‘সূর্যসেন আমার ছোটবেলার নায়ক’

বৃটিশ রাজত্বে নাকি কখনো বৃটিশ পতাকা নামে না, সূর্যাস্ত হয় না বলে বৃটিশরা গর্ব করতো। টানা চারদিন চট্টগ্রামে বৃটিশ পতাকা ছিলো না, সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় হয়েছে স্বাধীন পতাকায়। ব্যান্ড বিগলে গড সেভ দ্যা কিং বা কুইন  বাজে নাই।

এজন্যই না দেখা না জানা এক মানুষ মাস্টারদা সূর্যসেন আমার ছোটবেলার আরেক নায়ক। দেখতে তিনি প্রথাগত অর্থে সুদর্শন নন কিন্তু তার ছবিতে বোঝা যায় তিনি এক সুঠাম শরীরের কৃষ্ণকায়  মানুষ ছিলেন। সূর্যসেন ১৯১৭ সালে গ্র্যাজুয়েশনের পরে যে স্কুল থেকে প্রবেশিকা পাস করেছিলেন সেখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। আচার্য হরিশচন্দ্রের ন্যাশনাল স্কুল। সেই স্কুল অসহযোগের সময় বন্ধ হয়ে গেলে তিনি দেওয়ান বাজার উমাতারা উচ্চ বিদ্যালয়ে অংক/গণিত পড়াতেন। নিয়মিত শরীর চর্চা করতেন। বিশ্বাস করতেন বৃটিশদের কাছ থেকে ক্ষমতা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমেই কেড়ে নিয়ে ভারতবর্ষ স্বাধীন করতে হবে। চট্টগ্রামের মাটি থেকে বিপ্লব শুরু করার এক অসম্ভব পরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা ছিল তার।

অস্ত্র চালানো শিখেছিলেন। প্রথমে ৩৫ জন বিপ্লবীকে নিয়ে আইরিশদের মুক্তি আন্দোলনের অনুসরণে গড়েছিলেন বিপ্লবী বাহিনী।

সূর্যসেন এর সংগ্রাম ছিল এক প্রবল অত্যাচারী বৃটিশরাজ শাসিত ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যার প্রধান শক্তি ছিল এই দেশেরই বিশ্বাসঘাতক আত্মবিস্মৃত মানুষ যারা সরকারী চাকুরী করে তাদের মাথা ও বিবেক বন্ধক রেখেছিলেন তথাকথিত বৃটিশ রাজের পায়ের নীচে।

বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন সংসারের চাপে কিন্তু স্ত্রীসংগ না করার পণ করেছিলেন। পরে তার স্ত্রী বিয়োগ ঘটে। তিনি মনে করতেন বিপ্লবীদের পিছুটান থাকা ঠিক না। স্ত্রী ও সন্তান তার স্বাধীনতা অর্জনের কাজে বিঘ্ন ঘটাবে।

তিনি সাম্য ও সুবিচারে বিশ্বাস করতেন। সে আমলে তার দলে নারী বিপ্লবী ছিলেন। গান শুনতে পছন্দ করতেন। কবিতা ভালোবাসতেন।

শেষ পর্যন্ত চারদিনের জন্য চট্টগ্রামকে স্বাধীন করে রেখেছিলেন অস্ত্রাগার লুন্ঠনের মধ্য দিয়ে। টেলিগ্রাফের লাইন কেটে দিয়েছিলেন। রেল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কাজটিও হয়েছিল। কিন্তু তারপর বাকি কাজগুলো সঠিক ভাবে সফলতা না পাওয়ায় ও কিছু ভুলের কারনে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। লুইস মেশিনগান চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল না তার দলের। ৬৫ থেকে ১০০ জনের যে দলটি নিয়ে তিনি চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার দখল করেন সেটি ধ্বংস করার সময় বিপ্লবী হিমাংশু নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে ফেলেন। আর তাকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা দেন তার দলের দুজন প্রধান ব্যক্তি অনন্ত সিংহ ও গণেশ ঘোষ। তাদের অবর্তমানে পাহাড়ে আশ্রয় নেয়া তার বিপ্লবী দল ভুল বোঝাবুঝির কারনে শহরে আক্রমন না করে বরং ইংরেজদের আক্রমনের অপেক্ষায় থাকে। আর ডাবলমুরিং জেটিতে থাকা একটা লুইস মেশিনগানের আক্রমনে তার বাহিনী পরাস্ত হয়ে যায়। মাস্কেট রাইফেলে একটা একটা গুলি/বারুদ ভরে গুলি করতে হতো। রেঞ্জও ছিল কম।

তারা ভুল ভেবে পজিশন ধরে না রেখে পিছিয়ে যায়।

মূলত: তারা আক্রমনকারী হয়েও আক্রমনকারীর মতো আচরণ না করে ডিফেন্সিভ হয়ে যাওয়ায় ও কমান্ডের ভুলের কারনে খেসারত দেন বৃটিশদের প্রশিক্ষিত সেনাদলের কাছে হেরে গিয়ে।

তার দল শহরে আক্রমন করলেই বৃটিশরা পালাতো। কিন্তু সময়মতো গণেশ ও অনন্ত ফিরে না আসায় শহরে নিয়ন্ত্রন নেই ভেবে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা না থাকা বিপ্লবীরা পিছু হটে যায়। সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ পাওয়া কেউ এই পরিকল্পনায় থাকলে এত সহজে চট্টগ্রাম হাতছাড়া হতো না।

তবে বৃটিশদের শাসণে সিপাহী বিদ্রোহের পরে আর কোথাও এভাবে টানা কয়েকদিন বৃটিশ শাসণবিহীন স্বাধীন এলাকা থাকার নজির নাই।

এই পরাজয়ের পরে আত্মগোপণ করেন মাস্টারদা সূর্যসেন।

এরপরে প্রীতিলতাকে দিয়ে আক্রমন করিয়েছিলেন ইউরোপিয়ান ক্লাব। সেখানেও দিন ক্ষন হিসাবে ভুলের কারনে প্রথমবার আক্রমন স্থগিত হয় ১৯৩২ এর এপ্রিলে। পরে প্রীতিলতার নেতৃত্বে আক্রমন হয় সেপ্টেম্বরে। আক্রমনের সময় প্রীতিলতার গায়ে গুলি লাগে। পোস্ট মর্টেমে বলা হয়েছিল গুলির আঘাত তেমন গুরুতর ছিল না। তারপরেও প্রীতিলতা সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

সূর্যসেন বলতেন মৃত্যু আসবেই। মৃত্যুকে বরণ করে নেয়াই বিপ্লবীর ধর্ম। তিনি ধরা পড়ে যান তারই দলের সদস্য ব্রজেন সেনের ছোটভাইয়ের লোভের কাছে। ব্রজেন সেনের বাড়ীতে বৈঠকরত অবস্থায় তাকে ধরিয়ে দেন ব্রজেন সেনের ছোটভাই বৃটিশদের ১০০০০ টাকা পুরস্কারের লোভে।

িচারে তার ফাঁসির রায় হবে এটা তিনি জানতেন। তার সশস্ত্র আক্রমনের পরিকল্পনায় নানা দুর্বলতা ছিলো। বিপ্লবের তীব্র আকাংখায় ও সাহসে তিনি সকল কিছুকে তুচ্ছ করে হেরে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা জেনেও মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন মৃত্যুকে বেছে নিতে।

তিনি যখন কারাগারে মৃত্যুর দিন গুনছেন তখনো গান শুনতে চাইতেন। তাকে যদি তোর ডাকশুনে কেউ না আসে . গেয়ে শুনিয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় বিপ্লবী বিনোদ বিহারী। যার সাথে চট্টগ্রামে বহু অনুষ্ঠানে একসাথে আমি থাকার সৌভাগ্য পেয়েছিলাম।

সূর্যসেন তার শেষ চিঠিতে বিপ্লব ও স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন যেন তার সংগ্রামের কথা বিপ্লবীরা ভুলে না যায়।

তিনি বলেছিলেন

“১৮ এপ্রিল ১৯৩০ তারিখটি কখনই ভুলে যেও না চট্টগ্রামে পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহের দিনটি … ভারতের স্বাধীনতার জন্য যেসব দেশপ্রেমিক জীবন দিয়েছেন তাদের নামগুলো তোমার হৃদয়ের অন্তঃস্থলে লিখে রেখ।’’

আমরা কি সেসব মনে রেখেছি।

তাকে ফাঁসী দেবার আগে নির্যাতন করা হয়। তার চোয়াল ভেংগে ফেলা হয়, দাঁত ফেলে দেয়া হয়, মুখমন্ডল বিকৃত করে ফেলা হয়। তার মৃত্যুর পরে মৃতদেহ সৎকারের জন্য না দিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়া হয়। তার সাথে ফেলে দেয়া হয় আরেক বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারের মরদেহকেও।

এজন্য বৃটিশদের ক্ষমা চাইতে বলা উচিত আমাদের।

মরদেহ সাগরে ফেলে দেয়ার কারণ ছিল তাকে জনগণের সম্মান দিতে দেয়ার সুযোগ না দেয়া ও পরে তার দাহস্থান যাতে তীর্থে পরিণত না হয় সেটা নিশ্চিত করা।

মরদেহ সাগরে নিক্ষেপ তাই নতুন কোন বিষয় না পশ্চিমা শাসকদের জন্য।

সূর্যসেনকে আমার নায়ক মনে হয় অনেক কারণে।

১. দুর্বল স্বাস্থ্যের বাঙালী জাতিকে সুঠাম শক্তিশালী হয়ে যোদ্ধা হবার স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন।

২. তিনিই আসলে বৃটিশ শাসনামলে এই অঞ্চলে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি এনেছিলেন, হোক সে চারদিনের জন্য।

৩. তিনি পরাজয় হবে জেনেও লড়াই করেছেন এই আশায় যে সেই সংগ্রাম একদিন আরো বড় হবে। বিপ্লবীরা কেবল জয়ের জন্য সংগ্রাম করে না। অনেকে মৃত্যুর জন্যও সংগ্রাম করে কারণ মৃত্যু দিয়ে তারা বড় সংগ্রামকে বেগবাণ করে।

৪. স্বপ্ন মানুষকে অসম্ভবের দিকে তাড়িত করে। সাধ্যের অতীত বিষয়ও কোন বাঁধা হয় না। এটা তিনি দেখিয়েছেন।

তাঁকে নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। ইউরোপিয়ান ক্লাব এর ঘরটি এখনো আছে। সেখানে সূর্যসেন ও প্রীতিলতার স্মৃতি রক্ষার্থে বড় কোন আয়োজন নাই। নাই চট্টগ্রাম শহরে তার কোন ভাষ্কর্য।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুৃদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন ও ২৬ মার্চে স্বাধীনতার যে সূর্য আমাদের ভূমিতে আলো দিয়েছে সে সূর্যের লালে সকল বাঙালীর রক্তের সাথে সাথে ক্ষুদিরাম , সূর্যসেনের মতো বিপ্লবীদের রক্তও মিশে আছে।

আমাদের চোখের সামনে এরকম বীর থাকার পরেও কেন আমরা বীরবন্দনা করি না? কেন এমন আত্মবিস্মৃত আমরা?

আমি মাঝে মাঝে ভাবি সেন্ট মার্টিন এ যে চ্যানেল দিয়ে সাঁতারুরা সাঁতরে দীর্ঘপথ পাড়ি দেবার চ্যালেঞ্জ নেন, মুসা ইব্রাহীম যেটা একবার চেষ্টা করেছিলেন অন্তত সেটির নাম কি সূর্য সাগর দেয়া যেতো?

তখনি মনে পড়ে সূর্যসেনকে আমার নায়ক মনে হবার সবচেয়ে বড় কারণটি কবিতায় আছে।

“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী

ভয় নাই ওরে ভয় নাই

নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান

ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।”

এই কবিতাটি একজনের বড় প্রিয় ছিল।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তিনি শহীদ বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধের ফলকে এই কবিতাটি উৎকীর্ণ করতে বলেছিলেন।

সূর্যসেন দেখে যান নাই কিন্তু বিনোদবিহারী দেখেছেন।

কার বজ্রকন্ঠে , কার হাত ধরে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হলো।

আব্দুন নুর তুষার

লেখকের ফেসবুক হতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *