‘হুমায়ুন ফরীদি আমার বড়ভাই ছিলেন’

তার সাথে আমার প্রথম দেখা….

গুলিস্তান সিনেমার সামনে। তিনি ফুটপাথ ধরে সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজের মুখমন্ডল ঢেকে হেঁটে যাচ্ছিলেন।

স্টেডিয়ামে খেলা দেখার আগে খাবার দাবারে পিঠা খেতে যাচ্ছিলাম আমার চাচার সাথে।

খাবার দাবারেই আমি প্রথম হুমায়ুন ফরীদি, আফজাল হোসেন, সুবর্ণা মুস্তাফা, মিতা চৌধুরী, ফরিদুর রেজা সাগর আর শাইখ সিরাজকে দেখেছিলাম।

সাগর ভাই দাঁড়িয়ে থাকতেন কাউন্টারের পেছনে। আর সবার খোঁজ নিতেন কিছুক্ষণ পরপর।

এরপর মাঝে মাঝে তারকাদের আড্ডা দেখতেই পিঠা ও খিচুড়ি খেতে সেখানে যেতাম।

শুভেচ্ছা জোরপূর্বক বন্ধ করিয়ে দেবার পরে আমি পুরোদমে নন ফিকশন অনুষ্ঠান বানাতে শুরু করলাম। ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বিজ্ঞাপনী স্বত্ব কিনে নিল কিছু বিজ্ঞাপনী সংস্থা কনসোর্টিয়াম করে।

আমার প্রিয় ছোটভাই আদিল তখন গ্রে তে কাজ করে। আমি দেখলাম তার মন খারাপ। তার কিছু ক্লায়েন্ট বিশ্বকাপের উচ্চদরের কারনে বিজ্ঞাপন দিতে পারছিল না। আমি তাকে বললাম অন্য বুদ্ধি করা যাক। খেলা শুরুর ঠিক আগে একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান করা যাক। প্রি গেম শো। ক্রিকেট ক্রিকেট নামে। ঐ সময়টা বিটিভি বিক্রি করতে পারে না। কিন্তু তখন অনেক ভিউয়ার থাকে। তারা খেলা দেখার জন্য তখন টিভির সামনে থাকে।

উপস্থাপক কে হবে? আমি বললাম ফরীদি ভাইয়ের নাম। আদিল তখনই ক্লায়েন্টদের পিচ করে দিলো ফোনে। ফরীদি ভাইয়ের নাম শুনেই সবাই রাজি।

আমি ফরীদি  ভাইয়ের বাসায় গেলাম। ধানমন্ডিতে। তিনি আমাকে ভালো করে চেনেন তখন। শুভেচ্ছাতে আমরা একসাথে অটিজমের সচেতনতামূলক গান তৈরী করেছি, মালিক মুরাদ দীপের সহযোগিতায়। আরো অনেকবার কথা বলেছি। আনিস ভাইয়ের আনন্দমেলায় দীলিপকুমারের সাথে দেখা, সুবর্ণা আপার গাড়ী পাওয়া.. সেখানে আমি ছিলাম প্রধান সহকারী ও পরিকল্পক। (সুবর্ণা আপা সত্যিই লটারী জিতেছিলেন। কোন চুরি ছিল না। সেই গল্প আরেকদিন বলবো)

ফরীদি ভাই মিনিটে ১০০০ টাকা পারিশ্রমিক চাইলেন। আমি সাথে সাথে রাজী হয়ে গেলাম। মিনিটে ১০০০ কিন্তু তখন অনেক টাকা। ফরীদি ভাই আমাকে বললেন এখনি অর্ধেক অগ্রীম দিতে হবে। আমি সেটাও রাজী হয়ে গেলাম। আমার সকল সঞ্চয় শেষ। কারণ ফরীদি ভাইয়ের নাম বলা হয়ে গেছে , তিনি না বলে দিলে লজ্জার বিষয় হবে।

আমি সেলসের মনোয়ার ভাইয়ের কাছে গেলাম। গিয়ে পরিকল্পনা বলার সাথে সাথে তিনি রাজী। কারন সেই সময়টাতে এটা হবে বিটিভির বাড়তি আয়। তিনিই সব কাগজপত্র ঠিক করে দিলেন। মহাপরিচালক ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান। তিনিও খুশী। উপমহাপরিচালক মাহবুবুল আলম খানিকটা গররাজী ছিলেন। তিনি একজন দলান্ধ লোক ছিলেন। তিনিও দুজনের কারণে রাজী হলেন।

শপথ করে বলতে পারি , আমার কাছে থেকে এক কাপ অতিরিক্ত চায়ের পয়সাও খরচ করতে হয় নাই বিটিভিতে। দূর্নীতিমুক্ত থাকা কি জিনিষ, সেটা আমি দেখেছি তখন। রফিক ভাইকে অ্যাপেক্সের এক জোড়া জুতো দিয়েছিলাম জোর করে। মামুন ভাইকে জোর করে একটা শার্ট দেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। নেয় নাই। আর মুস্তাফিজুর রহমান আমাকে পুত্রস্নেহ দিয়েছেন। তার সততা কিংবদন্তীতূল্য। তার কথা অন্য দিন লিখতে হবে।

এখন অনুষ্ঠান বানাতে হবে।

ফরীদি ভাই আমাকে বললেন তিনি আমাকে বিদায় করতে চেয়েছিলেন। তাই টাকা , অগ্রীম এসব বলছিলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন আমি এটা পারবো না।

অডিটোরিয়াম ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। আমি আমার অফিসের বাড়ীওয়ালা রাজ্জাক চাচাকে বললাম একমাসের বাড়ীভাড়া বেশী দেবো। আমাকে ছাদে প্যান্ডেল দিয়ে অডিটোরিয়াম বানাতে দিলে। ১৫ দিনের জন্য ছাদ ভাড়া দিলেন। চারুকলা থেকে পাঠ করা প্রবাহ বিজ্ঞাপণী সংস্থার সেট ডিজাইনারকে দিয়ে সেট বানিয়ে দিলেন ফরিদী ভাই। বাকিতে।

আমি অভিনব কায়দায় শীতের মধ্যে তিন কাপড়ের অডিটোরিয়াম বানালাম , সাউন্ড ব্যারিয়ার দিলাম। শ্যুটিং শুরু হলো। অডিটোরিয়াম দেখতে মোসাদ্দেক ভাই এলেন। ইমপ্রেস থেকে। তিনি দেখে অবাক হয়ে বললেন তুষার এইটা কি বানাইসেন। দারুন।

প্রতিদিন খেলার আগে অনুষ্ঠান যায় । প্রতিদিন খেলার শেষে শ্যুটিং হয় রাতে।

ফরীদি ভাই ঠাটারী বাজারের একটা বিশেষ দোকানের শিংগাড়া খাবেন। দু প্যাকেট সিগারেট চাই তার। তিনি গরম খাবার খাবেন। শিংগাড়া গরম হতে হবে। বড় পর্দা না হলে তার টিভি ভালো লাগে না। তিনি ঠান্ডা পানি খাবেন।

আমার হাউজে ফ্রিজ নাই। মাইক্রোওয়েভ ওভেন নাই। টিভি আছে ১৪ ইঞ্চি।

ফরীদি ভাই এই টিভি দেখবেন না। বল দেখা যায় না। শিংগাড়া তাওয়ায় গরম করলে খাবেন না। তাতে একদিকে পোড়া লেগে যায়। ঠান্ডা পানি খাবেন তাই দোকানের ফ্রিজে পানির বোতল রেখে দেই।

সাতদিন সেই অদ্ভুত জায়গায় শ্যুটিং করার পরে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইকে বলে কচিকাঁচার অডিটোরিয়াম পেলাম। ঢাকায় তখন কোন শ্যুটিং ফ্লোরে এসি ছিল না। ফ্লোর বলতে শুধু এফডিসি। দাদাভাইকে একমাসের পুরো ভাড়া দেব বললাম। খেলার কারনে অডিটোরিয়াম কোন অনুষ্ঠান নাই। কেবল শুক্রবার সকালে মেলার কিছু ক্লাস হয়।

এর মধ্যে ফরীদি ভাই এক কান্ড করেছেন। বাসা থেকে মিষ্টি নিতে বলেছিলো। শ্যুটিং এর কারনে আমি মিষ্টি কিনতে পারি নাই বলে ফোনে আমার সংগে দূর্ব্যবহার চলছিলো।

পরদিন আমার বাসায় একটা গাড়ী ভর্তি প্রিমিয়াম সুইটসের মিষ্টি। সাথে একটা ছোট্ট পত্র।

তাতে বলা আছে যে আমি যখন কাজে ব্যস্ত থাকি তখন যেনো আমাকে কোন ধরনের বাহ্যিক অভিযোগ অনুযোগ থেকে মুক্ত রাখা হয়। প্রিমিয়াম সুইটসের যতো ধরনের মিষ্টি আছে সব দুই কেজি করে সেখানে ছিলো।

এর পর ফরীদি ভাই শুরু করলেন, আরো টাকা দাও। আমি অবাক। তিনি টাকা নেবেনই। বলেন এখনই টাকা লাগবে।

আমি বললাম টাকা নিয়ে আপনি গাড়ী ভর্তি মিষ্টি কিনে আমার বাসায় পাঠাবেন । আমি এসবের মধ্যে নাই। সময় মতো পাবেন। তিনি বেঁকে বসলেন। সামিউল ভাই এসে বলেন , তুষার ভাই টাকা ধার নেন। আমাদের ধার নিতে হয় নাই। আমি তাকে আরো ২৫% সম্মানী দিলাম।

একদিন খেলা ছিলো না। তারপর আবার রেকর্ডিং। ফরিদী ভাই আগে থেকে বলে রেখেছেন, শিংগাড়া ছাড়া শ্যুটিং হবে না। শিংগাড়া আসার সাথে সাথে ফরীদি ভাই আসাদ নামে তার গাড়ীচালককে বলেন, যাও আসাদ এটা গরম করো। আর চার বোতল ঠান্ডা পানি আনো।

আমি সামিউল ভাই এর দিকে তাকালাম । তিনি  আগে থেকে পানি এনেছেন। সেটা ফরীদি খাবেন না। বলেন – আমার সামনে ফ্রিজ থেকে পানি বের করতে হবে।

আমি অবাক হয়ে দেখি একটা মাইক্রোওয়েভ ওভেন , একটা ফ্রিজ আর একটা টিভি।

আমি বললাম … বাসা থেকে এনেছেন?

আসাদ বলে, না না… স্টেডিয়াম থেকে আনসি।

শ্যুটিং শেষ হলো। ক্রিকেট ক্রিকেট খুব জনপ্রিয় হয়েছিলো।ফরীদি  ভাইয়ের বন্ধু আমার আরেক ছোটবেলার হীরো বাংলাদেশ দলের  সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান ছিলেন আমাদের রিসোর্স পারসন। তিনি রবি শাস্ত্রী, রুমেশ কালুভিথারানা, ওয়াকার ইউনুসকে অনুষ্ঠানে এনে দিয়েছিলেন। এটাই বাংলাদেশের টেলিভিশনের ইতিহাসে প্রথম ডেইলী স্পোর্টস শো। যেটা গরম গরম খেলার ঠিক আগে অন এয়ার হতো।

কোন বেসরকারী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন একটা শো করে টিভিতে দেয়ার চেষ্টা এর আগে কখনো করে নাই। এটা বাংলাদেশ টেলিভিশনেও প্রথম ছিল। এর জন্য অনেক নিয়ম ‍নতুন করে বিবেচনা করতে হয়েছিলো।

শ্যুটিং শেষ, সবাই খুব আবেগে আক্রান্ত। মিলনমেলা ভেঙ্গে যাচ্ছে। আমি আমাদের অ্যাসিসটেন্ট মিন্টুকে বললাম , ফরীদি ভাইয়ের সাথে একটা মাইক্রোবাস দিতে। সেখানে মাইক্রোওয়েভ, ফ্রিজ আর টিভিটা তুলে দিতে।

ফরীদি ভাই বললেন আরে বোকা এগুলো তো তোমার জন্য। তুমি গরম খাবার খাবে। ঠান্ডা পানি খাবে। বড় টিভিতে বল দেখে দেখে ক্রিকেট খেলা দেখবে।

আমি কিছুতেই রাজী না।

উনি বললেন- আচ্ছা ঠিক আছে। এগুলো আমারই । তোমার কাছে থাকলো। আমি যখন তোমাকে দেখতে আসবো তখন এসব দিয়ে আমার খাতির যত্ন করবে।

এগুলো তোমার অফিসের না। এগুলো তোমার কাছে থাকলো। কখনো ফেরত দেবে না।

এখনো মাইক্রোওয়েভটা আছে। ফ্রিজটা চলে। টিভিটাও। টিভিটা দুবার সারিয়েছি। লোকে অবাক হয়। সমতল টিভির যুগে এত পুরোনো কালার টিউব টিভি নিয়ে আমার আদিখ‍্যেতা দেখে।

খুব যত্নে রাখি। আজও আমি সেটা দিয়ে সকালে খাবার গরম করেছি। আমার মা সেই ফ্রিজে পানি ঠান্ডা করেন। টিভিটা কম দেখা হয়।

২০০৭ এ আবার আমরা একসাথে ক্রিকেট ক্রিকেট করেছিলাম। তখনো আমরা এই জিনিষগুলি ব্যবহার করেছি।

ফরীদি ভাই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার দুঘন্টা ব্যাপি একটা অডিও সাক্ষাতকার আছে আমার কাছে। আমি এটা কোথাও দেই নাই।

ফরীদি ভাই অনেক অনেক দামী কথা অনায়াসে বলতেন।

তিনি আমাকে বলেছিলেন, নিজের শ্যুটিং যেমনই করো, পার্টির শ্যুটিং এ কখনো দেরী করো না। তোমার কারনে যেন অন্যের পয়সা নষ্ট না হয়।

তিনি বলতেন চেষ্টা করবে কিছু না পারলে সেটা পারার চেষ্টা করতে। শিখতে। তারপরে যদি বোঝ যে এটা পারা সম্ভব না, তবে পারো না এটা বলে দিও।

পাওনাদার রাখবে না। নিজে পাওনা থাকা ভালো। অন্যের পাওনা মিটিয়ে দিও। পাওনাদারের মেয়ের বিয়েটা কিংবা মায়ের চিকিৎসা বা বাচ্চার স্কুল যেনো তোমার কারণে আটকে না যায়।

আরো অনেক কথা আছে। ফরীদি ভাইকে নিয়ে আরো লিখবো।

কিন্তু তার সবচেয়ে দামী কথাটা আমার রোজ মনে পড়ে।

”মানুষ শুধু খেতে হয় বলে কাজ করে।

তোমার সাথে যারা কাজ করবে তারা যেন অভূক্ত না থাকে। পয়সা দুটো কম দাও। খাওয়াটা ভালো দিও।”

পানি খাওয়ার সময়, খেলা দেখার সময়, গল্প করার সময়, খাবার গরম করার সময়… কারণে অকারণে ফরীদি ভাইয়ের কথা মনে পড়ে।

তিনি অনেক কথা আমাকে বলেছেন যার কোনটাই কাউকে কখনো বলা যাবে না। শুধু তার আর আমার।

আমাকে একটা কথা বলতেন। ”আমার বন্ধু আফজাল হলো হীরো। আমি খুব সাধারণ অভিনেতা।”

বলতেন, ”পারলে ব্যবসা করতাম। অন্য কিছু করতাম। কিন্তু অভিনয়টাই পারি শুধু , আর কিছু পারি না।”

অনেকটা সময় নিয়ে যেন নিজের গল্পটি লিখে, নিজেকে পুড়িয়ে নিঃশেষ করেছেন আত্মবিধ্বংসী আমার নায়ক, হুমায়ুন ফরীদি।

ফরীদি ভাই সত্যিই নায়ক ছিলেন।

তার মতো করে কেউ চেয়ারে হেলান দেয় না।

তার মতো করে আঙুলের ভাঁজে ধূম্রশলাকা আঁকড়ে ধরে না।

নেশাগ্রস্তের মতো অভিনয়ে মনপ্রাণ সঁপে দিয়ে বলে না, আর তো কিছু পারি না, খালি অভিনয়টাই।

তারমতো করে স্যুট এর নীচে শার্ট ইন না করে ঝুলিয়ে রেখে স্যান্ডেল পরে চলে আসে না।

সকাল বিকাল নেবুলাইজার দিয়ে শ্বাস এর কষ্ট দূর করেই সিগারেট এর প্যাকেট খোলে না।

রাজকীয় ভংগীতে নিজের ইষৎদীর্ঘ চুলে হাত বুলিয়ে বলে না…

তুষার, ভাত খাইসো?

আব্দুন নূর তুষার

চিকিৎসক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

ফেসবুক পাতা হতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *