মোহাম্মদ আলী : এক মহৎ মানুষের গল্প

ছোটবেলা থেকে যে খেলোয়াড়েরা আমাকে মুগ্ধতায় আবিষ্ট করে রেখেছেন তাদের মধ্যে সেরা যিনি তার নাম মোহাম্মদ আলী।

মোহাম্মদ আলী সম্পর্কে তার সাথে হেরে যাওয়া যোদ্ধা জর্জ ফোরম্যানের একটা কথা আছে। তিনি বলেছিলেন যে ”আমি হেরে গিয়ে দু:খ পাই নাই, কারন আমি সর্বকালের সেরার সাথে হেরেছি।”

ফোরম্যান আরেকটা কথা বলেছিলেন যে ”সবাই বলে আলী একজন বক্সার । আমি বলি আলী বক্সিং করেছে কিন্তু সে বক্সার ছিল না। এটা কেবল তার একটা কাজ। সে প্রকৃতপক্ষে তার সময়ে পৃথিবীর সেরা একজন মানুষ।”

আলী ও ফোরম্যান

ফোরম্যানের সাথে লড়াইয়ের আগে আলী একজন ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সাথে দেখা করেছিলেন। শিশুটির জীবনের ইচ্ছা ছিল সে মোহাম্মদ আলীকে দেখবে একবার। আলী তাকে বললেন যে

”আমি ফোরম্যানকে হারাবো , তুমি ক্যান্সারকে হারাবে।”

ছেলেটি হেসে বলেছিল ”আমি মনে হয় সেটা পারবো না কিন্তু তোমাকে দেখে আমি অনেক খুশী হয়েছি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন।”

ছেলেটি এর দুসপ্তাহ পরেই অসুস্থ হয়ে ইউ পেন হাসপাতালে ভর্তি হয়। আলী তাকে আবার দেখতে গিয়ে একই কথা বলেন। ছেলেটি উত্তর দিয়েছিলো

”তুুমি ফোরম্যানকে হারাবে আলী আর আমি আল্লাহর সাথে দেখা করতে চলে যাবো। তবে গিয়ে আমি আল্লাহকে বলবো তোমার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো আর আমি তোমার বন্ধু ছিলাম।”

মোহাম্মদ আলী প্রতিবাদী ছিলেন। প্রচন্ড বুদ্ধিমান ও মেধাবী ছিলেন। তিনি তার বন্ধুদের বলতেন যে তার প্রবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষদের তিনি হারাতেন কারন তার মেধা আছে। অন্যরা কেবল ঘুষি দেয় , তিনি ঘুষি দেয়ার আগে মাথা কাজে লাগান, চিন্তা করেন।

তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এই কথা বলে যে তার ধর্ম তাকে নিজের দেশ ও জাতি আক্রান্ত হলে যুদ্ধ করতে বলেছে। আমেরিকা আক্রান্ত হলে তিনি যুদ্ধ করতেন, কিন্তু বিনা কারনে দেশ থেকে দশ হাজার মাইল দুরে নারী ও শিশু হত্যার জন্য তিনি যুদ্ধে যাবেন না।

আলী

তার পেশাদার বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নের খেতাব কেড়ে নিয়ে তাকে পাঁচ বছরের জেল দেয়া হয়। তিনি ১৯৭১ সালে ৪ বছরের মাথায় সুপ্রীম কোর্টের রায়ে বের হয়ে আসেন। আমেরিকার প্রশাসণ কখনো এই অসুস্থ সিদ্ধান্তের জন্য তার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে নাই।

আলী তার প্রতিপক্ষকে প্রবলভাবে পরাস্ত করতেন। কিন্তু তাদের জন্য কাঁদতেন, তাদের বিপদে এগিয়ে যেতেন। জো ফ্রেজার তার সাথে দুবার লড়েন জেল থেকে বের হবার পরে ও প্রথমবার তাকে পয়েন্টে পরাস্ত করেন, যে সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। লড়াইয়ের পর ফ্রেজার একমাস হাসপাতালে ছিলেন। হেরে গিয়েও আলী জো ফ্রেজারের জন্য কাঁদতেন। যখন শুনেছিলেন যে ফ্রেজারের সন্তানেরা বাবা ফিরবে কিনা এই নিয়ে প্রতিদিন আশংকায় থাকে।

আলী ও জো ফ্রেজার

হলিউডে কোডাক থিয়েটারের সামনে দেয়ালে মোহাম্মদ আলীর নাম লাগানো আছে। হলিউড ওয়াক অব ফেমে সব তারকার নাম ফুটপাথে লেখা হলেও আলীর নাম দেয়ালে কারণ তাকে যখন বলা হয়েছিল যে তার নামও সেখানে থাকবে, তিনি বলেছিলেন যেহেতু তার নামের সাথে নবীজি সা. আ. এর নাম আছে তাই সেই নাম যেন মানুষের পায়ে চলার পথে না থাকে।

কোডাক থিয়েটারের দেয়ালে আলীর নাম ফলক

আমেরিকা বলেই, যে দেশ তাকে যুদ্ধে না যাবার জন্য জেলে পুরেছে সেই একই দেশে তার নাম তারা সম্মান করে উঁচুতে রেখেছে।

মোহাম্মদ আলী তার সাথে তার প্রিয়জনদের আলাপের অডিও রেকর্ড করে রাখতেন টেপে। তিনি বলেছিলেন যে ”আমরা যখন দিনগুলি পার করি তখন আমরা বুঝি না আমরা নিজেদের ইতিহাস তৈরী করছি। কত সুন্দরই না ছিল সেই দিনগুলি।”

তাই এই কথোপকথন তিনি রেখে গেছেন তার প্রিয়জনদের জন্য তারা যাতে অনুভব করে আলীর সাথে তার প্রিয়জনদের দিনগুলি কতই না মধুর ছিল।

আমরা আমাদের কাছের মানুষদের মহত্ব , শ্রেষ্ঠত্ব, মেধা কিছুই বুঝতে পারি না। আর শত্রুকে ভালোবাসতে শিখি না।

জর্জ ফোরম্যানকে পর পর আঘাত করার পর তার গার্ড নেমে গেলে তিনি যখন পুরো অরক্ষিত অবস্থায় রিংক এর ভেতর পড়ে যাচ্ছেন তখন চাইলেই তাকে তিনি আরো ভয়াবহ আঘাত করতে পারতেন। তাকে তার ম্যানেজার প্রশ্ন করেছিলেন – আলী সুযোগ পেয়েও ”তুমি তাকে বাগে পেয়েও, আরো না মেরে ছেড়ে দিলে কেন?”

আলী এক বাক‍্যে উত্তর দিয়েছিলেন – ”যথেষ্ট হয়েছিল, আর দরকার ছিল না।”

এই লাইনটা খুব গুরুত্তপূর্ন। পরাজিত শত্রুকে, ভুপাতিত শত্রুকে আর আঘাত করতে হয় না। তখনি বিজয়ী মহৎ হয়ে ওঠে। শত্রুতা সে যতোক্ষন লড়ছে ততোক্ষন।

আলীর প্রতিদ্বন্দিরা সকলেই তাকে শ্রদ্ধা করেছেন। তারা বলেছেন যে আলীর কারনেই তারা চিরকাল দ্বিতীয় হয়েছেন, প্রথম হতে পারেন নাই। কিন্তু তারা খুশী যে তারা মহত্তম মুষ্টিযোদ্ধা ও মহৎ এক মানুষের কাছে হেরেছেন।

আলী ও সনি লিস্টন

আমরা বড় মানুষদের দেখি কিন্তু তাদের কাছ থেকে কিছুই শিখি না। আমি প্রতিদিন কিছু কিছু করে শিখতে ভালোবাসি। মোহাম্মদ আলী তিনবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।  তার কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। সবচেয়ে বেশী যেটি শিখেছি সেটি হলো মানুষ হতে হবে, বাকি সবই কাজ , কিছু ভুল কিছু ঠিক।

চ্যাম্পিয়ন মানে যে পড়ে গেলে আবার ও বারবার সোজা হয়ে দাঁড়ানো এটা তিনিই এভাবে প্রথম দেখিয়ে দিয়েছেন।

আমাদের দেশে আমরা শক্তিশালী ও সেরা মানুষদের গল্প শোনাই না। আমাদের টেলিভিশনে কোন ডকুমেন্টারী নাই। সেই বৃটিশ শাসণ ও তারও আগে থেকে আমাদের ইতিহাস ও গর্বের জায়গাগুলি বলার কোন চেষ্টা নাই। আমরা আমাদের বীরদের গল্প পাশ করার জন্য পড়ি, তাদের মতো হবার জন্য পড়ি বলে মনে হয় না।

তারপরেও ….   আমি ঠিক করেছি মাঝে মাঝে আপনাদের আমার নায়কদের গল্প শোনাবো।

আব্দুন নূর তুষার

চিকিৎসক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

লেখকের ফেসবুক হতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *