‘প্রথম যেবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হয় আমার’

ব্যক্তি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রসঙ্গে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এক জায়গায় লিখেছিলেন, “মানুষ সুনীলকে যাঁরা জানেন, তাঁরাই খবর রাখেন, এই মানুষটির হৃদয়বত্তা কত গভীর ছিল। অর্থী প্রার্থীকে সে ফেরায়নি কোনওদিন। বেশ কয়েক বছর আগে ও বেকার ছেলেদের অকাতরে জাহাজভাড়া আর এক হাজার টাকা করে দিয়েছিল আন্দামানে গিয়ে চাকরি বা কাজ করার জন্য। তখন আন্দামানে কাজের লোকের খুব চাহিদা ছিল। গাঁয়ের গরিব মেয়েদের সাহায্যার্থে খুলেছিল ‘পথের পাঁচালী’ নামে একটা সংস্থা, বনগাঁয়ে। কত মানুষকে যে গোপনে সাহায্য করেছে তার ইয়ত্তা নেই। বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও আমি তাই বারবার সুনীলকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতাম।” অন্যদিকে কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কথায়, “সুনীল খুব বড় মাপের লেখক, আবার খুব বড় মনের মানুষও বটে। ওর সমসাময়িক যাঁরা সাহিত্যিক, ও চেয়েছে তাঁদের প্রাপ্যটা যেন তাঁরা পান। ওর মধ্যে কখনও ঈর্ষা, হিংসা দেখিনি। ওর চেয়ে বয়েসে যারা ছোট, তাদের দিকে ও সবসময়ই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু যে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাক, তা নয়, সংসার চালানোরও একটা ব্যবস্থা করে দেওয়া! যাতে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে। এসব ব্যাপারে প্রখর নজর ছিল সুনীলের। এখান থেকেই বলা যায়, সুনীল ভালোবাসাকেই তার ধর্ম বলে মেনে এসেছেন। ও বিশ্বাস করত, ভালোবাসার ওষুধ প্রয়োগ করে মানুষের সব অসুখ সারিয়ে তোলা যায়! ধর্মে বিশ্বাস না করুক, ঈশ্বরে বিশ্বাস না করুক, কিন্তু ভালোবাসায় বিশ্বাসী। আসলে, কবিদের কাছাকাছি পৌঁছতে হলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের একটা মইয়ের প্রয়োজন হয়, নইলে নাগাল পাব না তো! সুনীল ঘোষিত নাস্তিক। নাস্তিক হলেও, মানুষের কল্যাণ কামনা করত সবসময়। যদি আমরা ঈশ্বরকে মঙ্গলময় বলে ভাবি, তবে মানুষও তো সেই ঐশ্বরিক দায়িত্বটা নিতে পারে। সুনীল তো মানুষে বিশ্বাস হারায়নি কখনও, অনেক মানুষের অনেক কুকীর্তি সে প্রত্যক্ষ করেছে, তা সত্ত্বেও মানুষের প্রতি ভালোবাসা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল। সে দুঃখবাদীও নয়, হতাশাবাদীও নয়, সুনীল অত্যন্ত আশাবাদী মানুষ এবং মানুষ সম্পর্কে তার আশা ভরসাকে সে শেষদিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিল।”

নিজের জীবন অভিজ্ঞতা দিয়ে টের পেয়েছি উপরের কথাগুলো মিথ্যে নয়। বরং অনেক বেশি সত্য মনে হয়েছে বারবার। আমার মতো নিতান্ত মানুষের সঙ্গে এমন মহীরূহের সাক্ষাত হয়েছে বেশ কয়েকবার। প্রথমবার দেখা হওয়ার অভিজ্ঞতাটুকু শেয়ার করি :

কৈশোর পেরিয়ে তখন কেবল তারুণ্যে পৌঁছেছি। চোখে-মুখে তখনও মফস্বলীয় আবেগ ও ঘ্রাণ। দিন-রাত পাগলের মতো বই পড়ি। লেখালেখির চেষ্টা করে যাচ্ছি কোনোরকম প্রস্তুতি ছাড়াই। আর সেই সময়েরই কোনো একদিন এক বুক স্বপ্ন ও উচ্ছ্বাস নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় পা রাখি। একদিন পত্রিকায় দেখতে পেলাম, আজ হুমায়ূন আহমেদের একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান। সঙ্গে থাকবেন পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিই, যে করেই হোক অনুষ্ঠানে যাবো। পকেট যদিও গড়ের মাঠ। থাকতাম উত্তরায় পিসতুতো ভাইয়ের মেসবাড়িতে। সেখান থেকে সময়মতো চলে গেলাম সেগুনবাগিচার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। ঢাকার এক মাথা থেকে অন্য মাথা।

অনুষ্ঠানে গিয়ে তো চক্ষু চড়কগাছ! টিভিতে দেখা বা পত্রিকায় ছবি ছাপা খ্যাতিমান সব মানুষের ভিড়। সামনা-সামনি তাদের দেখে আমি তো আহ্লাদে আটখানা। মন যেন আনন্দে পিংপং বলের মতো লাফাচ্ছে। অনুষ্ঠান শেষে কোনো কিছু না ভেবে হাতেধরা ডায়েরিটি নিয়ে প্রথমে  হুমায়ূন আহমেদের কাছে গেলাম। অটোগ্রাফ চাইলাম। মনে আছে, সেসময় তিনি একা এক কোণে দাঁড়িয়ে বেনসন সিগারেট খাচ্ছিলেন। লুকিয়ে খাচ্ছিলেন, কারণ সেই অনুষ্ঠানে হুমায়ূনের মা আয়েশা ফয়েজও উপস্থিত ছিলেন। যাই হোক, অটোগ্রাফ চাচ্ছি হুমায়ূন আহমেদের কাছে। প্রথম প্রথম তিনি আমাকে কোনো পাত্তাই দিলেন না। মাছি তাড়ানোর মতো ভাব করলেন। শেষে আমার নাছড়বান্দা অনুনয় দেখে একপর্যায়ে তিনি আমাকে বইমেলায় যেতে বলেন। বলে রাখা ভালো, তখন একুশে বইমেলা চলছি। বিষয়টা নজরে আসে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের। একসময় আহত এই তরুণের কাঁধে হাত রেখে সুনীল দা টুকটাক কথা বলেন, অটোগ্রাফ দেন। তার মোটাসোটা ভারী হাতের স্পর্শে রোমাঞ্চ লাগে। মনে পড়ে যায় ময়মনসিংহের সেই দুর্গাবাড়ি লাইব্রেরিটির কথা। ভাসতে থাকে, সেই সময়, পূর্ব-পশ্চিম, প্রথম আলো, নীললোহিত, জ্যোৎস্নাকুমারী, কাকাবাবু নামগুলো এক এক করে।

এরপর পুরোটা সময় সুনীল দা’র সঙ্গেই কেটে যায়। মিডিয়া ভিড় করে সুনীল দা’র ইন্টারভিউ নিতে। ক্যামেরাম্যানরা আমাকে সরে দাঁড়াতে বলেন। আমি সরে দাঁড়াতে চাই। কিন্তু সুনীল দা’র এককথা, তুমি কোত্থাও যাবে না। এখানেই দাঁড়াও। আমার কাঁধেই হাত রেখে কথা বলেন ক্যামেরায়। মিডিয়াকর্মীদের বিরক্তির স্পষ্ট ভাঁজ দেখছিলাম আমাকে ঘিরে। সুনীল দা সেসবের কিছুই পাত্তা দিলেন না। তিনি যেন আমার মন পড়ে যাচ্ছিলেন একই সঙ্গে।

সন্ধ্যা হয়ে আসে। হোটেলে ফেরার তাড়া পড়ে সুনীল দা’র। বড় রাস্তায় দাঁড়ানো গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিই দাদাকে। পাশে স্বাতী দি বসা। গাড়ি স্টার্ট দেয়। হঠাৎ গাড়িটিকে থামতে বলেন সুনীল দা। কাঁচ নামিয়ে আমাকে ইশারায় ডাকেন। হাত মিলিয়ে বলেন, “কী যেন নাম বললে তোমার?” আমি নাম বলতে, দাদা মুচকি হেসে বললেন, “ভালো থেকো।”

কথাগুলো অদ্ভুতভাবে খেলে যায় মনের ভেতর। কিছুক্ষণ আগে একজনের অটোগ্রাফ না-পাওয়ার অপমান, গ্লানিগুলো ধুয়ে মুছে যায় কখন— টেরই পাইনি। ঢাকা শহরের সেই সন্ধ্যাটাকে বড়ো আপন আপন মনে হয়। মন তখন ফানুশের মতো উড়তে থাকে। উড়তে উড়তেই আবার ঢাকার অন্য মাথায় ফিরি।

আজ প্রিয় সুনীল দা’র জন্মদিন। আজকাল এমন মানুষের বড়ো অভাব অনুভব করি। বড়ো অভাব! সুনীল দা’র মতো মানুষেরা জন্ম নেয় না; জন্ম হয়।

অঞ্জন আচার্য্য

লেখকের ফেসবুক হতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *