অনন্য আনিসুজ্জামান

আনিসুজ্জামানের সাথে লেখক

মোরশেদ শফিউল হাসান।

ড. আনিসুজ্জামানের সরাসরি ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র (১৯৭২-৭৬) তখন তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একেবারে গোড়ার দিকেই তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান বা আসলে ফিরে আসার একটা সম্ভাবনায় আমরা আনন্দিত হয়েছিলাম বটে। কিন্তু ক্ষমতাসীন মহলের আশীর্বাদ বা প্রশ্রয়ধন্য কিছু শিক্ষক ও ছাত্রের সক্রিয় বিরোধিতা ও হুমকির মুখে কীভাবে সে সময় তা ভণ্ডুল হয়ে যায়, তারও সাক্ষী হয়ে আছি আমরা (স্মৃতিকথা ‘বিপুলা পৃথিবী’তে তিনি নিজেই অত্যন্ত সংযত ভাষায় কিন্তু সবিস্তারে তার বর্ণনা দিয়েছেন, পৃ.৫২-৫৫)। তবে ক্লাসরুমে শিক্ষক হিসেবে না পেলেও তাঁকে আমি সব সময় আমার শিক্ষক হিসেবেই গণ্য করে এসেছি (যেমন হয়তো আরো অনেকেই করেন)। আমার নিজের স্বভাবদোষে তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার সুযোগও আমার কখনো হয়নি। কিন্তু সভা-সেমিনার, কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা অন্য উপলক্ষে যখন যেখানে যতবারই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তাঁর অমায়িক ব্যবহার ও স্নেহপ্রশ্রয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। দলমত নির্বিশেষে সবাই নিশ্চয় তাঁর এই সৌজন্যবোধের পরিচয় পেয়েছেন, এর পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন। ডাকযোগেও তাঁকে কখনো কোনো বই পাঠাবার পর দেখেছি, তিনি নিজে ফোন করে তার প্রাপ্তি স্বীকার করেছেন, অনেক সময় বইটি সম্পর্কে মোটামুটি অভিমত জানিয়েছেন। তাঁর ছাত্র বা ভক্তরা আমরা কজন সে শিক্ষা গ্রহণ করেছি, তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করি?

জ্ঞান বা বিদ্যাবত্তার পাশাপাশি মার্জিত রুচি, ভদ্রতা ও পরিমিতিবোধ, এসব দিক থেকে তাঁর সঙ্গে তুলনীয় ব্যক্তিত্ব একালে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আর দু-একজনও আছেন কিনা সন্দেহ। তাঁর যে গুণটি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে তা হলো তাঁর পরিমিতিবোধ ও তথ্যনিষ্ঠা। জীবনের শেষাবধি তিনি যা বজায় রেখেছেন। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে গিয়েও, আমার জানামতে, তিনি কখনো ঘটনা বা সত্যকে চেপে যাননি বা বিকৃত করেননি। তাঁর লেখায় যেমন, তেমনি শ্রোতা হিসেবে এবং অনেকবার একই মঞ্চে বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার সুবাদে আমি বিষয়টি লক্ষ্য করেছি। যেমন বছর দুই আগে আবুল মনসুর আহমদ সম্পর্কে এক আলোচনা সভায় তিনি বললেন, নজরুলের ‘চল চল চল’ গানে ‘মহাশ্মশান’কে ‘গোরস্থান’ করার কাজটি আসলে পাকিস্তানি শাসকরা নয়, নজরুল নিজেই করেছিলেন (‘নব-নবীনের গাহিয়া গান /সজীব করিব মহাশ্মশান’-এর পরিবর্তে ‘তাজা-বতাজার গাহিয়া গান/সজীব করিব গোরস্তান’)। আর ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি’-র পরিবর্তে ‘ফজরে উঠিয়া আমি দেলে দেলে বলি’ করা হয়েছিল ১৯৫০ এর দশকে ‘অগত্যা’ পত্রিকায়। পাকিস্তানবাদীদের ভাষা ও সাহিত্য সংস্কার প্রয়াসকে ব্যঙ্গ করতে গিয়ে একটি সম্ভাব্য নমুনা হিসেবে। এ নিয়ে আগে একবার লিখতে গিয়ে আমি বলেছি, ‘এর মধ্যে প্রথম তথ্যটি আমার (এবং নিশ্চয় আরো কারো কারো) জানা থাকলেও, পরেরটি সেভাবে জানতাম না।’ আর ‘আমাদের সরলীকৃত ইতিহাসচর্চার বিপরীতে’ ড. আনিসুজ্জামান না হয়ে ‘অন্য কেউ বললে, হয়তো কথাগুলোর ভুল ব্যাখ্যা করা হতো’।

আমাদের ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা, এমনকি স্বাধীনতা-উত্তর পর্বেও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে তাঁর সম্মুখবর্তী ভূমিকা লেখক বা বুদ্ধিজীবী হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে তাঁর দৃঢ় অঙ্গীকারের পরিচয় দেয়। যদিও, বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না, সাম্প্রতিককালে তাঁর সরকারঘনিষ্ঠ অবস্থান এ ব্যাপারে বেশ খানিকটা সীমাবদ্ধতার সৃষ্টি করেছিল । অনেক বিষয়ে তাঁর নিরুচ্চার ভূমিকা বা ভূমিকাহীনতা আমার মতো অনেকেরই তাঁর প্রতি কমবেশি অভিমান বা ক্ষোভের কারণ হয়েছিল। প্রকাশ্যে বা লিখিতভাবে ততটা না হলেও, আড্ডায়-আলোচনায় কখনো কোথাও যে আমাদের সে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেনি বা একেবারে ঘটতো না, তাও নয়। তবে উপকারভোগী আর স্তাবকদের দঙ্গল পেরিয়ে আমাদের সে মানসিক প্রতিক্রিয়ার খবর তাঁর কাছ অবধি হয়তো পৌঁছতো না।

তবে ক্ষমতার কাছের লোক হয়েও একই মঞ্চে অবস্থানকারী অন্যদের সঙ্গে তিনি তাঁর পার্থক্যকে সবসময় সুস্পষ্ট করতে পেরেছেন বলে আমি মনে করি। সমালোচনা বা স্তুতিবাক্য উচ্চারণে তিনি কখনো প্রগলভ বা ভারসাম্যহীন হননি। রুচি বা পরিমিতিবোধ হারাননি । এখানেই ড. আনিসুজ্জামানের অনন্যতা। কবি আল মাহমুদের মৃত্যুর পর তাঁর স্মরণসভায় সভাপতি বা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার ঘটনার মধ্য দিয়েও তিনি সহযোগী অনেকের সঙ্গে তাঁর পার্থক্যের বিষয়টি সুচিহ্নিত করতে পেরেছেন।

আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি ও মননচর্চার ইতিহাসে ড. আনিসুজ্জামানের গবেষণাগ্রন্থ ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’ এবং ‘স্বরূপের সন্ধানে’সহ বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখা কয়েকটি বই, তাছাড়া দুই খণ্ডে লেখা তাঁর স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনী (‘কাল নিরবধি’ ও ‘বিপুলা পৃথিবী’) মাইলফলক কাজ হিসেবে বিবেচিত হবে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে এ বইগুলোর শরণ আমাদের নিতেই হবে। শেষদিকে সভা-সেমিনার ইত্যাদিতে তাঁর প্রায়-প্রাত্যহিক উপস্থিতি, কাউকে ‘না’ বলতে পারার অক্ষমতা বা উদারতা তিনি যদি পরিহার করতে পারতেন, অন্তত অতিরিক্ত সামাজিক জীবন যদি সীমিত করতে পারতেন, দেশ ও জাতি তাঁর গবেষণা ও অন্যান্য কালজয়ী অবদানে হয়তো আরো বেশি সমৃদ্ধ হতে পারতো। আনিসুজ্জামানের মতো মানুষ তো কোনো জাতির জীবনে বারবার আসেন না! তবে এ নিয়ে এখন আমরা কেবল আক্ষেপই ব্যক্ত করতে পারি।

ড. আনিসুজ্জামানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ।

মোরশেদ শফিউল হাসান

লেখকের ফেসবুক হতে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *