি- দলিতরা হচ্ছে পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের কুবেরের মতো। উঁচু জাতের মানুষের কাছে এরা অস্পৃশ্য, ব্রাহ্মণদের অনেকে তো দলিতদের মানুষই মনে করে না। দলিতদের পেটালে সেটার বিচার হয় না, দলিত নারীকে ধর্ষণ করলে পুলিশ মামলা নেয় না- দলিতদের তাই ‘গণিমতের মাল’ ভাবার মতো মানুষের অভাব নেই ভারতে।

আয়ুষ্মান খুরানার আর্টিকেল ফিফটিন সিনেমাটা যারা দেখেছেন, দলিতদের অবস্থাটা তারা খানিকটা বুঝতে পারবেন। ড্রেন পরিস্কার, পয়ঃনিষ্কাশন- এরকম কাজগুলোই তারা করে। গ্রামাঞ্চলে দলিতরা কৃষিকাজও করে। আর যারা একটু অবস্থাসম্পন্ন, তারা পড়াশোনা করে আইএস অফিসার হলেও পদে পদে বঞ্চনা আর অপমান তাদের পিছু ছাড়ে না। হোক না ফার্স্টক্লাস অফিসার, জাতে তো তারা দলিত! দলিতেরা যেসব গ্রামে থাকে, সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় আপার কাস্টের লোকজন গাড়িও থামায় না, যেন বাতাসে বিষের রেণু লুকিয়ে আছে এখানে! দলিতদের কথা সবার মনে পড়ে শুধু ভোটের সময়, এমনিতে এরা মানুষের কাতারেই পড়ে না।

সত্যি ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত আর্টিকেল ফিফটিনে পরিচালক অনুভব সিনহা দেখিয়েছিলেন, তিন রুপি পারিশ্রমিক বাড়াতে বলায় কিভাবে দুই দলিত কিশোরীকে আটকে রেখে গণধর্ষণ করা হয়েছিল, তারপর মেরে লাশটাকে গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে উল্টো অনার কিলিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছিল পরিবারের ওপর। তিন রুপিটা এখানে ইস্যু ছিল না, ছিল অধিকার চাওয়াটা। ‘তুই দলিত, নীচু জাত, আমরা যা বলব, যেভাবে বলব সেভাবে সব মেনে চলবি, তোর আবার চাহিদা আসে কোত্থেকে’- এই সুপ্রিম মেন্টালিটিটাই ছিল সেই পৈশাচিক নির্যাতনের কারন। মনীষার সঙ্গেও এমন কিছুই ঘটেছে হয়তো।

সেপ্টেম্বরের ১৪ তারিখে এই নির্মমতার শিকার হয় মনীষা। তাকে ভর্তি করা হয় স্থানীয় এক হাসপাতালে, সেখান থেকে নেয়া হয় আলিগড়ে। মনীষার পরিবার পুলিশে অভিযোগ জানাতে গেলে শুরুতে মামলা নেয়া হয়নি, কয়েকদিন পরে যাও’বা নেয়া হয়েছে, সেখানে হামলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, গণধর্ষণের নয়। এদিকে মেয়েটার অবস্থা ক্রমাগত খারাপের দিকে যেতে থাকলো, আলিগড় থেকে পাঠানো হলো দিল্লিতে। অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সে ভর্তি করানোর কথা থাকলেও, পরে নেয়া হলো সফদার জং হাসপাতালে। গত পরশু সেখানেই মৃত্যু হয় মনীষা বাল্মিকীর। উনিশ বছরের সেই মেয়েটা, জাত-পাতের নোংরা সমীকরণ আর কিছু কাপুরুষের উগ্র লালসা যার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

যদি ভেবে থাকেন যে, মরে গিয়ে বেঁচে গেছে মনীষা, তাহলে সেই ধারনা ভুল। নাটকের শুরু সবে। জীবিত মনীষা নির্যাতিত হয়েছিল পুরুষ নামধারী চার জানোয়ারের হাতে। তার মৃত্যুর পর যখন চারদিকে ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠছে, তখন উত্তর প্রদেশের প্রশাসন দায়িত্ব নিলো, মৃত মনীষার ওপর নির্যাতন আর নিপীড়নের অন্যরকম এক নজির স্থাপনের জন্য।

গত পরশু দিল্লি থেকে লাশ নিয়ে আসা হয় মনীষার বাড়িতে, উত্তরপ্রদেশের হাথরস নামের এলাকায়। অ্যাম্বুলেন্সের সামনে-পেছনে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে নিয়ে আসে মরদেহ, রাত তখন দুইটার সামান্য বেশি। সবাইকে হতভম্ভ করে দিয়ে পুলিশ জানালো, লাশের শেষকৃত্য করতে হবে এখনই। রুখে দাঁড়ালো গ্রামের মানুষ। জবাবে পুলিশ চালালো লাঠি। মনীষার বাবাকে জোর করে গাড়িতে তোলা হলো, অ্যাম্বুলেন্সের সামনে শুয়ে পড়লো মনীষার মা আর ভাই-বোনেরা। মেয়েকে এভাবে শেষ বিদায় দেবেন না তারা, একবার অন্তত শেষ দেখা দেখতে চান, একটা ঘন্টা বাড়িতে মেয়ের লাশ থাকুক।

কিন্ত পুলিশ অনড়। টেনেহিঁচড়ে তোলা হলো মনীষার মা আর ভাইদের, ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা মেরে দেয়া হলো। লাঠিচার্জের মুখে গ্রামের মানুষ আগেই পিছু হঠে গেছে। লাশ নিয়ে শ্মশানের দিকে চললো পুলিশ, কোন পুরোহিত নেই কিচ্ছু নেই, রাতের তিনটায় কাঠ জড়ো করে তার ওপর চিতা সাজিয়ে ডিজেল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হলো। পুলিশের জীপের ভেতরে বসে চোখভর্তি জল নিয়ে মনীষার বাবা দেখলেন, তার মেয়ের শরীরটা পুড়ছে আগুনে। জীবিত অবস্থায় মেয়েটাকে হায়েনাদের কবল থেকে বাঁচাতে পারেননি, মৃত মেয়ের শরীরটাকেও ঠিকমতো বিদায় জানাতে পারলেন না।

ছবি : রাতের আঁধারে ডিজেল ঢেলে মনীষার দেহ পোড়াচ্ছে উত্তর প্রদেশের পুলিশ।

তবে মিডিয়া লেগে ছিল মনীষার ইস্যুটার পেছনে। আর সেকারনেই শত চেষ্টার পরেও ধামাচাপা দেয়া যায়নি ব্যাপারগুলো। তবে আস্ফালন কমেনি। সবকিছু ফাঁস হবার পরেও মিডিয়াকে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না হাথরস নামের সেই গ্রামে, শত শত পুলিশ চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে গ্রামটা। মনীষাদের বাড়ির চারপাশও গিজগিজ করছে পুলিশে, বাড়ির সবার মোবাইল কেড়ে নেয়া হয়েছে, বের হবার চেষ্টা করায় মারধর করা হয়েছে আত্মীয়দের। মনীষার ছোটভাই পালিয়ে এসে মিডিয়াকে বলেছে এসব কথা। গ্রাম থেকে কেউ বের হতে পারছে না, কেউ ঢুকতেও পারছে না। কেন এই কড়াকড়ি- সেই প্রশ্নের জবাবও কেউ দিচ্ছে না।

এদিকে ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট এসে হুমকি দিয়ে গেছে, মিডিয়া দুইদিন পরে চলে যাবে, কিন্ত আমরা থাকব, পুলিশ থাকবে। কাজেই হিসেব করে কথা বলবেন, বুঝেশুনে কাজ করবেন। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ পঁচিশ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেবেন বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন, কিন্ত তার প্রশাসন যে মনীষার পরিবারের সঙ্গে পশুর চাইতেও খারাপ আচরণ করছে, সেই প্রসঙ্গে মুখই খোলেননি। যোগীর রামরাজ্য যে ধর্ষকদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে, সেব্যাপারেও তিনি নির্বিকার। অবশ্য, যার নিজের ক্যাবিনেটই ভর্তি থাকে ধর্ষক এমপি-মন্ত্রী দিয়ে, সে আর কি জবাবই বা দেবে! ধর্মের মূলোতে ব্রেইনওয়াশড হয়ে ভোট দিলে কি হয়, সেটা উত্তরপ্রদেশের জনগন ভালোই বুঝতে পারছে এখন।

মিডিয়াকে গ্রামে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না, বিরোধী নেতাকর্মীদের ঘটনাস্থলে ঘেষতে দেয়া হচ্ছে না, এমনকি আইনজীবীরাও ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন খালি হাতে। মুখে মাস্ক পরে অদৃশ্য নো এন্ট্রি সাইন লাগিয়ে রেখেছে পুলিশ। যাদের বিরুদ্ধে মনীষার অভিযোগ ছিল, সেই চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে। এদিকে আবার পোস্টমর্টেমে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানানো হয়েছে পুলিশের তরফ থেকে। যোগী সরকার এখনও বুঝে উঠতে পারছে না এই কেস নিয়ে কি করবে, কিভাবে স্ক্রিপ্ট সাজাবে। তাই একের পর রক হাস্যকর আর অমানবিক পদক্ষেপ নিচ্ছে তারা। এদিকে বাড়ছে অসন্তোষ, দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রতিবাদে জড়ো হচ্ছে জনতা। নির্ভয়ার জন্য গোটা ভারত যেভাবে জেগে উঠেছিল, সেরকম কিছু হয়তো ঘটবে আবারও।

কিন্ত তাতে অবস্থা বদলাবে না। ধর্ষণ বন্ধ হবে না, দলিতদের ওপর নির্যাতন কমবে না। মনীষার ঘটনা তাজা থাকতে থাকতেই আরও এক দলিত নারীকে একই কায়দার ধর্ষণের পরে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে, সেই উত্তর প্রদেশেই। এটাই হয়তো দলিতদের নিয়তি। মনীষার লাশ জোর করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার সময় এক পুলিশ অফিসার একটা কথা বলেছিল- “ভুল তো আপনাদেরও হয়েছে, সেটাও মেনে নিন। বাড়াবাড়ি করবেন না, আমরা যা বলছি তা শুনুন!” হয়তো কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়াটা অপরাধ। হয়তো দলিত হয়ে জন্মানোটা অপরাধ। হয়তো নীচু জাতের মানুষ হয়ে অন্যায়ের বিচার চাওয়াটাও অপরাধের তালিকাতেই পড়ে। সেরকমটা হলে মনীষার পরিবার অবশ্যই ভুল করেছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই…

সাইদুজ্জামান আহাদ ।।

লেখকের ফেসবুক হতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *